• মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:০৫ অপরাহ্ন

অব্যবহৃত জমিতে ‘সৌরবিদ্যুৎ’ উৎপাদন করতে চায় রেল

Reporter Name / ৪ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশ রেলওয়ে তার হাজার হাজার একর অব্যবহৃত ও নিষ্কণ্টক জমি কাজে লাগিয়ে এবার বিদ্যুৎ ব্যবসার বিশাল এক দিগন্তে পা রাখতে যাচ্ছে। ট্রেনের চাকা ঘোরানোর পাশাপাশি এখন রেলের জমিতে উৎপাদিত হবে পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে অন্তত ১০ একর আয়তনের বড় বড় প্লট চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ যেমন রেলের রাজস্ব বাড়াবে, তেমনি দেশের জ্বালানি সংকটেও বড় ভূমিকা রাখবে।

১০ একরের ‘ম্যাজিক নম্বর’ ও ব্যবসায়িক ছক

রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগকারীদের প্রধান শর্ত হলো জমির বিশালতা। সাধারণত ১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রায় ৩ একর জমির প্রয়োজন হয়। তবে কোনো প্রকল্পকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক বা ‘ভায়াবল’ করতে বিনিয়োগকারীরা অন্তত ১০ একরের নিষ্কণ্টক জমি দাবি করছেন।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় রেলের জমিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাব্যতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সেখানে বেশ কিছু বেসরকারি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়ে বড় আকারের জমি পাওয়ার শর্তে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিনিয়োগকারীদের এই চাহিদাকে মাথায় রেখেই রেল কর্তৃপক্ষ এখন তাদের ভূ-সম্পত্তি শাখাকে বড় ও মামলা-জটিলতামুক্ত জমির তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে।

কোথায় আছে সেই জমি?

রেলের মোট দুই অঞ্চলের মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলেই বড় ও একটানা জমির পরিমাণ বেশি।

  • পশ্চিমাঞ্চল: পাকশী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও সৈয়দপুর এলাকায় বড় বড় নিষ্কণ্টক প্লট পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

  • পূর্বাঞ্চল: চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী ও নবনির্মিত কক্সবাজার রেলপথের আশেপাশে বেশ কিছু এলাকাকে প্রাথমিক তালিকায় রাখা হয়েছে।

রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, সৌরবিদ্যুতের প্যানেল বসানোর জন্য এমন জমি খোঁজা হচ্ছে যার সাথে জাতীয় গ্রিডের দূরত্ব খুব বেশি নয়। গ্রিড কানেক্টিভিটি যত কাছে হবে, প্রকল্প তত সাশ্রয়ী হবে।

রেলের বিশাল জমি: পরিসংখ্যানের আড়ালে সম্ভাবনা ও সংকট

রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি শাখার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিপুল পরিমাণ জমি থাকা সত্ত্বেও তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে না পারা রেলের একটি দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা।

এক নজরে রেলের জমির বর্তমান অবস্থা:

  • মোট জমি: ৬০ হাজার ২১ একর।

  • অপারেশনাল কাজে ব্যবহৃত: ৩০ হাজার ২৮৬ একর।

  • বৈধভাবে ইজারা দেওয়া: ১৪ হাজার ৪১১ একর।

  • অব্যবহৃত পড়ে আছে: ৮ হাজার ৫৫৪ একর।

  • অবৈধ দখলে: ৬ হাজার ৭৫৪ একর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ৮ হাজার ৫৫৪ একর অব্যবহৃত জমির মাত্র অর্ধেকও যদি সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা যায়, তবে দেশ কয়েক হাজার মেগাওয়াট গ্রিন এনার্জি পাবে।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি: সম্ভাবনা বনাম ঝুঁকি

এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চের পরিচালক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের প্রসারে প্রধান বাধা হলো জমির অভাব। রেলের অব্যবহৃত জমি ব্যবহার করাটা একটি অসাধারণ আইডিয়া। এতে সরকারের আয় বাড়বে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।”

তবে সাবধানী মন্তব্য করেছেন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান। তিনি তিনটি প্রধান ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন:

  1. ভবিষ্যৎ সংকট: দীর্ঘমেয়াদি (২০-২৫ বছর) চুক্তির ফলে ভবিষ্যতে রেললাইন সম্প্রসারণ বা ডাবল লাইনের জন্য জমির প্রয়োজন হলে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

  2. স্বচ্ছতার অভাব: জমি বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি না থাকলে দুর্নীতি বা অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

  3. আর্থিক ভারসাম্য: চুক্তির শর্ত যদি রেলের অনুকূলে না থাকে, তবে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

 বিজনেস মডেল কেমন হতে পারে?

রেল কর্তৃপক্ষ এখনই কোনো নির্দিষ্ট মডেলে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না। মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের মতে, এখানে কয়েকটি মডেল নিয়ে আলোচনা হতে পারে:

  • পিপিপি (Public-Private Partnership): সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারিত্ব।

  • মুনাফা ভাগাভাগি: উৎপাদিত বিদ্যুতের লাভের একটি অংশ রেল পাবে।

  • জমি ভাড়া: সরাসরি বার্ষিক বা মাসিক নির্দিষ্ট ভাড়ায় জমি দেওয়া।

  • সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ: ভাড়ার বদলে রেলের নিজস্ব স্টেশন বা সিগন্যালিং ব্যবস্থার জন্য কম দামে বিদ্যুৎ নেওয়া।

৬.জাতীয় স্বার্থ ও পরিবেশগত প্রভাব

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে। বাংলাদেশ সরকারও ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের একটি বড় অংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। রেলের এই উদ্যোগ সফল হলে কার্বন নিঃসরণ কমবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

রেলওয়ের জমির বর্তমান চিত্র (২০২৬)

মোট জমি: ৬০,০২১ একর

ব্যবহারের ধরন পরিমাণ (একর)
অপারেশনাল কাজে ব্যবহৃত ৩০,২৮৬
বৈধভাবে ইজারা দেওয়া ১৪,৪১১
অব্যবহৃত (সৌরবিদ্যুতের জন্য সম্ভাব্য) ৮,৫৫৪
অবৈধ দখলে থাকা ৬,৭৫৪
* তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ রেলওয়ে ভূ-সম্পত্তি শাখা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category