• বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:২৫ পূর্বাহ্ন

বাড়ি-গাড়ির মালিক তাঁরা গুলশান-বনানীতে অবৈধভাবে মদ বেচে

Reporter Name / ৩১ Time View
Update : শনিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

হুমায়ুন কবির গাজী (৫৩) ও ফারুক সরকারের (৪৯) ঢাকায় বহুতল বাড়ি রয়েছে। রয়েছে ফ্ল্যাট–গাড়ি। পুলিশের তালিকায় তাঁরা অবৈধ মাদক ব্যবসায়ী। আর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে, বিদেশ থেকে চোরাই পথে মদ এনে ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশান–বনানীর বিভিন্ন বার ও পাঁচ তারকা হোটেলে সরবরাহ করেন তাঁরা। এ ছাড়া ওই এলাকার একাধিক ওয়্যার হাউসের মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় বিদেশি মদ এনে বাইরে বেশি টাকায় বিক্রি করেন তাঁরা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, হুমায়ুন ও ফারুক অবৈধভাবে মদ বিক্রি করে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এখন তাঁরা কয়েকটি ওয়্যার হাউসের মালিকদের সঙ্গে ব্যবসা করেন। কীভাবে এই কারবার চলছে, তা তুলে ধরে তিনি বলেন, কোনো ওয়্যার হাউসের মালিকের শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় ৫০ লাখ টাকার বিদেশি মদ আমদানির পুঁজি আছে। হুমায়ুন ও ফারুক সরকার ওই মালিককে দিয়ে এক কোটি টাকার মদ বিদেশ থেকে আনান। পরে সেই মদ বাইরে বিক্রি করেন তাঁরা।

সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ফারুক সরকারের বিরুদ্ধে ঢাকার বিভিন্ন থানায় ১২টি মাদকের মামলা রয়েছে। ছয়টি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে গুলশান ও বনানী থানায় রয়েছে আটটি মামলা। আর ১০টির বেশি মাদকের মামলা রয়েছে হুমায়ুন কবির গাজীর বিরুদ্ধে। এর মধ্যে চারটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। মাদকের মামলায় তাঁরা দুজনই একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হুমায়ুন কবির গাজীর বাড়ি ভোলা সদর জেলার রুহিতা গ্রামে। পরিচিত ব্যক্তিরা তাঁকে ‘ভোলাইয়া কবির’ বলে ডাকেন। হুমায়ুন কবির প্রায় দুই দশক আগে ঢাকায় এসে জমি কেনাবেচার দালালি করতেন। পরে ফারুকের সঙ্গে পরিচয় হয়, বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। দুজন মিলে অবৈধ মদ বিক্রির চক্র গড়ে তোলেন। তাঁদের চক্রে আরও কয়েকজন রয়েছে। প্রায় দুই দশক ধরে তাঁদের এই ব্যবসা চলছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মদের কারবার করে হুমায়ুন কবির ঢাকার ভাটারার নূরের চালা এলাকায় একটি আটতলা বাড়ি বানিয়েছেন। তাঁর একটি ফ্ল্যাট রয়েছে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়। সেখানেই পরিবার নিয়ে থাকেন তিনি। চড়েন দামি গাড়িতে।

সরেজমিনে ভাটারার নূরের চালা এলাকায় গিয়ে কথা হয় ওই এলাকার একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে। তাঁরা বলেন, হুমায়ুন কবিরকে বড় ব্যবসায়ী হিসেবে জানেন। প্রায় ১০ বছর আগে তিনি আটতলা বাড়িটি বানিয়েছেন। তিনি পরিবার নিয়ে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় থাকেন। আটতলা বাড়িটি দেখভাল করেন তাঁর মেয়ের জামাই।

যাত্রাবাড়ীর কাজলা শেখদী এলাকায় নির্মাণাধীন এই ছয়তলা ভবনের মালিক ফারুক সরকার। তিনিও গুলশান–বনানী এলাকায় অবৈধভাবে মদের কারবার করেন বলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন
যাত্রাবাড়ীর কাজলা শেখদী এলাকায় নির্মাণাধীন এই ছয়তলা ভবনের মালিক ফারুক সরকার। তিনিও গুলশান–বনানী এলাকায় অবৈধভাবে মদের কারবার করেন বলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হুমায়ুন কবিরের জামাতা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার শ্বশুর জমির ব্যবসা করেন। তাঁর বিরুদ্ধে মাদকের কয়েকটি মামলা রয়েছে। মামলাগুলো যড়যন্ত্র করে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি এই বাড়ি দেখাশোনা করেন জানিয়ে জামাতা বলেন, তাঁর শ্বশুর দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় থাকেন।

অবৈধ মাদক ব্যবসা নিয়ে বক্তব্য জানতে হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাঁর মুঠোফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

হুমায়ুন কবিরের সহযোগী ফারুক সরকারের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলার তিতাস থানার মাছিমপুর গ্রামে। তবে বাবার ব্যবসার সুবাদে পরিবারের সঙ্গে যাত্রাবাড়ীর কাজলা শেখদী এলাকায় বেড়ে উঠেছেন। মদের ব্যবসা করে ওই এলাকায় একটি ছয়তলা বাড়ি বানিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া পরিবহন ব্যবসা রয়েছে তাঁর। ফারুকের মালিকানাধীন ছয়টি বাস ঢাকা–কুমিল্লা মহাসড়কে যাত্রী পরিবহন করে। বিআরটিএ সূত্র জানায়, ফারুক সরকারের নামে ঢাকা মেট্রো–গ সিরিয়ালের দুটি প্রাইভেট কারের নিবন্ধন রয়েছে।

মাদকের কারবার করে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে ফারুক সরকারের মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠালেও সাড়া দেননি।

কাজলা শেখদী এলাকায় ফারুক সরকারকে অনেকে চেনেন হৃদয় সরকার নামে। সরেজমিনে কাজলায় ফারুকের বাড়ির সামনে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটি ছয়তলা হলেও চারতলা পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে। বাকি দুই তলা নির্মাণাধীন অবস্থায় পড়ে আছে। স্থানীয় লোকজন জানান, এই বাড়িতে ফারুক সরকার থাকেন না। এখানে তাঁর মা–বাবা ও ছোট ভাই থাকেন।

স্থানীয় এক মুদিদোকানদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ফারুক এইচএসসি পাস করার পর পড়াশোনা না করে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। মাদকের টাকায় বাড়ি বানিয়েছেন। পরিবহনের ব্যবসাও রয়েছে তাঁর। তিনি বলেন, ফারুক মাঝেমধ্যে বাড়িতে আসেন। তখনো এলাকার কারও সঙ্গে তেমন মেলামেশা করেন না।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক তানভির মমতাজ বলেন, মাদক ব্যবসা করে অনেকে এ রকম গাড়ি–বাড়ির মালিক হচ্ছেন। যাঁরা এভাবে সম্পদ করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করছেন তাঁরা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category