• বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ০৪:৫১ পূর্বাহ্ন

সামনে কোন মডেলের নির্বাচন? রাজনীতির সঙ্গে কূটনীতির সংঘাত বাড়ছে

Reporter Name / ১৫২ Time View
Update : সোমবার, ২৯ মে, ২০২৩

কেবল সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নয়, সামনে একটি নতুন মডেলের নির্বাচন দেয়ার কথা বেশি বেশি করে বলা হচ্ছে সরকারের তরফে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের অবিরাম তাগিদের প্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন দল ও সরকার থেকে বলা হচ্ছে, এ নিয়ে বিদেশিদের এতো ভাবনার দরকার নেই। বাংলাদেশের নির্বাচন বাংলাদেশই করতে সক্ষম এবং সামনে তা-ই করা হবে।
সরকারের এমন আশ্বাসপূর্ণ ওয়াদার ভেতরের দিক নিয়ে বেশ কথাবার্তা হচ্ছে। ১৯৭৩ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ নির্বাচনের নানা মডেল দেখতে দেখতে ক্লান্ত। বিনা ভোটে ১৫৪ জন এমপি হয়ে যাওয়ার মডেল মানুষ দেখেছে। আগের রাতে ভোট হয়ে যাওয়ার নির্বাচনের রেকর্ড বা মডেলও দেখেছে। এরও আগে হাঁ-না ভোট, মিডিয়া ক্যুর ভোট তো আছেই। ১৫ ফেব্রয়ারি মডেল, মাগুরা, মীরপুর মডেলও বাদ যায়নি। মাস কয়েক আগে হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মডেল । সামনে আর কী মডেল বাকি আছে? এ প্রশ্নের মাঝে একটি ধারনা ছুঁড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দিন। তার নির্বাচন ছাড়াই আরেকটি সরকারকে নির্বাচিত করে ফেলার তত্বটি সরকারের দিক থেকে বাজারে ছাড়া হয়েছে না তিনি বলার জন্যই বলেছেন-এখনও স্পষ্ট নয়। বিনা ভোটে নির্বাচন হতে পারলে বিনা নির্বাচনেও নির্বাচন হতে পারে-এমন একটি বার্তা ও যুক্তি রয়েছে তার থিউরির মাঝে। বেশ ইন্টারেস্টিং ব্যাপারটি।
নির্বাচন ছাড়া এ সংসদ ও সরকারকে আরো ৫ বছর টেনে নেয়ার ফর্মুলাটির পক্ষে ভেতরে-ভেতরে অনেকের সায় আছে। সামনে আর ২০১৪ বা ২০১৮ সালের মতো নির্বাচন সম্ভব নয়, তা নিশ্চিত হয়ে একটি মহল এ ফর্মুলাটি এসিড টেস্টের মতো বাজারে ছেড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দিন তার ফর্মুলার মাধ্যমে একটি ধারনা দিয়েছেন মাত্র। ধারনাটি বাস্তবায়ন করা যায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মহামারির কারণ দেখিয়ে। প্রধানমন্ত্রী বা সরকারি দল চাইলেই জাতীয় সংসদে এই সংসদের মেয়াদ আরোও পাঁচ বছরের জন্য বৃদ্ধি করা সম্ভব। আসন বিচারে সংসদে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়েও বেশি আছে সরকারের।
এমন তত্বের সমর্থকরা বলতে চান, ২০১৪-তে বিনা ভোটে ১৫৪ জনকে জয়ী করা মানে একটি সরকার প্রায় গঠিত হয়ে যাওয়া। বাতি থাকে শুধু শপথ গ্রহণ। আচানক ধরনের ওই মডেল নিয়ে কিছুদিন সমালোচনা হলেও পরে সব ঠিক হয়ে যায়। বিএনপির তা মানা- না মানায় কিছু যায়-আসেনি।  কেবল দেশের রাজনৈতিক দল নয়, বিদেশি শক্তিগুলো তা মেনে নিয়েছে। ওই মডেলে নির্বাচনের সরকারকে সমর্থনও দিয়েছে। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে, গ্যারান্টি দিয়ে বলা হয়েছে বিনা ভোটে এমপি হয়ে যাওয়ার মডেলের নির্বাচন আর হবে না। ঠিকই তা হয়নি। আগের রাতে ভোট সেরে ফেলার মডেল বা অভিযোগ যোগ হয়েছে। তাতেও সমস্যা হয়নি। আজ যেসব বিদেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশে আগামীতে সুষ্ঠু নির্বাচনের তাগিদ দিচ্ছে তারাও ওই নির্বাচনকে মেনে নিয়েছে। সরকারকেও সমর্থন দিয়ে এসেছে।
বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিশ্চয়তা দিয়ে বিএনপিকে নির্বাচনে আসার আহ্বান জানিয়ে বলছে, আগামী নির্বাচনে গেলবারের মতো আগের রাতে ভোট হবে না। এ রকম একটি পরিস্থিতির মাঝে সরকার বলছে, আগামীতে মডেল নির্বাচন হবে বাংলাদেশে। সেই মডেলটি কী বা কী রকম হতে পারে-এ বিষয়ক কোনো ধারনা এখনো মিলছে না।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সেখানে একটি টোকা দিয়েছেন মাত্র। সামগ্রিক অবস্থা যে জায়গায় চলে গেছে, সেখানে সরকার কী বললো,নির্বাচন কমিশন কী চাইলো, আর বিরোধীদল কোন আমায় ঘুরছে তা আর ম্যাটার করছে না। বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন এখন মোটা দাগের সাবজেক্ট হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র–যুক্তরাজ্যসহ অনেকের দৃষ্টি এ নির্বাচনের দিকে। যুক্তরাষ্ট্রে এতোদিন বলেছে, তারা বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের অপেক্ষা করছে। এখন আর অপেক্ষার কথা বলছে না। জানিয়ে দিয়েছে, যারা সুষ্ঠু নির্বাচনে বাধা দেবে তাদের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদেরও যুক্তরাষ্ট্র ভিসা দেবে না। তাৎক্ষণিক জবাবে বাংলাদেশ থেকে বলা হয়েছে, এসবে বদার করার কিছু নেই। সরকার এ নিয়ে মাথা ঘামায় না।
অথচ বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনে কেউ বাধা দিলে তার বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞার যে হুমকি যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে সেটি নিয়ে সারাদেশে এখন আলোচনা তুঙ্গে। নির্বাচনের আট মাস আগেই আমেরিকা কেন এ ধরণের হুঁশিয়ারি দিল? কেউ কেউ একটু এগিয়ে এমন প্রশ্নও করছেন যে এর পেছনে কি বাংলাদেশে একটি অবাধ-সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক নির্বাচন দেখার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আকাঙ্খাই কাজ করেছে, নাকি এর পেছনে আরো কোন গভীর ‘কৌশলগত’ হিসেব-নিকেশও আছে? আবার কেউ কেউ বলছেন,আ‌মে‌রিকার কা‌ছে কোনটি বেশী গুরুত্বপূর্ণ,”বাংলা‌দে‌শে গনতন্ত্র” নাকি “চায়না‌”কে ঠেকা‌নো।
কথার পিঠে কথার অন্তরালে আসলে দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। সম্প্রতি দেশের আলোচিত বিষয়ের মধ্যে,প্রধানমন্ত্রীকে কবরে পাঠানোর হুমকি, সমালোচনা করতে আসলে বস্তায় ভরে বুড়িগঙ্গার কালো পানিতে ফেলে দেওয়ার ঘোষণা আর নির্বাচন ছাড়াই সরকারের মেয়াদ বৃদ্ধি নিয়ে চলমান আন্দোলন ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঘুরা নানা ছক-অংকতো রয়েছেই। পাশাপাশি রাজনীতির সঙ্গে কূটনীতির সংঘাতও বাড়ছে। রাজনীতি জিতবে না কূটনীতি জিতবে- এ ফয়সালা নিয়ে টানাটানি। বিশ্ব প্রেক্ষাপট তথা চলমান কোল্ড ওয়ার দৃষ্টে স্থানিক রাজনীতি আর আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি ক্যামেস্ট্রি করার প্রক্রিয়া চলছে। রাজনীতি-কূটনীতি-অর্থনীতি মিলিয়ে দেশ এখন এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে। তারওপর সরকার আর রাখঢাক না রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টাগ অব ওয়ারে চলে গেছে। তা জেনে-বুঝেই করেছে সরকার। সামনে আরো স্যাংশন বা নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে বলে গুজব-গুঞ্জন তুঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্রকে পাল্টা স্যাংশন দেয়া, তাদের সঙ্গে কেনাকাটা না করার মতো হুমকির পর এখন  বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদেরও  যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে সতর্ক  করা উচিত বলে বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণেও বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের সতর্ক করা উচিত বলে মন্তব্য করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। এর যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের মতো রাস্তায় গোলাগুলি হয় না, কিংবা কেউ কাউকে মারে না। সেই বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমন বা চলাফেরাও ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশ বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের চোখ রাঙিয়ে কথা বললে ঘাবড়ে যায় না- এমন কঠিন কথাও বলেন তিনি। এর আগে, গোলমালটা বাধে ঢাকাসহ সারা দেশে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরার পরামর্শ দিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের সতর্কতা জারি নিয়ে। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ সতর্কতা জারি করা হয়। মার্কিন দূতাবাসের ‘ডেমোনস্ট্রেশন অ্যালার্ট’ শিরোনামে প্রচারিত হালনাগাদ করা ভ্রমণ সতর্কবার্তাটি দেয়া হয়। এতে বলা হয়, মার্কিন নাগরিকদের জন্য জারি করা ঐ সতর্কবার্তা ঢাকা এবং বাংলাদেশের অন্য শহরগুলোর জন্যও প্রযোজ্য হবে। বাংলাদেশের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন ২০২৪ সালের জানুয়ারির আগে বা ঐ সময়ে হওয়ার কথা রয়েছে। মার্কিন দূতাবাসের বার্তাটিতে বাংলাদেশ যেকোনো সময় সংঘাতপূর্ণ হয়ে যেতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়। এতে মার্কিন নাগরিকদের বড় সমাবেশ ও বিক্ষোভের স্থানগুলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হয়। মার্কিন বা যে কোনো দেশের এমন সতর্কবার্তা হোস্ট কান্ট্রির জন্য অপমানের। এমন অপমানের জবাব দিতে গিয়েই পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্টের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ঝেড়েছেন। এসবের মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমান সরকারের সম্পর্ক এমন জায়গায় চলে গেছে, সেখান থেকে ইউটার্নের লক্ষণ সাদা চোখে দৃশ্যমান নয়। গোটা বিষয়টি চলে গেছে কূটনীতির সাবজেক্টে। ভূ-রাজনীতি, জাতীয় নির্বাচনসহ অভ্যন্তরীণ আরো নানা কারণে বাংলাদেশের দিকে এমনিতেই গত কিছুদিন ধরে গোটা দুনিয়ার দৃষ্টি। তারওপর চলছে বিশ্ব স্নায়ুযুদ্ধ। এর মাঝে সরকারকে ভীষণভাবে সহায়তাকারী কয়েকটি দেশও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে কেয়ার না করলে কিছু হবে না-এমন সাহস দিচ্ছে চীন-রাশিয়াসহ কিছু দেশ। নির্বাচন প্রশ্নে সরকারকে উত্তর কোরিয়া মডেল বাতলে দেয়ার দেশি-বিদেশি শক্তিও গজিয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার নির্বাচনকে দেশটিতে সুষ্ঠু-স্বাভাবিক, অবাধ, অংশগ্রহণমূলক বলা হয়। সেখানে সংসদে আনুষ্ঠানিক নাম ‘সুপ্রিম পিপলস্ অ্যাসেমব্লি’ -এসপিএ এবং এতে ভোটদান বাধ্যতামূলক। সরকারি তালিকার বাইরে এতে অন্য কোন প্রার্থী বেছে নেয়ার সুযোগ থাকে না। অবাধে সেখানকার নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ১০০%। সরকার যে জোট তৈরি করে সেই জোটকেই সর্বসম্মতভাবে ভোট দেয়, দিতে হয়। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও কিম পরিবার বংশপরম্পরায় এই দেশটি শাসন করছে। শাসক পরিবার এবং ক্ষমতাসীন নেতার প্রতি অবাধে আনুগত্য দেখায়  জনগণ-প্রশাসনসহ সব মহল। তাদেরকে সেভাবে অভ্যস্থ করে নয়ো হয়েছে। সুষ্ঠু-সুন্দর, অংশগ্রহণ- সুশৃঙ্খলভাবে তারাকবেল ভোটই দেয় না, সরকারের সমর্থনে উল্লাস প্রকাশ করা উত্তর কোরীয়দের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ দায়িত্বের প্রমাণ হিসেবে তারা কাকডাকা ভোরে ভোটকেন্দ্রে চলে যায়। বিশাল লম্বা লাইন ধরে।
ভোটকেন্দ্রে ঢুকে একটিমাত্র ব্যালটে একটি টিক চিহ্ন দিয়ে বেরিয়ে আসে। বেরিয়ে চলে যায় না। অন্যান্য ভোটারের সাথে মিলে আনন্দ প্রকাশ করে। কে ভোট দিতে যায়নি, সেটা ধরে ফেলার টেকনোলোজি সরকারের কাছে আছে। প্রতি ৫ বছর অন্তর উত্তর কোরিয়ার জনগণিউৎসবের সঙ্গে এভাবে অবাধ- শান্তিপূর্ণ ভোট দেয়। আজব নিরেপেক্ষ নির্বাচনের দেশটিতে কোনো বিরোধীদল নেই বা থাকে না- এমনও নয়। একাধিক বিরোধী দল বা জোট সরকারের ছক মতো ভূমিকা রেখে ধন্য হয়।
পরিশেষে বলতে চাই,সত্যিকার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্হা প্রতিষ্ঠা করতে হলে; একটি আদর্শ বিচারিক কাঠামো গঠন করা, নিরপেক্ষ প্রশাসন ও সেই সাথে সুষ্ঠু অংশগ্রহন মূলক নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত জাতীয় সংসদ প্রতিষ্ঠা জরুরী। আমাদের মত দেশে যেখানে মত বিরোধ অত্যন্ত প্রবল, নিজ দলের বাইরে অন্যকারো মতের কোন মূল্য নেই। যেখানে দলের ভেতর গণতন্তের চর্চা নেই,ব্যক্তিস্বার্থ দল বা দেশের স্বার্থের উর্ধ্বে,শাসকদল সর্বদা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চায়, সেখানে সত্যিকার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্হা প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত কঠিন। তারপরও মনে রাখতে হবে, জনগণকে সবসময় বোকা না ভেবে, তাদের কল্যাণ কিভাবে নিশ্চত করা যায় তাই নিয়ে রাজনীতি করা। সেই সাথে ভোটারাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট

-রিন্টু আনোয়ার


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category