বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির দিনটি একটি অভাবনীয় এবং চমকপ্রদ অধ্যায় হিসেবে খোদাই করা আছে। দিনটি সাধারণ মানুষের কাছে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ বা ‘এক-এগারো’ নামেই সবচেয়ে বেশি পরিচিত। সেই চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়টিতে দেশের শাসনভার চলে যায় এমন একটি সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে, যাদের দাপটে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুই নেত্রীসহ বাঘা বাঘা রাজনীতিবিদ এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত তটস্থ থাকতেন। দুর্নীতি দমনের নামে সে সময় রাজনৈতিক নেতাদের গণহারে গ্রেফতার, ব্যবসায়ীদের হয়রানি এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের মতো বহু গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল সেই সরকারের কুশীলবদের বিরুদ্ধে। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, ক্ষমতার পালাবদলের পর এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও, সেই সময়কার মূল কারিগরদের কাউকেই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের মাটিতে কোনো আইনি প্রক্রিয়ার বা দৃশ্যমান জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয়নি। বরং একসময়ের সেই দাপুটে কর্তাব্যক্তিরা আজ বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নে, নিজেদের মতো করে এক ভিন্নধর্মী ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপন করছেন। তাদের কেউ আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন, কেউ চালাচ্ছেন রেস্তোরাঁ, কেউবা আবার নীরবে প্রবাসে সাধারণ কর্মীর জীবন বেছে নিয়েছেন।
এক-এগারোর সেই সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখ ছিলেন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই গভর্নর, যিনি প্রায় বিশ বছর বিশ্বব্যাংকে এবং পাঁচ বছর পিকেএসএফ-এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তিনি ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের প্রায় পরপরই দেশত্যাগ করেন। অবশ্য আগে থেকেই তার যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ছিল। দেশ ছাড়ার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড স্টেটের পটোম্যাকে স্থায়ী হন। সেখানে তিনি দুটি বাড়ি কিনেছেন; যার একটিতে তিনি সস্ত্রীক বসবাস করেন এবং অপরটিতে তার কন্যার পরিবার থাকে। চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, একসময় যিনি দোর্দণ্ড প্রতাপে দেশ চালিয়েছেন, তিনি পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ায় ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ বিষয়ে ভিজিটিং স্কলার হিসেবে গবেষণা ও শিক্ষকতার পেশায় যুক্ত হন। সেখানে তিনি ‘উন্নয়নশীল দেশের গণতন্ত্রের বিকাশ’ এবং ‘সামাজিক ব্যবসা ও ক্ষুদ্রঋণ’ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেছেন। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী পদমর্যাদার একজন ব্যক্তি হিসেবে তার এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বেশ আলোচিত ছিল।
সে সময়কার ঘটনার নেপথ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদকে। ২০০৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি সেনাপ্রধানের পদ থেকে স্বাভাবিক অবসর গ্রহণ করেন এবং ওই বছরেরই ১৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। শুরুতে তিনি ফ্লোরিডায় তার ছোট ভাই ও ছেলের কাছে অবস্থান করতেন। কিন্তু পরবর্তীতে তার শরীরে ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়লে চিকিৎসার সুবিধার্থে তিনি নিউইয়র্কের কুইন্সে বসবাস শুরু করেন। এরই মাঝে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনকার্ড বা নাগরিকত্ব লাভ করেন, যার ফলে সেখানকার একজন নাগরিক হিসেবে বিশেষ সুবিধায় তিনি হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পান। ক্যান্সারের পাশাপাশি তার স্পাইনাল কর্ডের পাঁচটি স্থানে ক্ষত তৈরি হওয়ায় তাকে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন এবং কেমোথেরাপির মতো কঠিন চিকিৎসাপদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। টানা প্রায় পাঁচ বছর লোকচক্ষুর অন্তরালে এক প্রকার আত্মগোপনে থাকার পর, ২০১৫ সালে ফ্লোরিডায় আয়োজিত একটি রবীন্দ্র সম্মেলনের মঞ্চে তাকে পুনরায় জনসমক্ষে দেখা যায়। অবসর জীবনে তিনি ‘শান্তি পথে’ শিরোনামে একটি বইও রচনা করেছেন, যেখানে এক-এগারো সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু ঘটনার নিজস্ব ব্যাখ্যা তিনি তুলে ধরেছেন।
এক-এগারোর প্রেক্ষাপট তৈরির পেছনে যার ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক রয়েছে, তিনি হলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। ক্ষমতার পালাবদলের পর তার জীবনের শেষ সময়গুলো মোটেও সুখকর ছিল না। জীবনের পড়ন্ত বেলায় তিনি গুলশানের বাসভবনে একাকী এবং অনেকটাই নিভৃত জীবনযাপন করতেন। এ সময় তিনি রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানেই আর যোগ দিতেন না। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, বয়সের ভারে তিনি একপর্যায়ে তার মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত ২০১২ সালের ১০ ডিসেম্বর, ৮১ বছর বয়সে থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই সাবেক রাষ্ট্রপতির মৃত্যু হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করার জন্য ‘গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি’ নামে যে বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছিল, তার প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ২০০৮ সালের শেষের দিকে তিনি বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়োগ পান। সেখানে স্বাভাবিক মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও টানা চার দফায় মোট ছয় বছর তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালে ঢাকায় ফিরে আসার পর তিনি পুরোপুরি ভিন্ন এক পেশায় যুক্ত হন। বর্তমানে তিনি ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় একটি অত্যাধুনিক পাঁচতারা মানের রেস্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠা করে সেটি পরিচালনা করছেন। দুই মেয়ে বিদেশে থাকায় এখন তিনি সস্ত্রীক এই রেস্টুরেন্ট ব্যবসাই উপভোগ করছেন।
অন্যদিকে, সে সময়কার আরেক আলোচিত ও সমালোচিত সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন চাকরিচ্যুত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারী। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিকে তিনি ওয়াশিংটন ডিসির বাংলাদেশ দূতাবাসে সামরিক অ্যাটাচির পদ নিয়ে দেশ ছাড়েন। পরবর্তীতে নতুন সরকার তাকে দেশে ফেরার নির্দেশ দিলেও তিনি তা অমান্য করেন। শেষ পর্যন্ত স্ত্রীর আবেদনের ভিত্তিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ অভিবাসীর মর্যাদা লাভ করেন। একসময় যার ইশারায় দেশের অনেক কিছু নিয়ন্ত্রিত হতো, সেই ফজলুল বারী যুক্তরাষ্ট্রে ডমিনোজ পিজা এবং একটি ওষুধ কোম্পানির সাধারণ ডেলিভারি ম্যান হিসেবেও কাজ করেছেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়, যা ক্ষমতার পালাবদলের এক চরম নিয়তির উদাহরণ।
প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের (ডিজিএফআই) সে সময়ের দাপুটে পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন ২০০৯ সালের ১৭ মে সব ধরনের আর্থিক সুবিধা নিয়ে সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এরপর তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয়ে দেশত্যাগ করেন। জানা যায়, তিনি বর্তমানে দুবাইয়ে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত আছেন। ডিজিএফআইয়ের আরেক ক্ষমতাধর কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) সাঈদ জোয়ার্দারও বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। বিভিন্ন সূত্রমতে, তারা দুজনেই কাজের সুবাদে কানাডা ও দুবাইয়ের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াতের মধ্যে রয়েছেন।
এক-এগারোর ঠিক আগে আগে উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী পরবর্তীতে সেনা-সমর্থিত সরকারের আমলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় সংসদে তার কার্যক্রম নিয়ে চরম সমালোচনা শুরু হলে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। বর্তমানে তিনি ঢাকার ডিওএইচএস এলাকার নিজ বাসাতেই নিভৃত জীবন কাটাচ্ছেন এবং বন্ধুদের সাথে নিয়মিত প্রাতঃভ্রমণ করে সময় পার করছেন। সংসদীয় কমিটিগুলো তাকে একাধিকবার তলব করলেও তিনি কখনো সেখানে উপস্থিত হননি।
সে সময়কার আরেক প্রভাবশালী উপদেষ্টা এবং গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) এম এ মতিন বর্তমানে চট্টগ্রামের নিজ বাড়িতে বসবাস করছেন এবং সেখানে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল পরিচালনা করে সময় কাটাচ্ছেন।
বেসামরিক উপদেষ্টাদের মধ্যে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ছিলেন বেশ সক্রিয়। তিনি পরবর্তীতে তার পৈতৃক সম্পত্তি ভাগাভাগির মাধ্যমে দৈনিক ইত্তেফাক থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন এবং পুনরায় আইন পেশায় মনোযোগ দেন। উচ্চ আদালতের বিভিন্ন ইস্যুতে তিনি আজও সরব এবং তাকে নিয়মিত বিভিন্ন টেলিভিশনের টকশোতে দেখা যায়। আরেক সুপরিচিত উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বর্তমানে তার নিজস্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা এনজিও ‘পিপিআরসি’-এর চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করছেন এবং বিভিন্ন বিদেশি সংস্থার পরামর্শক হিসেবে ব্যস্ত জীবন পার করছেন। সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ সরকারের সময়কার মতো এখন আর ততটা সরব না হলেও, তিনি তার ব্যক্তিগত আইন পেশায় নিয়মিত সময় দিচ্ছেন।
এক-এগারোর পটপরিবর্তনে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের বিষয়ে সে সময় ঢাকায় দায়িত্বরত বেশ কয়েকজন বিদেশি কূটনীতিকের বিরুদ্ধেও বিস্তর অভিযোগ উঠেছিল। তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রেসিয়া এ বিউটেনিস ২০০৭ সালে ঢাকা থেকে বিদায় নেওয়ার পর শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের (স্টেট ডিপার্টমেন্ট) মানব পাচার বিষয়ক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে কর্মরত। তার উত্তরসূরি হিসেবে ঢাকায় আসা জেমস এফ মরিয়ার্টি আনুষ্ঠানিক কূটনীতি থেকে অবসর নিলেও, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে গঠিত একটি ত্রিপক্ষীয় জোটের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে ২০১৫ সাল থেকে ঢাকায় কাজ করে যাচ্ছেন।
সে সময়ের ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী বর্তমানে পেরুতে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মাঝে তিনি ব্রিটিশ সরকারের ফরেন ও কমনওয়েলথ অফিসের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউশন্সের পরিচালকের দায়িত্বেও ছিলেন। তার পরবর্তী ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্টিভেন ইভান্সও দায়িত্ব শেষে লন্ডনে পররাষ্ট্র দফতরে ফিরে গেছেন। অন্যদিকে, সে সময়কার জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী রেনাটা ডিজালিয়েন তার বিতর্কিত ভূমিকার জন্য পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি মিয়ানমারে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিলেও, সেখানে রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয়ে জাতিসংঘের মূল অবস্থানের বাইরে গিয়ে মিয়ানমার সরকারকে সমর্থন করার অভিযোগে তাকে সেখান থেকেও প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।