বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ও পবিত্র ধর্মীয় উৎসব হলো ‘বুদ্ধ পূর্ণিমা’। বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই পুণ্যতিথি উদযাপিত হয় বলে একে ‘বৈশাখী পূর্ণিমা’ বা ‘ভেসাক’ (Vesak)-ও বলা হয়ে থাকে। বিশ্বের কোটি কোটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর কাছে এই দিনটি কেবল একটি উৎসব নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি, মহামৈত্রী এবং অহিংসার এক গভীর আধ্যাত্মিক চেতনার দিন। গৌতম বুদ্ধের জীবনের তিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও অলৌকিক ঘটনা এই একই তিথিতে সংঘটিত হয়েছিল, যা দিনটিকে ঐতিহাসিকভাবে অনন্য করে তুলেছে।
বুদ্ধ পূর্ণিমার ইতিহাস মূলত মহামতি গৌতম বুদ্ধের জীবন ও দর্শনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই একটিমাত্র দিনে বুদ্ধের জীবনের তিনটি প্রধান অধ্যায়ের সূচনা ও সমাপ্তি ঘটেছিল:
পবিত্র জন্ম: খ্রিষ্টপূর্ব ৬২৩ অব্দে নেপালের লুম্বিনী কাননে রাজা শুদ্ধোধন ও রানি মহামায়ার ঘর আলো করে জন্ম নেন রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতম। রাজকীয় বৈভবের মাঝে জন্মগ্রহণ করলেও মানুষের জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। যেদিন তিনি জন্ম নেন, দিনটি ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা।
বুদ্ধত্ব বা বোধি লাভ: মানুষের দুঃখের কারণ ও তা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে ২৯ বছর বয়সে রাজপ্রাসাদ, স্ত্রী-পুত্র ও সব বৈষয়িক মোহ ত্যাগ করে তিনি সন্ন্যাস জীবন গ্রহণ করেন। দীর্ঘ ৬ বছর কঠোর সাধনার পর ভারতের বিহার রাজ্যের বুদ্ধগয়ায় একটি অশ্বত্থ গাছের (যা পরবর্তীতে বোধিবৃক্ষ নামে পরিচিত হয়) নিচে তিনি ‘বোধি’ বা পরম জ্ঞান লাভ করেন। সিদ্ধার্থ থেকে তিনি পরিণত হন ‘বুদ্ধ’-এ (যার অর্থ জ্ঞানী বা আলোকিত)। জ্ঞান লাভের সেই দিনটিও ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা।
মহাপরিনির্বাণ: বুদ্ধত্ব লাভের পর দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে তিনি মানুষের মাঝে অহিংসা, সাম্য এবং মৈত্রীর বাণী প্রচার করেন। অবশেষে ৮০ বছর বয়সে ভারতের উত্তর প্রদেশের কুশীনগরে দুটি শালবৃক্ষের নিচে তিনি দেহত্যাগ বা ‘মহাপরিনির্বাণ’ লাভ করেন। কাকতালীয়ভাবে এই দিনটিও ছিল সেই পবিত্র বৈশাখী পূর্ণিমা।
এই তিনটি অবিস্মরণীয় ঘটনা একই তিথিতে ঘটায় বৌদ্ধদের কাছে বৈশাখী পূর্ণিমার দিনটি পরম ভক্তি ও শ্রদ্ধার।
বুদ্ধ পূর্ণিমা অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও ভক্তির সাথে পালন করা হয়। এই দিনে আড়ম্বরের চেয়ে আত্মশুদ্ধি এবং পুণ্যকর্মের প্রতি বেশি জোর দেওয়া হয়। সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায় দিনটিতে যেসব রীতিনীতি ও ধর্মাচার পালন করে থাকেন, তার একটি চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
১. মন্দিরে প্রার্থনা ও পুণ্যকর্ম: ভোরবেলায় স্নান সেরে পরিষ্কার বা সাদা রঙের পোশাক পরিধান করে পুণ্যার্থীরা স্থানীয় বৌদ্ধ বিহার বা প্যাগোডায় সমবেত হন। সেখানে বুদ্ধপূজা, পঞ্চশীল (পাঁচটি নৈতিক নিয়ম), অষ্টশীল এবং ত্রিপিটক পাঠ করা হয়। ভিক্ষু সংঘের (বৌদ্ধ সন্ন্যাসী) উদ্দ্যেশে সংঘদান ও পিন্ডদান (খাবার প্রদান) করা হয়।
২. বোধিবৃক্ষে জল সিঞ্চন:
যেহেতু বুদ্ধ একটি অশ্বত্থ গাছের নিচে জ্ঞান লাভ করেছিলেন, তাই প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারে থাকা বোধিবৃক্ষকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করা হয়। বুদ্ধ পূর্ণিমার দিনে পুণ্যার্থীরা বোধিবৃক্ষের মূলে চন্দন মিশ্রিত পবিত্র জল সিঞ্চন করেন এবং প্রদীপ ও ধূপ জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
৩. বুদ্ধমূর্তি স্নান ও বন্দনা:
অনেক বিহারে এই দিনে গৌতম বুদ্ধের মূর্তিকে সুগন্ধি জল দিয়ে স্নান করানো হয়। বুদ্ধের অহিংসা ও করুণার আদর্শ স্মরণ করে বুদ্ধমূর্তির সামনে ফুল, ফল, মোমবাতি এবং ধূপকাঠি নিবেদন করা হয়।
৪. শান্তি শোভাযাত্রা:
সকালবেলা বৌদ্ধ সম্প্রদায় বিভিন্ন স্থানে বর্ণাঢ্য শান্তি শোভাযাত্রা বা প্রভাতফেরির আয়োজন করে। হাতে বৌদ্ধ ধর্মের পঞ্চবর্ণের পতাকা (নীল, হলুদ, লাল, সাদা ও মিশ্র রং) এবং বুদ্ধের বাণী সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে তারা পরিক্রমা করেন।
৫. জীবহত্যা থেকে বিরত থাকা ও প্রাণী অবমুক্তকরণ:
বুদ্ধের প্রধান শিক্ষাই হলো অহিংসা। তাই বুদ্ধ পূর্ণিমার দিনে বৌদ্ধরা কঠোরভাবে যেকোনো ধরনের প্রাণী হত্যা থেকে বিরত থাকেন এবং সম্পূর্ণ নিরামিষ আহার গ্রহণ করেন। দিনটিতে খাঁচায় বন্দি পাখি, মাছ বা অন্যান্য প্রাণীদের অবমুক্ত করে তাদের প্রতি করুণা প্রদর্শন করা হয়।
৬. দান ও মানবসেবা:
‘দান’ বৌদ্ধ ধর্মের একটি অন্যতম প্রধান অঙ্গ। এই দিনে গরিব ও অসহায় মানুষদের মাঝে খাবার, বস্ত্র ও অর্থ বিতরণ করা হয়। অনেক বিহারে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি এবং বিনা মূল্যে চিকিৎসা শিবিরের আয়োজন করা হয়।
৭. বিশ্বশান্তির জন্য প্রার্থনা:
সন্ধ্যায় বিহারগুলোতে হাজারো প্রদীপ প্রজ্বালন করে এক স্বর্গীয় আবেশ তৈরি করা হয়। সমবেত প্রার্থনার মাধ্যমে বুদ্ধের সেই অমোঘ বাণী—“সব্বে সত্তা সুখিতা হোন্তু” (জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক)—উচ্চারণ করে দেশ ও সমগ্র বিশ্বের শান্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনা করা হয়।
বুদ্ধ পূর্ণিমা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি হানাহানি, লোভ ও অহংকারের পৃথিবীতে অহিংসা, দয়া ও সাম্যের এক বিশাল অনুস্মারক। আড়াই হাজার বছর আগে গৌতম বুদ্ধ যে সম্প্রীতি ও মানবতার দর্শন প্রচার করেছিলেন, বুদ্ধ পূর্ণিমার এই পবিত্র আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আজও তা বিশ্বজুড়ে সজীব হয়ে ওঠে।