-রিন্টু আনোয়ার
বংশীয় ছাগল ও বনেদি নানা জনের আলাদিনের চেরাগ, চল্লিশ চোরের নানা কাণ্ডের মাঝে বিশ্ববিদ্যিালয় শিক্ষকদের আন্দোলন। অনেকটা কিসের মধ্যে কী- অবস্থায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শাটডাউন অবস্থা। সর্বজনীন পেনশন ‘প্রত্যয় স্কিমের’ প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার ও শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের দাবিতে শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করে মাঠ কাঁপাচ্ছেন দেশের ৩৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা। তাদের সঙ্গে এগিয়ে এসেছেন কর্মচারীরাও। এ ক্ষেত্রে কোনো দলবেদল নেই। আওয়ামী, জাতীয়তাবাদী, জামায়াতি, ডান-বামের চেতরাবাজি নেই। লাল-নীল-সাদা-গোলাপীর প্যানেল রাজনীতি নেই। সব একাকাকার, একাট্টা।
এর আগে প্রত্যয় স্কিম বাতিলে সরকারকে গত ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিলেন তারা। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে সরকারের কথাবার্তা হচ্ছে। ফয়সসালা একটা হয়তো চলে আসবে। কিন্তু, পানি ঘোলা করার যতো কাণ্ড আছে তার কোনোটিই বাদ পড়েনি। মোটা দাগে শিক্ষকদের দাবি তিনটি হচ্ছে ১. সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রত্যয়’ কর্মসূচির প্রজ্ঞাপন বাতিল। ২. সুপার গ্রেডে (জ্যেষ্ঠ সচিবরা যে গ্রেডে বেতন পান) বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তি এবং ৩. শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতনকাঠামো। শুরুতে সরকারের দিক থেকে পাত্তা না দেয়ার একটি প্রবণতা থাকলেও পরে অবস্থা একটু বদলাতে থাকে। তবে অর্থমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রীসহ কয়েকজন বলেছেন, শিক্ষকদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা দেখছেন না তারা।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সাধারণত আনফান্ডেড, ফান্ডেড, ডিফাইন্ড বেনিফিটস (ডিবি), ডিফাইন্ড কন্ট্রিবিউশনস (ডিসি)—এই চার ধরনের পেনশন পদ্ধতি চালু রয়েছে। আনফান্ডেড পেনশনে কোনো কর্মীকে চাঁদা দিতে হয় না বলে এটির জন্য কোনো তহবিল সৃষ্টি হয় না। ফান্ডেড পেনশনে কর্মী বা প্রতিষ্ঠান বা উভয়কেই চাঁদা দিতে হয়। ডিবি পদ্ধতি সরকারি কর্মচারীদের জন্য। ডিসি পদ্ধতিতে কর্মী বা প্রতিষ্ঠান থেকে একটি তহবিলে অর্থ জমা হয় এবং সেখান থেকেই ব্যয় নির্বাহ করা হয়। কোনো কোনো দেশে অবশ্য বিমা কোম্পানির মাধ্যমেও পেনশনব্যবস্থা চালু আছে। এটা সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে যে বাংলাদেশে আর অনফান্ডেড পেনশন থাকবে না। নমিনিদের যে প্রশ্নটি এসেছে, বর্তমানে পেনশনভোগী মারা গেলে তাঁর স্বামী বা স্ত্রী আজীবন পেনশন পান। ক্ষেত্রবিশেষে তাঁদের প্রতিবন্ধী সন্তানও পান। এখন স্বামী বা স্ত্রীর পরিবর্তে নমিনি যিনি হবেন, তিনি পাবেন। বিশ্বচর্চাও এ রকমই। আনফান্ডেড ব্যবস্থা এখন কম দেশেই আছে।
সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রত্যয়’ কর্মসূচি চালু হয়েছে ১ জুলাই। রাষ্ট্রায়ত্ত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসহ ৪০৩টি সংস্থায় নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের জন্য প্রত্যয় প্রযোজ্য। কিন্তু গত মার্চে প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই বৈষম্যমূলক মনে করে প্রত্যয় বাতিলের দাবি করে আসছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন। তাদের দাবি, প্রত্যয় কর্মসূচি বৈষম্যমূলক। শুধু বৈষম্যমূলক নয়, এটা অপরিপক্বও। শিক্ষকদের এ বিরোধিতার জবাবে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের জবাব স্পষ্ট। বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন জনসংখ্যার সুবিধা (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) ভোগ করছে। এ সুবিধা কিন্তু বছর বছর কমতে থাকবে। বাড়তে থাকবে বয়স্ক মানুষ। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার। সব মানুষ যাতে সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে থাকতে পারে, সে কারণেই সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থা ছাড়া সবার জন্য নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা সম্ভব নয়। উদারভাবে হিসাব করলে বর্তমানে সরকারি ১২ লাখ, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত ইত্যাদি সংস্থার ৪ লাখ এবং পেনশনে যাওয়া অবসরভোগী ৭ লাখ অর্থাৎ ২৩ লাখ লোক পেনশনের আওতাভুক্ত। একটি পরিবারের সদস্য চারজন ধরলে প্রায় এক কোটি মানুষ এখন পেনশনের সংস্পর্শে আছেন। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাটি করা হয়েছে সব মানুষের কথা মাথায় রেখে। সুতরাং, বিদ্যমান পদ্ধতির তুলনায় সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা অংশগ্রহণমূলক হবে, এটাই স্বাভাবিক।
এমন বিরোধ ও বুঝের গোলমালে এক পর্যায়ে এ পাইপলাইনে ঢোকেন একজন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ইসহাক আলী খান পান্না। শিক্ষকদের সুবিধা-অসুবিধা, পদ-পদায়ন, নেতৃত্ব অনেক কিছু হ্যান্ডেলে এই ছাত্রের অনুঘটক হওয়ার রেকর্ড আছে। তার এবার এতে যুক্ত হওয়ার তথ্যটি জানিয়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া। তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইসহাক আলী খান পান্না আমাকে ফোন করেছিলেন, বলেছেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বসতে, কথা বলতে। কোথাকার আন্দোলনে এখন কোথায়, কোন খাতে, কার হাতে- তা যে কারো কাছেই বোধগম্য। ওবায়দুল কাদের ডেকেছেন, তার সাথে কথা বলতে পেরেছেন-এটাও শিক্ষকদের কারো কারো কাছে একটি ব্যাপার।
বিষয়টি মোটেই কোনো সাবেক বা বর্তমান ছাত্রনেতার নয়। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক বা সড়ক পরিবহণ মন্ত্রীরও নয়। প্রত্যয় কর্মসূচির প্রজ্ঞাপন জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বোঝাই যাচ্ছে ফয়সালা একটি হয়ে যাবে। প্রশ্ন তো অন্যখানে। পেনশন তো কেবল শিক্ষকদের জন্য নয়। পেনশন কর্তৃপক্ষ প্রত্যয় কার্যকর করতে চাইছে ৪০৩টি রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত ইত্যাদি সংস্থার ওপর। এগুলোর মধ্যে ৯০টি সংস্থা বর্তমানে সরকারি কর্মচারীদের মতো পেনশন দিয়ে থাকে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো এসব সংস্থার অনেকগুলোর মধ্যে প্রত্যয় নিয়ে ভেতরে–ভেতরে অসন্তোষ রয়েছে। সেখানে ফয়সালা আনবেন কোন ছাত্রনেতা। সড়ক বা দল রেখে ওবায়দুল কাদের এতো সব নিয়ে কতো খাটবেন?
একদিকে বিদ্যা-শিক্ষা সেক্টরের এ ঝামেলা, অন্যদিকে প্রশাসনের কিছু বিদ্বানজনের চুরি-ডাকাতি নয়, রীতিমতো দস্যুপণা। বেনজীর, মতিউর, আজিজ, সামছুজ্জোহাদের বেশ ক’জনের নামের সঙ্গেই ডক্টর লাগানো। সারা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রচলিত বিদ্যাতয়নিক ডিগ্রির বাইরে খ্যাতিমান ব্যক্তিদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে কর্মদক্ষতা ও মানবহিতৈষী কাজের অবদানের জন্য ‘সম্মানজনক ডক্টরেট ডিগ্রি’ বা অনারারি ডিগ্রি প্রদান করে আসে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দেশের অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তির এসব ডক্টরেট ডিগ্রি আছে। মূলত এসব ব্যক্তির সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা রাষ্ট্রে বৈপ্লবিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এসব ডিগ্রির মূল্যায়ন শত পিএইচডির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, দেশের ‘কিছু মানুষ’ ক্ষমতার জোসে ডক্টরেট বাগিয়ে নিচ্ছেন। তাও একেবারে ‘একাডেমিকভাবে পিএইচডি’। দেশি পিএইচডির বাজার যা–ই হোক, নামের আগে ‘ড.’ লেখার খায়েস পূরণের নিমিত্তে এই সব ‘ডিগ্রি’ এখন সমাজে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যোগ্যতা ও নিয়মনীতি তোয়াক্কা করতে হচ্ছে না তাদের। সাবেক আইজিপি বেনজীরের ক্ষমতা ও অর্থ সম্পদের জমিদারি’ কায়েমের ডামাডোলের মাঝে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডিতে দেশ মাত করে দিয়েছেন। এখন সেটা বাতিলের কথা উঠেছে। এ আরেক তেলেসমাতি। নিয়ম শিথিল করে বেনজীরের তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন-এসইসির চেয়ারম্যান সুপারিশপত্রে লিখেছেন, বেনজীর ডিএমপির সাবেক কমিশনার ও র্যাবের মহাপরিচালক। সমাজের এ রকম একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিকে ডিবিএ প্রোগ্রামে বিশেষ বিবেচনায় হলেও ভর্তির অনুমতি দিলে দেশের কল্যাণে কাজে আসবে। এমন সুপারিশকারী ও ব্যক্তি দেশের কতো কল্যাণে আসছে তা সবার সামনে স্পষ্ট। মতিউর, বেনজির আর আজিজ। তাঁদের জীবনালেখ্য নিয়ে গবেষণায় এখন দেশ যখন গরম তখন একটি বিষয় লক্ষনীয়—এঁরা সবাই ডক্টরেট ডিগ্রিধারী। কথায় আছে, ‘গাছেরটা খাওয়া আর তলারটাও কুড়নো।’ সাফল্যমণ্ডিত কর্মময় জীবনে দোর্দণ্ড প্রতাপ, ক্ষমতা, রাষ্ট্রীয় পদক ও অর্থবিত্তের বিপুল সম্ভারের পরও যেন তাঁদের বুকে একটা শূন্যতা রয়ে যায়। আর তা হচ্ছে একটা ডক্টরেট বা পিএইচডি ডিগ্রি! নামের আগে ড. যোগ।
প্রখ্যাত জ্ঞানতাপস অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে পিএইচডি শেষ না করেই চলে এসেছিলেন। হাজারো পিএইচডির গুরু ছিলেন তিনি। বর্তমানে পিএইচডির এই দশা দেখলে তিনি কী বলতেন জানি না। ক্ষমতা,অর্থবিত্তের পর এই পিএইচডিও যদি দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রক্ষা না পায়, তাহলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার বটে!
বিষয়টি পিএইডি ডিগ্রিটির জন্য চরম অসম্মানের। পিএইচডিদাতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যও কলঙ্কের। আর জীবনের দীর্ঘ সময় শিক্ষা-গবেষণায় সীমাহীন পরিশ্রমে ডক্টরেট অর্জনকারীদের জন্য কতো বেদনার তা কেবল তারাই জানেন, শিক্ষানুরাগীরা বাকিরা কেবল কিছুটা উপলব্ধি করতে পারেন মাত্র। সেই সঙ্গে পারেন ছি ছি করে ঘৃণঅর জানান দিতে। আর কিছুই করার নেই তাদের।
উচ্চশিক্ষার যে কোনো পর্যায়ে গবেষণাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। অন্য যে কোনো সেক্টরে কাজ করে গবেষণা করার ইচ্ছা অনেকেরই থাকতে পারে। পিএইচডি ডিগ্রি মূলত গবেষণার স্বীকৃতি। আবার দেশের যে কোনো সেক্টরের যে কোনো কাজের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু, এখানে বাস্তবটা বড় বেদনার। আর এ অবস্থার মাঝেই এখন দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু হতে যাচ্ছে। এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানান কথার বাজার বেশ গরম। কিছু বিষয়ে বিতর্কের মাঝে ভালো দিকও থাকে। এতে কিছু প্রশ্নের অবসান হয়। জটিলতা কমে। পি এইচ ডি ডিগ্রি দেয়া না দেয়া একটি ইউনিভার্সিটির একাডেমিক ক্যাপাসিটির উপর নির্ভর করে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি সেই সক্ষমতা অর্জন করতে পারে মন্দ কি? অন্তত ফ্যাক বা ভূয়া পিএইচডির প্রবণতা তো কমবে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পিএইচডি কোর্স চালু বিষয়ক সিস্টেমিক বিল্ডিং ব্লক গুলোর (মান সম্মত শিক্ষক, লাইব্রেরী, অবকাঠামো, ইউনিভার্সিটিগুলোর একাডেমিক সময় বন্টন ও কস্ট এলোকেশন ইত্যাদি) ক্যাপাসিটি ও ফিজিবিলিটি দেখা দরকার।
নীলক্ষেত থেকে কপি পেস্ট, ভাড়াটে লেখকের সন্ধর্ভ ও ভূয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে অর্জিত পিএইচডি সনদ চিহ্নিত করে এগুলি বাতিলের উদ্যোগ না নিলে লাখে লাখে অযোগ্য পিএইচডি ডিগ্রীধারী লুটেরারা গোটা দেশ গিলে খাবে। আর অযোগ্যদের ভিড়ে যোগ্যরা মুখ লুকাবে। কে না চায়, দেশে উচ্চ শিক্ষার আরো প্রসারণ ও উন্নয়ন? কিন্তু, শিক্ষা-শিক্ষণের নামে জোচ্চুরি, বিদ্বানদের দুর্বৃত্তায়নের ছাড়পত্র কাম্য নয়। অনেক হয়েছে। আর কতো?
লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট