মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ। ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া সরাসরি সামরিক সংঘাতের উত্তাপ এখন দক্ষিণ এশিয়ার রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস উপসাগরীয় দেশগুলোর দোরগোড়ায়। গত কয়েক দিনের পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং কুয়েত ও কাতারের মতো দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটিতে বিস্ফোরণের শব্দে ওই অঞ্চলে বসবাসরত প্রায় ৮০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতে থাকা প্রবাসীরা মোবাইল ফোনে যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। কাতারের সানাইয়া এলাকায় কর্মরত প্রবাসী হারুনুর রশিদ জানান, মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার সময় মনে হচ্ছিল ভূমিকম্প হচ্ছে। আকাশ দিয়ে মিসাইল উড়ে যাওয়ার দৃশ্য এখন প্রবাসীদের নিত্যসঙ্গী।
আরব আমিরাতের দুবাই ও আবুধাবিতে থাকা শ্রমিকরা জানিয়েছেন, যুদ্ধের প্রভাবে অনেক জায়গায় ফ্লাইট ও এয়ারপোর্ট কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে। রাস্তায় মানুষের চলাচল কমে গেছে। প্রবাসীরা এখন কেবল কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখছেন। সবার মনে একটাই ভয়—অকেজো হয়ে যাওয়া কোনো মিসাইল শহরের জনপদে আছড়ে পড়লে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটতে পারে।
পরিস্থিতি বিবেচনা করে মধ্যপ্রাচ্যের চারটি দেশ—ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—এ অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য তাদের নিজ নিজ দূতাবাস থেকে বিশেষ সতর্কবার্তা ও জরুরি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে:
সাধারণ নির্দেশনা: সামরিক স্থাপনার ধারেকাছে না যাওয়া, অতি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়া এবং নিজ নিজ বাসস্থানে অবস্থান করা।
জরুরি কিট: সব সময় নিজের সাথে নগদ টাকা, পাসপোর্ট/সিভিল আইডি কার্ড, মোবাইল চার্জার, পাওয়ার ব্যাংক, প্রয়োজনীয় ওষুধ, শুকনো খাবার এবং পানি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়া বিধি: বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বা সামরিক চলাচলের কোনো ছবি বা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড না করার জন্য কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যোগাযোগ: যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে দূতাবাসের দেওয়া হটলাইন নম্বরগুলোতে ২৪ ঘণ্টা যোগাযোগের সুযোগ রাখা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা। সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতসহ এই অঞ্চল থেকে দেশের মোট রেমিট্যান্সের অর্ধেকেরও বেশি আসে। যুদ্ধের কারণে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বন্ধ হয়ে গেলে নির্মাণ শ্রমিকসহ বিশাল এক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে।
ইতিমধ্যেই আকাশপথ ও বিমান চলাচল স্থগিত হওয়ার কারণে নতুন করে যারা কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, তারা বিমানবন্দরে আটকা পড়েছেন। সরকার তাদের আবাসন ও সহায়তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর এক জরুরি বৈঠকে বসেন। বৈঠকে জানানো হয়:
তেহরানসহ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর দূতাবাস কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে।
বিদেশে আটকা পড়া কর্মীদের পরবর্তী সময়ে প্রবেশের জন্য কূটনৈতিক আলোচনা চলছে।
যেকোনো বড় ধরনের সংকটে প্রবাসীদের সরিয়ে নিতে বা সহায়তা দিতে ‘প্ল্যান-বি’ বা বিকল্প পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, বাংলাদেশ বিশ্বাস করে সংলাপ ও আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমেই এই বিরোধ নিষ্পত্তি সম্ভব। যুদ্ধ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
