• বুধবার, ২৪ জুলাই ২০২৪, ০৪:০৩ অপরাহ্ন

নারীরা বেশি মাদকাসক্ত হয় পারিপার্শ্বিক চাপ ও ভ্রান্ত ধারণায়

Reporter Name / ৮ Time View
Update : শনিবার, ২৯ জুন, ২০২৪

ভ্রান্ত ধারণা ও পারিপার্শ্বিক চাপে নারীরা বেশি মাদকদ্রব্য গ্রহণ করছে এবং দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে নারী মাদকাসক্তের সংখ্যা বাড়ছে বলে জানায় মাদক ও ধূমপানবিরোধী সংগঠন ‘মানস’ ও ঢাকা আহছানিয়া মিশন। প্রতিষ্ঠান দুটির গবেষণা ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ বলে, আকর্ষণীয় শারীরিক গঠনের জন্য মাদকাসক্ত নারীর প্রতি পাঁচ জনে তিন জন নারী ইয়াবা গ্রহণ করছে। অবাধ ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন যৌন সাইটে বিচরণ করার সুযোগে অনেক স্কুল-কলেজের তরুণী প্রথমে ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়াচ্ছে। একাধিকবার শারীরিক সম্পর্ক করার পরে তারা মাদকে আসক্তও হচ্ছে। স্বামী-স্ত্রীর পরকীয়াও নারীর মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বিজ্ঞজনেরা—

এমন বাস্তবতার মধ্যে আজ ২৬ জুন ‘মাদকের আগ্রাসন দৃশ্যমান, প্রতিরোধই সমাধান’ প্রতিপাদ্য করে দেশ জুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব মাদক সেবন ও অবৈধ পাচার প্রতিরোধ দিবস। বিজ্ঞজনেরা বলছেন, মাদকাসক্তের অন্যতম কারণ পরিবারের থেকে বিচ্ছিন্নতা। পারিবারিক আশ্রয় এবং বন্ধুত্বপূর্ণ পিতামাতা ও পারিবারিক সম্পর্ক পারে সন্তানদের মাদকাসক্ত হতে রোধ করতে।

নারী যখন মাদক গ্রহণ করছে

নগরীর একটি অভিজাত এলাকায় থাকে বন্নি (ছদ্মনাম)। এবছর তার এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা। কিন্তু সে এখন আছে একটি (আহছানিয়া মিশন) নারী মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে। করোনাকালে তার হাতে মোবাইল যায়। পড়াশোনার পাশাপাশি সে বিভিন্ন প্রাপ্ত বয়স্কদের সাইটে ঢুকতে থাকে। এর ফলে ক্রমেই তার মধ্যে যৌন চাহিদা বাড়তে থাকে। সে এক সময় তার ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করে। একাধিক বার যৌন সম্পর্ক স্থাপনের পর সে প্রথমে ঘুমের ওষুধ, পরে গাঁজা ও ইয়াবা গ্রহণ শুরু করে। একসময় বাবা-মায়ের কাছে ধরা পড়ে। বাবা-মা তকে ঘরে বন্দি রাখে। সে তার নেশার চাহিদা মেটাতে তিনতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে। এতে তার হাত ভেঙে যায়, ভাঙা হাত নিয়েই তাকে এই পুনর্বাসন কেন্দ্রে আনা হয়। সে একজন মাল্টি ড্রাগ ইউজার। তারা একটা অবস্থান পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। কিন্তু পরিবারে অসহযোগিতায় এবং সচেতনতার অভাবে আবারও মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন।

কী কী কারণে নারীরা মাদক গ্রহণ করছেন

আহছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর মো. মোখলেসুর রহমান জানান, নারীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়লেও মাদকের চিকিৎসায় পিছিয়ে আছেন নারীরা। আহছানিয়া মিশন নারী মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে যাত্রা শুরু করে। তাদের ১০ বছরের কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা বলে বর্তমানে গৃহিণী ও শিক্ষার্থীরা বেশি মাদকাসক্ত। স্বামীর পরকীয়া, স্বামী ও স্বামীর পরিবারের মাদকাসক্ত হওয়া এবং মোবাইলে আসক্ত হওয়া, আধুনিক হওয়া এবং আকর্ষণীয় হওয়া, স্বামী-বা সন্তান মাদক ব্যবসা করা, প্রেমে প্রতারণার শিকার হওয়া, অতিরিক্ত যৌন চাহিদা সৃষ্টি হওয়ায় স্বামীর যৌন অক্ষমতার মতো কারণে তারা মাদকাসক্ত হন। এক শ্রেণির তরুণী মফস্বল থেকে শহরে এসে জীবনধারণের জন্য মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ে, তারাও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। তাদের কেন্দ্রে ১৪ থেকে ২৮ বছরের নারী সেবাগ্রহীতা বেশি এবং তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসছেন।

ফারজানা ফেরদৌস জানান, প্রতিদিন তাদের সেন্টারে তিন থেকে পাঁচ জন রোগী আসে তাদের মধ্যে তিন জন সুন্দর হওয়ার জন্য ইয়াবা গ্রহণ করছেন। এ যাবত তারা ৭৬২ জন নারীকে চিকিৎসা সেবা দেন। সেবা গ্রহণকারী নারীদের মধ্যে একইসঙ্গে একাধিক মাদক গ্রহণকারীসহ ৩৯ শতাংশ ইয়াবা গ্রহণকারী, ৩৯ শতাংশ গাঁজা। এছাড়া ঘুমের ওষুধ, মদ, শিরায় মাদক গ্রহণকারী ও অন্যান্য মাদক গ্রহণকারী রয়েছে।

পরিসংখ্যান

অধ্যাপক ডা. অরূপরতন চৌধুরী ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা ‘মানস’। তিনি জানান, নারী মাদকাসক্তদের মধ্যে ১৯ শতাংশ ইয়াবা সেবী। এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি ১০ জনে তিন জন নারী মাদকাসক্ত। তিনি বলেন, পাঁচ বছর আগে আমাদের করা গবেষণায় দেখা যায়, দেশে ১ লাখ ৫০ হাজার মাদকাসক্তের মধ্যে নারী ২৭ হাজার ৩০০ জন। অর্থাৎ ১৭ শতাংশ নারী। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা বলছে, ১৪ লাখ শিশু মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত। তারা নিজেরা মাদক গ্রহণ করে এবং তাদের মায়েরাও তাদের সহযোগিতা করে, আগ্রহ থেকে তারাও মাদক গ্রহণ করে। পাঁচ বছর আগে করা গবেষণায় দেখা যায়, ৭৫ লাখ মাদকাসক্ত। যাদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ২৫ শতাংশের বয়স ১৫-৬০ বছরের মধ্যে ৪৮ থেকে ৪৯ শতাংশ তরুণ মাদকাসক্ত। প্রতি ১৭ জনে একজন তরুণ মাদকাসক্ত। মোট মাদকাসক্তের ৮৪ শতাংশ পুরুষ ও ১৬ শতাংশ নারী। এদের মধ্যে ৯৭ শতাংশ যৌন অপরাধী। ৭ শতাংশ এইচআইভি এইডস আক্রান্ত।

কীভাবে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব

অধ্যাপক ডা. অরূপরতন চৌধুরী ও মো. মোখলেসুর রহমান বলেন, পরিবারকে বেশি সময় দিতে হবে। সন্তানদের আশ্রয় দিতে হবে। আমরা আমাদের সংস্কৃতি, কৃষ্টি থেকে ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। শুধু জিপিএ ৫ এর পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে আমরা ছেলে-মেয়েদর সঠিক শিক্ষা দিচ্ছি না। অধ্যাপক ডা. অরূপরতন চৌধুরী পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের নিরাময় কেন্দ্র নেই। উন্নত দেশে একজন মাদকাসক্ত রোগীকে সারা জীবন পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। কারণ এটি ‘ক্রনিক রিল্যাপসিং ব্রেইন ডিজিস। এতে আবারও ফিরে আসতে পারে বা আসার ঝুঁকি থাকে। চারপাশে সহজলভ্য মাদকদ্রব্য আর তার অভ্যস্ততাতে যে কোনো দুঃখ-কষ্টের বঞ্চনাতে আবার ফিরে যায়। তিনি বলেন, মাদকাসক্তকে আমরা অপরাধী ভাবি, পরিবারের কেউ তাকে গ্রহণ করতে চায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাকে পরিবারই ফিরে আসতে দেয় না। তাকে অপরাধী না, রোগী ভেবে ব্যবহার করতে হবে। অনেক ভালোবাসা দিতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category