ভেনিজুয়েলা থেকে ইরান—বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের সুর যখন তীব্র, তখন প্রশ্ন উঠেছে ওয়াশিংটনের পরবর্তী টার্গেট কে? সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভূরাজনীতির পরবর্তী বড় রণাঙ্গন হতে পারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমার।
দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধ এখন আর নিছক কোনো অভ্যন্তরীণ সংকট নেই; বরং এটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের স্পর্শকাতর ভূরাজনৈতিক অক্ষে পরিণত হয়েছে, যেখানে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন।
চীনের ‘কৌশলগত প্রবেশদ্বার’ ও যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথা মিয়ানমারকে কেন্দ্র করে এই স্নায়ুযুদ্ধের মূল কারণ হলো রাখাইন রাজ্য এবং সেখানে চীনের নির্মিত কিয়াকফিউ ডিপ-সি পোর্ট (Kyaukphyu Deep-Sea Port)।
চীনের লাভ: বেইজিংয়ের জন্য এই বন্দরটি কেবল বাণিজ্যের মাধ্যম নয়, বরং এটি তাদের ‘মালাক্কা ডিলেমা’ বা মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর প্রধান উপায়। এই বন্দর ব্যবহার করে চীন বঙ্গোপসাগর হয়ে সরাসরি ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত জ্বালানি ও বাণিজ্যের বিকল্প করিডোর গড়ে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ: যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা (কোয়াড জোট) এই বন্দরটিকে ভারত মহাসাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান নৌ ও সামরিক উপস্থিতির মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখছে।
‘ব্রেভ বার্মা অ্যাক্ট’: নিছক নিষেধাজ্ঞা নাকি সরকার পতনের ছক? সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসে বিপুল ভোটে পাস হওয়া ‘ব্রেভ বার্মা অ্যাক্ট’ (Brave Burma Act) পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি শুধু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কোনো সাধারণ বিল নয়, বরং মিয়ানমারের জান্তা সরকারের পতন (Regime Change) ঘটানোর একটি সুপরিকল্পিত মার্কিন কৌশল।
এই অ্যাক্টের প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো:
আর্থিক মেরুদণ্ড ভাঙা: জান্তা সরকারের প্রধান আয়ের উৎস—মিয়ানমার অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এন্টারপ্রাইজ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।
বিমান হামলা বন্ধ করা: সামরিক বাহিনীকে বিমান জ্বালানি সরবরাহকারী বিদেশি কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া, যাতে তারা বিদ্রোহীদের ওপর বিমান হামলা চালাতে না পারে।
বিদ্রোহীদের সহায়তা: জান্তাবিরোধী এবং জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে (যেমন- কাচিন ইনডিপেনডেন্স আর্মি) কৌশলগত ও নন-লিথাল সামরিক সহায়তা দেওয়া।
আইএমএফ-এ কোণঠাসা করা: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (IMF) মিয়ানমারের ভোটাধিকার স্থগিত করে তাদের আন্তর্জাতিক ঋণ পাওয়ার পথ বন্ধ করা।
চীনের বলয়ে জান্তা ও ট্রাম্প প্রশাসনের ‘স্বার্থনির্ভর’ নীতি বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বৈধতার সংকটে পড়ে মিয়ানমারের জান্তা সরকার এখন পুরোপুরি চীন ও রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। রাশিয়া থেকে অত্যাধুনিক ড্রোন ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনায় ওয়াশিংটন আরও ক্ষুব্ধ হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের এই তৎপরতা গণতন্ত্র বা মানবাধিকারের চেয়ে তাদের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার সাথেই বেশি সম্পর্কিত। তারা বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত টিকিয়ে রাখতে চায়, কারণ এতে তাদের অস্ত্র ব্যবসা লাভবান হয়।” রাখাইন ও আরাকান আর্মির চূড়ান্ত লড়াই পুরো সমীকরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে রাখাইন রাজ্য এবং জান্তাবিরোধী সশস্ত্র সংগঠন ‘আরাকান আর্মি’।
বর্তমানে রাখাইনের ৮০ শতাংশের বেশি এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে।
১৭টি টাউনশিপের মধ্যে মাত্র ৩টি জান্তার দখলে রয়েছে, যার একটি হলো কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘কিয়াকফিউ বন্দর’। এই বন্দরের দখল নিতে এখন জোর লড়াই চালাচ্ছে আরাকান আর্মি।
ভবিষ্যৎ কোন দিকে? সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রবল চাপ সামরিক জান্তাকে সহজে নতি স্বীকার করাবে না; বরং এটি তাদের আরও কট্টর অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে। চীন ও রাশিয়ার সমর্থন নিয়ে জান্তা সরকার ইতোমধ্যে কিছু হারানো অঞ্চল পুনর্দখল করেছে। ফলে দুই বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে যে সুযোগ ছিল, তা এখন অনেকটাই সংকুচিত হয়ে এসেছে।
তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, রাখাইন এখন আর কেবল একটি প্রাদেশিক সংঘাতের ক্ষেত্র নয়, এটি এখন ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতির এক জ্বলন্ত কেন্দ্রবিন্দু।