সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক শিশু ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জনমনে তীব্র ক্ষোভ, আতঙ্ক ও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী এক অবুঝ শিশুকে ধর্ষণের পর পৈশাচিকভাবে হত্যার ঘটনাটি পুরো সমাজব্যবস্থার ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। একটি স্বাধীন দেশে শিশুরা কেন নিজ বাসস্থানে বা বাড়ির আঙিনায় সুরক্ষিত নয়—এই প্রশ্ন আজ সর্বত্র উচ্চারিত হচ্ছে। মানবাধিকারকর্মী, আইনজ্ঞ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের জঘন্য অপরাধের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও বিচারের চরম দীর্ঘসূত্রতা। অপরাধীরা যখন দেখে যে আইনের ফাঁকফোকর গলে সহজেই পার পেয়ে যাওয়া যায়, তখন তারা সমাজে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
গত কয়েক সপ্তাহের অপরাধের পরিসংখ্যান ঘাঁটলে এক ভয়াবহ ও অন্ধকার চিত্র ফুটে ওঠে। চলতি মে মাসেই দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক লোমহর্ষক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং পুলিশের বিবরণ অনুযায়ী:
৬ মে, সিলেট: জালালাবাদ এলাকায় মাত্র চার বছর বয়সী এক কন্যাশিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার পর অত্যন্ত নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
১৪ মে, ঠাকুরগাঁও: রাণীশংকৈল উপজেলায় নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর চার বছরের আরেক অবুঝ শিশুর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া নবম শ্রেণির এক স্কুলছাত্র পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার কথা অকপটে স্বীকার করেছে।
১৬ মে, মুন্সিগঞ্জ: সিরাজদিখান এলাকায় ১০ বছর বয়সী এক কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ ওঠে, যা স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
১৯ মে, পাবনা: চাটমোহরে টাকার প্রলোভন দেখিয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।
১৯ মে, ঢাকা (পল্লবী): একই দিনে রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাটি সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় তোলে।
এই ঘটনাগুলোর রেশ কাটতে না কাটতেই চট্টগ্রাম মহানগরের দুটি পৃথক স্থানে আরও দুই শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ সামনে এসেছে। এর মধ্যে একটি ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষে জড়ায়। এর আগে গত মার্চ মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার পর গলা কেটে হত্যার চেষ্টার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল, যা দেখে শিউরে উঠেছিল পুরো দেশ। বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব সহিংসতার শিকার হওয়া শিশুদের বয়স মূলত ৪ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত ধর্ষক ভুক্তভোগী পরিবারের পূর্বপরিচিত, আত্মীয় বা প্রতিবেশী।
নারী ও শিশু নির্যাতনের এই মহামারি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বিচারহীনতার ফল। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভয়ংকর সব তথ্য এই শঙ্কার মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দেয়:
এক দশকের চিত্র: গত এক দশকে সারা দেশে অন্তত ৫ হাজার ৫৯৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর প্রমাণ লোপাট করতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে অন্তত ২৭৪ জন শিশুকে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান: বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই (জানুয়ারি থেকে এপ্রিল) দেশে ১ হাজার ২৮ জন নারী ও শিশু বিভিন্ন ধরনের পাশবিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে শুধু কন্যাশিশুর বিরুদ্ধেই সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৪৭৯টি।
ধর্ষণের ভয়াবহতা: ২০২৫ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত অন্তত ৪৭৬ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং একই সময়ে ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে আরও ১৫৩ জন অবুঝ শিশু।
এত বিপুলসংখ্যক বীভৎস অপরাধ সংঘটিত হলেও অপরাধীদের শাস্তির হার চরম হতাশাজনক, যা অপরাধীদের বারবার একই অপরাধ করতে উৎসাহিত করছে।
সাজার হার মাত্র ৩%: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এবং বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণার তথ্যানুযায়ী, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন-সংক্রান্ত মামলাগুলোতে আসামিদের সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ।
৭০% মামলাতেই খালাস: অন্যদিকে, প্রায় ৭০ শতাংশ মামলাতেই আসামিরা প্রমাণের অভাব, দুর্বল চার্জশিট বা আইনি দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আদালত থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে যায়।
মামলাজট: বর্তমানে দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে মোট ১ লাখ ৫০ হাজার ৯৫০টি মামলা বিচারাধীন অবস্থায় ঝুলে আছে। এর মধ্যে ৪২ হাজার ২৭২টি মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি পুরোনো।
দৃষ্টান্ত: মাগুরার শিশু আছিয়া হত্যা মামলা
বিচার ব্যবস্থার এই দীর্ঘসূত্রতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হলো মাগুরার চাঞ্চল্যকর শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলা। ২০২৫ সালের ৫ মার্চ শিশু আছিয়া পাশবিক ধর্ষণের শিকার হয় এবং পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এই ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। বিচারিক আদালত এই মামলার প্রধান আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিলেও বর্তমানে সেটি হাইকোর্টে আপিল শুনানির অপেক্ষায় আটকে আছে। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় রায় কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না, যা ভুক্তভোগী পরিবারকে চরম হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মামলায় আসামিদের খালাস পাওয়ার এই উচ্চ হার এবং শাস্তির নিম্নহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্টজনেরা ও আইনজ্ঞরা।
বিচারহীনতার প্রভাব: মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও মানবাধিকারকর্মী শাহীন আনাম বলেন, “শিশু ধর্ষণের অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অপরাধীরা মনে করে, তারা শেষ পর্যন্ত যেকোনো উপায়ে পার পেয়ে যাবে। পল্লবীর শিশুটির ধর্ষকও হয়তো ভেবেছিল, কিছুদিন জেল খেটে সে সহজেই বের হয়ে আসতে পারবে। কারণ, আমাদের দেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনায় শাস্তি কার্যকর হওয়ার নজির খুব কম।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মামলার দীর্ঘসূত্রতা, পুলিশের তদন্তের দুর্বলতা, সামাজিক চাপ এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের অনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে ভয় পান, যার ফলে অপরাধীরা সহজেই রেহাই পেয়ে যায়।
সুনির্দিষ্ট আইনের অভাব: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী ফওজিয়া করিম এই আইনি সংকটের দিকটি তুলে ধরে বলেন, “যৌন হয়রানি এবং বিশেষ করে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে দেশে এখনো সুনির্দিষ্ট ও আলাদা কোনো কঠোর আইন নেই। উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি নীতিমালা থাকলেও, সেটি আজও পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হয়নি।” শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, বরং পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা তৈরি এবং নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।
অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও জনমনে রয়েছে নানা প্রশ্ন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা দাবি করছেন, অপরাধীদের তথ্য সংরক্ষণের জন্য পুলিশের একটি নিজস্ব সফটওয়্যারভিত্তিক ডেটাবেইস রয়েছে। গত চার-পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের তথ্য সেখানে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এ ধরনের জঘন্য ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশের আগাম ও কার্যকর কোনো ভূমিকা খুব একটা চোখে পড়ে না।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এবং পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন জানান, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়, পারিবারিক সংকট, মাদকের বিস্তার এবং অর্থনৈতিক দৈন্যের কারণেই সাধারণত এ ধরনের জঘন্য অপরাধগুলো ঘটছে।
তবে কেবল সামাজিক অবক্ষয়ের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের দায় এড়াতে পারে না। মামলা তদন্তে অবহেলা, ফরেনসিক বা ডিএনএ রিপোর্টের দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল চার্জশিট প্রদান এবং বিচার ও শাস্তি নিশ্চিতে গাফিলতির কারণেই দেশে শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ আজ মহামারির রূপ নিয়েছে। রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থাকে এখনই এই বিচারহীনতার দেয়াল ভেঙে দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালগুলোতে ঝুলে থাকা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। তবেই হয়তো সমাজ থেকে এই পৈশাচিকতা নির্মূল করা সম্ভব হবে।