• বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৫৫ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ

চ্যালেঞ্জে পড়বে নতুন নির্বাচিত সরকার

Reporter Name / ১৮ Time View
Update : রবিবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২৬

নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন যে সরকার গঠিত হবে তার সামনে বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রেখে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে চড়া মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে আনা, বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্প খাতকে চাঙা করতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।

এছাড়া রয়েছে ঋণের সুদহার কমানো, ডলারের জোগান বাড়িয়ে টাকার মান ধরে রাখা, বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানো, রাজস্ব আয় বাড়ানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, রপ্তানি বাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, চলমান সংস্কার এগিয়ে নেওয়া উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি রয়েছে আইএমএফের সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে দেশের মানুষের অনুকূলে পদক্ষেপ নেওয়া।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা বসবে নতুন সরকার। দেশি-বিদেশি সবাই এখন নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন সরকার কেমন নীতি গ্রহণ করে এবং দেশের অর্থনীতিকে তারা কিভাবে এগিয়ে নিতে চায় সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, দীর্ঘ সময় ধরেই অর্থনীতিতে মন্দা চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারও অর্থনীতিকে চাঙা করতে পারেনি। তবে তারা অর্থনীতির লিকেজগুলো বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। নতুন সরকারকে অর্থনৈতিকভাবে মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। শিল্প খাতকে চাঙা করতে হবে। মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে। পণ্যমূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এগুলোই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি আরও বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে বলে আশা করা যায়। তখন বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে সরকারকে। উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করতে হবে। দেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগও বাড়াতে হবে।

এর আগে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত তিনটি ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। তাদের পুরো সময়টাই কাটে লুটপাটে। হলমার্ক কেলেঙ্কারি দিয়ে যাত্রা শুরু হয়। এরপর বেসিক ব্যাংক জালিয়াতি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, অ্যানন টেক্স গ্রুপ, ক্রিসেন্ট গ্রুপ কেলেঙ্কারি। একাধিক ব্যাংক দখল করেও চালানো হয় লুটপাট।

বিপুল অঙ্কের টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়। আর্থিক খাত হয়ে পড়ে প্রায় অর্থশূন্য। করোনার আগে ২০১৯ সাল থেকে শুরু হয় অর্থনৈতিক মন্দা। ২০২০ সালে করোনার ধাক্কা ও বৈশ্বিক মন্দায় ২০২২ সালে অর্থনৈতিক সংকট আরও প্রকট হয়। যা আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় পর্যন্ত চলে। গর্তে পড়া অর্থনীতির এই অবস্থায় ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ওই বছরের ৮ আগস্ট বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়।

জুলাই আন্দোলন মূলত শুরু হয় তরুণ প্রজন্মের বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে। কর্মসংস্থানের ৯৫ শতাংশই হয় বেসরকারি খাতে। সরকারি খাতে হয় মাত্র ৫ শতাংশ। দীর্ঘ অর্থনৈতিক মন্দায় বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে আসে। ফলে উচ্চতর পড়াশোনা শেষ করে চাকরি বাজারে প্রবেশ করে প্রত্যাশিত কাজ পাচ্ছিলেন না অনেক চাকরিপ্রত্যাশী। বিনিয়োগে মন্দা থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের পথও ছিল রুদ্ধ। খোলা ছিল একমাত্র সরকারি চাকরি।

এ খাতে নিয়োগের বড় অংশই ছিল কোটায় আবৃত্ত। ফলে সাধারণ বেকাররা চাকরি পাচ্ছিলেন না। সেই থেকেই কোটাবিরোধী আন্দোলন। একপর্যায়ে সরকারের পতন।

আশা করা হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে চাঙা করে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে জোরালো পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু সরকার কোনো পদক্ষেপই নিতে পারেনি। বিনিয়োগ সম্মেলন, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েও কোনো সাফল্য আসেনি। উলটো চলমান কারখানাগুলো সচল রাখতে সরকারের অসহযোগিতার অভিযোগে করেছেন উদ্যোক্তারা। আইনশৃঙ্খলার অবনতি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে চালু কারখানা বন্ধের নজিরও রয়েছে।

তবে সরকার অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কিছু ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। নানামুখী পদক্ষেপের কারণে সরকার মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমাতে পেরেছে। পতনশীল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ঊর্ধ্বমুখী। টাকা পাচার ও হুন্ডি রোধ করে ডলারের প্রবাহ বাড়িয়ে টাকার মানও স্থিতিশীল রয়েছে। গত সরকারের বকেয়া বৈদেশিক ঋণের দায় শোধ করে চাপ হ্রাস করেছে। আইএমএফের সঙ্গে বেশ শক্তভাবেই দরকষাকষি করেছে। ব্যাংক খাতে লুটপাট বন্ধ করে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপও দৃশ্যমান। তবে ব্যাংকে এখনো স্বাভাবিকতা ফিরে আসেনি। সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিনিয়োগ বাড়ানো, জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে গতি আনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। এখন যেভাবে মব সৃষ্টি করে যেখানে-সেখানে হামলা হচ্ছে, সেগুলো বন্ধ করতে হবে। বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কতটুকু উন্নয়ন ঘটাতে পারে সেটি দেখার বিষয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করছে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনীতিকে চাঙা করার বিষয়টি। সরকারকে ক্ষমতায় এসেই মব সৃষ্টিকারী মৌলবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। তাহলে উদ্যোক্তাদের মনে আস্থার সঞ্চার হবে। তারা বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে।

ফেব্রুয়ারির মধ্যভাগে দায়িত্ব নিচ্ছে নতুন সরকার। ফলে তারা অর্থনীতির ক্ষেত্রে ‘সুখকর’ কোনো পরিস্থিতি পাচ্ছে না। অর্থনীতিকে সচল করতে ও বহু প্রত্যাশিত বেকারত্ব নিরসনে নতুন সরকারকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। প্রথমেই আসবে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণ। ২০২২ সালের আগস্ট থেকে গত বছরের মে পর্যন্ত এ হার ছিল ৯ শতাংশের ওপরে। অক্টোবরে তা ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে আসে। এরপর আবার মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে। নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। নির্বাচনের কারণে অনুৎপাদনশীল খাতে টাকার প্রবাহ বাড়ার কারণে জানুয়ারিতে এ হার আরও বাড়তে পারে।

ফেব্রুয়ারি ও মার্চে নির্বাচন, রোজা ও ঈদের বাড়তি চাহিদার কারণেও মূল্যস্ফীতির হার বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে নতুন সরকারের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। মূল্যস্ফীতির হার কমাতে হলে ডলারের বিপরীতে টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে হবে, পণ্য ও সেবার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ দুটিই বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ আইএমএফ চাচ্ছে ডলারের দাম বাড়াতে। এতে টাকার মান কমে গিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেবে। টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে হলে রেমিট্যান্স বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে বড় বাধা হুন্ডি। আওয়ামী লীগ আমলের হুন্ডিবাজরা পালিয়ে যাওয়ায় হুন্ডি কমেছে, ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বেড়েছে। হুন্ডিবাজরা যাতে আবার মাথাচাড়া দিতে না পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি দিতে হবে। পাশাপাশি রপ্তানি আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বর্তমানে রপ্তানি আয় নিম্নমুখী। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করে এ খাতকে চাঙা করাটাও একটি চ্যালেঞ্জ। এজন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের জোগান বাড়াতে হবে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাটাও জরুরি।

প্রবাদ আছে, ‘বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে, জনগণের কাছে সরকারের দাম কমে।’ বাজার যন্ত্রণা থেকে ভোক্তাকে স্বস্তি দিতে হবে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বেশির ভাগ সময়ই বাজার যন্ত্রণায় ভুগেছে ভোক্তা। ভোক্তার আয় কমেছে, খরচ বেড়েছে। ফলে সঞ্চয় ভেঙে ও ঋণ করে জীবিকা নির্বাহ করেছে। এখনো স্বস্তিতে নেই ভোক্তা। ফলে নতুন সরকারকে পণ্যের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে হবে। যেটি খুবই চ্যালেঞ্জিং।

এদিকে কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বর্তমান সরকার গত দেড় বছরে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি। এটি নতুন সরকারকে করতে হবে। এজন্য দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চয়তা, ঋণের সুদের হার কমানো, ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষেপ জরুরি। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করতে হবে। যাতে তারা বিনিয়োগে উৎসাহিত হন। দেশি বিনিয়োগ বাড়লে তাদের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগও আসবে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে মূলধন হিসাবে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ১৪ কোটি ডলার। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এ বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই।

গত ৪ বছর ধরে ঋণের সুদহার বাড়ানো হচ্ছে। চড়া সুদের কারণে ঋণের খরচ বেড়েছে। বিনিয়োগ না হওয়ার এটিও একটি কারণ। ঋণের সুদের হার কমালে টাকার প্রবাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে। এ আশঙ্কায় কমানো হচ্ছে না। এদিকে চড়া সুদের কারণে বিনিয়োগ বাড়ছে না। ফলে কর্মসংস্থানে চলছে মন্দা। শিল্প খাত ধুঁকছে। উদ্যোক্তারা সুদের হার কমানোর জোর দাবি করেছেন। তারা বলেছেন, সুদের হার কমলে বিনিয়োগ বাড়বে। এতে কর্মসংস্থান বেড়ে ভোক্তার আয় বৃদ্ধি পাবে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ ভোক্তা সহ্য করতে পারবে বাড়তি আয় দিয়ে। আর বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা নিয়ন্ত্রণ করলে পণ্যের দামও সহনীয় থেকে মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে।

বর্তমানে পুলিশ প্রশাসন ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো বড় চ্যালেঞ্জ। নিরাপত্তা না পেলে বিনিয়োগ আসবে না। চলমান শিল্পের সম্প্রসারণ হবে না। আওয়ামী লীগের পতনের পর চাঁদাবাজি ও দখলবাজি আরও বেড়েছে। নির্বাচনের পর দলীয় নেতাকর্মীরা আগ্রাসী ভূমিকায় নামতে পারে। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

আগামীতে নতুন সরকারের জন্য একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ হবে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু এখনই ব্যাংক কোম্পানি আইন সংস্কার নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে তীব্র বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। নতুন সরকারের পক্ষে বড় ব্যবসায়ীদের চাপ মোকাবিলা করে এ খাতে সংস্কার করা কঠিন। সংস্কার না করলে খাতটি মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবে না।

বিগত সরকারের সময়ে লুটপাটের অর্থ এখন খেলাপি হচ্ছে। খেলাপি বেড়ে ৬ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায় ছাড়িয়েছে। বাড়তি খেলাপির কারণে ব্যাংক খাতের সব সূচক নিম্নমুখী হচ্ছে। খেলাপির চাপ কমানো হবে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বাড়তি খেলাপি ঋণের কারণে আন্তর্জাতিক ঋণ মান যাচাইকারী সংস্থাগুলো বাংলাদেশের রেটিং কমিয়ে দিতে পারে। বৈদেশিক ব্যবসার ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাংকগুলো গ্যারান্টি ফি বা চার্জ আরোপ করতে পারে। এতে ব্যবসা খরচ আরও বেড়ে যাবে।

রাজনৈতিক সরকারের সময়ে নিয়মকানুন প্রয়োগে বেশ শিথিলতা থাকে। বিশেষ করে রাজনৈতিক চাপে বিধিবিধান প্রয়োগ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে ঋণ বিতরণের চাপ বেড়ে যাবে। ফলে ঋণ শৃঙ্খলা না রাখলে ব্যাংক খাত আবার সংকটে পড়বে। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন সরকারের লোকজন ঢুকবে। তাদের কারণে আমদানির চাহিদা বাড়বে। আমদানির নামে টাকা পাচার শুরু হলে আবার ডলারের সংকট দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে, তবে তা এখনো স্বস্তিদায়ক নয়। রোববার নিট রিজার্ভ ছিল ২৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। একে চলতি অর্থবছরে ৩৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

করোনার সময় থেকে রাজস্ব আয়ে মন্দা চলছে। টাকা ছাপিয়ে ওই সরকার ব্যয় নির্বাহ করেছে। ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে লাগামহীন গতিতে। বর্তমান সরকারের আমলে এ খাতে ঘাটতি আরও বেড়েছে। তবে তারা টাকা ছাপাচ্ছে না। বরং আওয়ামী লীগের সময়ে ছাপানো টাকা বাজার থেকে তুলে নিচ্ছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়বে। অথচ সরকারের ব্যয় বাড়বে। কারণ সরকারি কর্মীদের নতুন পে-স্কেল দিতে হবে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অর্থ ছাড় করতে হবে।

এ বাড়তি খরচ মেটাতে বর্ধিত হারে রাজস্ব আহরণ সম্ভব না হলে সরকারকে ঋণ করতে হবে। ব্যাংকের অবস্থাও ভালো নয়। ফলে ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে বেসরকারি খাত চাহিদা অনুযায়ী ঋণ পাবে না। তখন সরকার যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপানো শুরু করে তাহলে অর্থনীতির আবার সর্বনাশ হয়ে যাবে।

নতুন সরকারের আরেকটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আইএমএফের সঙ্গে দরকষাকষি। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে আইএমএফ আলোচনা এগিয়ে নিতে চায়নি। যেহেতু ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার আসবে তাদের সঙ্গেই আলোচনা করে চলমান সংস্কার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার আদায় করে ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় করতে চায়। আইএমএফের শর্তগুলো বেশ কঠিন। এসব শর্ত মানলে সরকার ভোক্তার কাছে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের অন্যতম শর্ত হচ্ছে-ডলারের দাম বাড়ানো, টাকার মান কমানো। এটি করলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। ফলে ভোক্তার ক্রয় ক্ষমতাও হ্রাস পাবে। যা ভোক্তাকে চাপে ফেলবে। জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে, ভর্তুকি কমাতে হবে। এটি করলে ভোক্তার ব্যয় বাড়বে, মূল্যস্ফীতিতে চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে। সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ও বিক্রি কমাতে হবে।

অথচ সমাজের স্বল্প আয়ের অনেক মানুষই সঞ্চয়পত্রের আয় দিয়ে সংসার চালান। তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এরকম আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়ন করলে সরকার ভোক্তার কাছে অজনপ্রিয় ওঠেবে। এক্ষেত্রে আইএমএফের সঙ্গে দরকষাকষিতে দক্ষতা ও দেশপ্রেম দেখানোর বিকল্প নেই। এদিকে সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে, নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। তখন সরকারি ব্যয় ও বিনিয়োগ বাড়বে। এর প্রভাবে চাঙা হবে শিল্প খাত।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category