ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের দাখিল করা হলফনামায় উঠে এসেছে সম্পদের এক চমকপ্রদ ও বৈচিত্র্যময় চিত্র। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত এই তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, সম্পদ ও বার্ষিক আয়ের দিক থেকে বিএনপি জোটের নেত্রীরা যোজন যোজন এগিয়ে রয়েছেন; তাদের অনেকেই রীতিমতো কোটিপতি। অন্যদিকে, সম্পদের দৌড়ে বেশ পিছিয়ে আছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা, তবে তাদের কারোর বিরুদ্ধেই কোনো মামলার তথ্য পাওয়া যায়নি।
হলফনামায় সম্পদের হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা জন্ম দিয়েছেন ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী। তার পারিবারিক স্বর্ণালঙ্কার ও ব্যক্তিগত সম্পদের বিশাল অংক সবার নজর কেড়েছে।
স্বর্ণালঙ্কার: ৩৯ বছর বয়সী নিপুণের ব্যক্তিগত মালিকানায় রয়েছে ৫০২ ভরি সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর গহনা। স্বামী অমিতাভ রায়ের নামে রয়েছে আরও ১০০ ভরি গহনা। অর্থাৎ, এই দম্পতি মোট ৬০২ ভরি স্বর্ণালঙ্কারের মালিক (যাকে তারা উপহার হিসেবে পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন)।
অস্থাবর সম্পদ ও আয়: পেশাগত কাজ ও বিনিয়োগ মিলিয়ে নিপুণ রায়ের বার্ষিক আয় প্রায় ৩০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ব্যাংকে তার ১ কোটি ১৩ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) রয়েছে। পাশাপাশি, দুই কোটি টাকার বেশি মূল্যের দুটি গাড়ি আছে তার। সব মিলিয়ে তার নিজের অস্থাবর সম্পদের মূল্যই প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
মামলা: তার বিরুদ্ধে থাকা ২৩টি মামলা থেকে গত বছর তিনি অব্যাহতি বা খালাস পেয়েছেন বলে হলফনামায় জানানো হয়েছে।
বিএনপির অন্যান্য নারী প্রার্থীরাও সম্পদে বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তাদের আর্থিক বিবরণীতেও কোটি টাকার সম্পদের ছড়াছড়ি দেখা গেছে:
সেলিমা রহমান (৮৫): বিএনপির এই প্রবীণ নেত্রী ও স্থায়ী কমিটির সদস্যের বার্ষিক আয় ৩৬ লাখ টাকার বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী তার মোট সম্পদের পরিমাণ ৬ কোটি ৮৮ লাখ ৯৫ হাজার ৭৩৭ টাকা। গত বছর নির্বাহী আদেশে তার বিরুদ্ধে থাকা আটটি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
শামীম আরা বেগম স্বপ্না (৬৬): জমি বিক্রির বড় অংকের আয়সহ তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি টাকা।
রেহেনা আক্তার রানু (৫৭): এই প্রার্থীর প্রায় ৩ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে।
সানজিদা ইসলাম তুলি (৪৩): তার বার্ষিক আয় ৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা হলেও, মোট সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ১৩ লাখ টাকা।
বিএনপি নেত্রীদের বিপুল সম্পদের বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য দলের প্রার্থীদের হলফনামায় বেশ সাদামাটা চিত্র ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে, জামায়াত প্রার্থীদের কারও বিরুদ্ধেই কোনো মামলার উল্লেখ নেই।
নূরুন্নিসা সিদ্দীকা (জামায়াত): জামায়াতে ইসলামীর এই প্রার্থীর বার্ষিক আয় মাত্র ১ লাখ ৬১ হাজার টাকা। তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩০ লাখ টাকা।
মাহমুদা আলম মিতু (এনসিপি): জাতীয় নাগরিক পার্টির এই প্রার্থীর (পেশায় চিকিৎসক) কোনো স্থাবর সম্পদ নেই। তবে তার ৩১ লাখ ২৮ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদ ও ৩০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার রয়েছে। তার বার্ষিক আয় ৩ লাখ টাকা।
সুলতানা জেসমিন (স্বতন্ত্র): স্বতন্ত্র জোটের এই ৩৪ বছর বয়সী প্রার্থীর বার্ষিক আয় সাড়ে ৫ লাখ টাকা এবং সম্পদের পরিমাণ সাড়ে ২৮ লাখ টাকা। গত বছর তার বিরুদ্ধে থাকা পাঁচটি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে ৫০টি আসনের মধ্যে ৪৯টি আসনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে:
বিএনপি জোট: ৩৬ জন
জামায়াতে ইসলামী: ১২ জন
স্বতন্ত্র জোট: ১ জন
উল্লেখ্য, একজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও তার আপিলের সুযোগ রয়েছে। আগামী ২৯ এপ্রিল প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় শেষ হবে। যেহেতু আসন সংখ্যার বিপরীতে কোনো অতিরিক্ত বা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নেই, তাই সময়সীমা পার হলেই তারা সবাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষিত হবেন।