বাংলাদেশ ব্যাংকের নবনিযুক্ত গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের পেশাগত পরিচয় ও ব্যবসায়িক লেনদেন নিয়ে আর্থিক খাতে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে তাঁর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের বড় অঙ্কের ঋণ এবং তা পুনঃতফসিল করার তথ্য সামনে আসায় নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিজিএমইএ ও ব্যাংক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মোস্তাকুর রহমান হেরা সোয়েটার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এই প্রতিষ্ঠানটির নামে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে (MTB) ৮৬ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই ঋণটি ইতিপূর্বে খেলাপি হয়ে গিয়েছিল। তবে গত বছরের জুনে বিশেষ সুবিধার আওতায় এই বিশাল অঙ্কের ঋণটি পুনঃতফসিল (Reschedule) করা হয়।
গভর্নর হওয়ার আগ পর্যন্ত মোস্তাকুর রহমান পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র স্ট্যান্ডিং কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এছাড়া আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব, ট্রাভেল এজেন্টদের সংগঠন আটাব এবং ঢাকা চেম্বারের সাথেও তাঁর সরাসরি ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা রয়েছে। এমনকি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (CSE) তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
মোস্তাকুর রহমানের মালিকানাধীন হেরা সোয়েটার্স মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (MTB) থেকে যে ৮৬ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছিল, তা দীর্ঘ সময় খেলাপি অবস্থায় ছিল। গত বছরের জুনে যে ‘বিশেষ সুবিধা’র আওতায় এটি পুনঃতফসিল করা হয়, তার কিছু উল্লেখযোগ্য দিক হলো:
খেলাপি তকমা মোচন: পুনঃতফসিলের ফলে প্রতিষ্ঠানটি কাগজে-কলমে ‘নিয়মিত’ গ্রাহক হিসেবে গণ্য হয়, যা তাঁকে গভর্নর পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদের জন্য যোগ্য হতে সহায়তা করেছে।
সুদ মওকুফ ও কিস্তি সুবিধা: সাধারণত এই ধরনের বিশেষ পুনঃতফসিলে বড় অঙ্কের সুদ মওকুফ এবং দীর্ঘ মেয়াদে কিস্তি পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়, যা ব্যাংকটির সাধারণ আমানতকারীদের জন্য এক ধরনের আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করে।
মোস্তাকুর রহমানের জীবনবৃত্তান্ত ও ব্যবসায়িক প্রোফাইল অনুযায়ী তাঁর স্বার্থের সংঘাতের প্রধান ক্ষেত্রগুলো নিম্নরূপ:
বিজিএমইএ ও রিহ্যাব: তিনি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ এবং আবাসন খাতের রিহ্যাবের প্রভাবশালী সদস্য। গভর্নর হিসেবে এই দুই খাতের জন্য ঋণসীমা বা সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনি কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আটাব ও ঢাকা চেম্বার: ট্রাভেল এজেন্টদের সংগঠন আটাব এবং ঢাকা চেম্বারের সদস্য হওয়ায় ব্যবসায়িক মহলের সাথে তাঁর গভীর যোগসূত্র রয়েছে।
স্টক এক্সচেঞ্জ কানেকশন: চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে কাজের অভিজ্ঞতা থাকায় শেয়ারবাজারের নীতি নির্ধারণেও তাঁর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রয়েছে।
সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর যে ১০টি বড় শিল্পগোষ্ঠীর (এস আলম, বেক্সিমকো, সামিট, বসুন্ধরা ইত্যাদি) বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছিলেন, মোস্তাকুর রহমানের জন্য সেই তদন্তগুলো এগিয়ে নেওয়া হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যেহেতু তিনি নিজেই একজন ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা ছিলেন, তাই বড় গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া তাঁর জন্য ‘অ্যাসিড টেস্ট’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অর্থনীতির এই সংকটকালে একজন ব্যবসায়ীর হাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাবিকাঠি তুলে দেওয়া ‘বেড়া দিয়ে ক্ষেত রক্ষা’ করার মতো চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ফেরাতে বেশ কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন:
রিজার্ভ বৃদ্ধি: ৫ আগস্ট সরকার পতনের সময় আইএমএফ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল ২০.৪৮ বিলিয়ন ডলার, যা গত মঙ্গলবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০.৩০ বিলিয়ন ডলারে।
খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র: তিনি খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছেন, যার ফলে ব্যাংক খাতের ৩৬ শতাংশ বা প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ব্যাংক একীভূতকরণ: অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে সংকটে পড়া ৫টি ইসলামি ধারার ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করেছেন।
যৌথ তদন্ত: এস আলম, বেক্সিমকো ও সামিট গ্রুপসহ ১০টি বড় শিল্পগোষ্ঠীর লুট হওয়া অর্থ উদ্ধারে যৌথ তদন্ত শুরু করেছিলেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, একজন সক্রিয় ব্যবসায়ীর গভর্নর পদে আসীন হওয়া ‘অ্যাসিড টেস্ট’-এর মতো। কারণ:
নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত: গভর্নর হিসেবে তাঁকে অনেক সময় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
স্বার্থের সংঘাত: নিজের এবং ব্যবসায়িক সহযোগীদের স্বার্থরক্ষা না করে তিনি কতটা নির্মোহভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি প্রয়োগ করতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
রাজনৈতিক তকমা: তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য হওয়ায় তাঁর পেশাদারিত্বের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য বেশি প্রাধান্য পায় কি না, সেটিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
আহসান এইচ মনসুর যেখানে এস আলম বা বেক্সিমকোর মতো বড় গ্রুপের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছিলেন, সেখানে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে মোস্তাকুর রহমান এই তদন্তগুলো কতটা ত্বরান্বিত করবেন, তা এখন দেখার বিষয়।