• রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ০২:০৪ পূর্বাহ্ন

যেভাবে দেশজুড়ে ছড়ালো প্রাণঘাতী হাম

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

সারা দেশে হাম এবং এর উপসর্গে শিশুমৃত্যুর এক ভয়াবহ ও করুণ চিত্র তৈরি হয়েছে। হাসপাতালগুলোর বারান্দায় আর শিশু ওয়ার্ডে কান পাতলেই এখন কেবল স্বজন হারানো মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের এই আধুনিক সময়ে এসে এমন একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত বিপুলসংখ্যক শিশুর প্রাণহানি গোটা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে এক বিরাট কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। দেশে ইতিমধ্যে হাম ও এর উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা ৫০০-এর ঘর অতিক্রম করেছে। পরিস্থিতি এতটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার পর এখন জনমনে এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে—কীভাবে এত দ্রুত একটি স্থানীয় প্রাদুর্ভাব সারা দেশে মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়লো? কেন শুরুতেই এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হলো না?

সূত্রপাত ও বিস্তারের টাইমলাইন

হামের এই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের শুরুটা হয়েছিল মূলত দেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বছরের (২০২৬) ৪ জানুয়ারি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে সর্বপ্রথম হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। সেখানে যথাযথ আইসোলেশন ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অভাবে ভাইরাসটি ধীরে ধীরে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে প্রবেশ করতে শুরু করে। এরপর মার্চের মাঝামাঝি সময়ে এসে রাজশাহী বিভাগে এই ভাইরাসের এক তীব্র ও বিপজ্জনক প্রাদুর্ভাব ধরা পড়ে। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যেই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামে আক্রান্ত রোগীর ঢল নামে। ১৮ মার্চের মধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে ৪৪ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত করে। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি, ভাইরাসটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে দেশের অন্তত ৫৮টি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে এক জাতীয় সংকটের রূপ নেয়।

টিকাদানে ঘাটতি ও বয়সের ঝুঁকি

সারা দেশে হামের এমন লাগামহীন বিস্তারের পেছনে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হলো টিকাদানে চরম অবহেলা ও ঘাটতি। দেশের স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী সাধারণত প্রতি ৫ বছর পরপর হাম-রুবেলার একটি বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন বা মেগা প্রকল্প পরিচালনা করা হয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ২০২৫ সালে নির্ধারিত এই বিশাল ক্যাম্পেইনটি অজ্ঞাত কারণে স্থগিত বা অনুষ্ঠিত না হওয়ায় দেশের বিপুলসংখ্যক শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতায় এক ভয়াবহ শূন্যতা তৈরি হয়।

জাতিসংঘের শিশু তহবিল বা ইউনিসেফের (UNICEF) দেওয়া উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক বছর ধরে দেশে হামের প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ বা হার মারাত্মকভাবে কমে গেছে। এর ফলে দেশের প্রায় ২ থেকে ৩ কোটি শিশু সরাসরি এই ভাইরাসের চরম ঝুঁকিতে পড়ে যায়। রাজশাহীতে প্রাদুর্ভাবের সময় দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশের বয়স ছিল মাত্র ৬ থেকে ৯ মাস। চিকিৎসাবিজ্ঞানের রুটিন অনুযায়ী এই বয়সী শিশুদের হামের প্রথম ডোজ দেওয়ার সময়ও তখনো হয়নি। ফলে শরীরে কোনো ধরনের অ্যান্টিবডি বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছাড়াই তারা ভাইরাসের সহজ শিকার হয়েছে।

হাসপাতাল থেকেই ছড়িয়েছে সংক্রমণ

হাম ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম একটি প্রধান কেন্দ্র বা ‘এপিসেন্টার’ হয়ে উঠেছিল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ স্থানীয় বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো। হাম একটি চরম মাত্রার ছোঁয়াচে এবং বায়ুবাহিত রোগ। আক্রান্ত শিশুর হাঁচি-কাশি বা শ্বাসনালির মাধ্যমে এটি বাতাসের সাহায্যে খুব দ্রুত অন্য শিশুর শরীরে প্রবেশ করে। রামেক হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা যায়, সেখানে ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি রোগী ভর্তি। বেডের তীব্র অভাবে অসংখ্য মুমূর্ষু রোগীকে মেঝেতে এবং খোলা বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। শিশু বিভাগের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়, যেখানে একটি ছোট বেডে ৩-৪ জন, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে তার চেয়েও বেশি শিশুকে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে। এই চরম ঘিঞ্জি পরিবেশে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা সাধারণ জ্বর নিয়ে ভর্তি হওয়া সুস্থ শিশুরাও হামে আক্রান্ত শিশুদের সরাসরি সংস্পর্শে এসে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে সংক্রমিত হতে থাকে।

গ্রাম পর্যায়ে বিস্তার ও সাধারণ মানুষের ভ্রান্তি

হাসপাতাল থেকে আংশিক সুস্থ হয়ে বা চিকিৎসা শেষে যেসব শিশু নিজ নিজ গ্রামে বা এলাকায় ফিরে গেছে, তারা অজান্তেই এই ভাইরাস বহন করে নিয়ে গেছে। গ্রামীণ জনপদের অসচেতন অনেক অভিভাবক হামের প্রাথমিক লক্ষণ—যেমন ছোট লাল দানা, সাধারণ জ্বর বা সর্দিকে সাধারণ অ্যালার্জি বা মৌসুমি রোগ ভেবে মারাত্মক অবহেলা করেছেন। সঠিক সময়ে শিশুদের আইসোলেশন বা সম্পূর্ণ আলাদা করে না রাখার কারণে এই আক্রান্ত শিশুদের মাধ্যমে তাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্য, প্রতিবেশী, এমনকি স্কুল ও খেলার সাথীদের মাঝেও ভাইরাসটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। পরবর্তীতে সাধারণ মানুষের অবাধ যাতায়াত এবং গণপরিবহন ব্যবহারের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের সীমানা ছাড়িয়ে এটি ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনা বিভাগেও ব্যাপকভাবে সংক্রমিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে ঢাকা বিভাগকে।

ভুক্তভোগীদের সীমাহীন ভোগান্তি ও ক্ষোভ

চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও কষ্টের কোনো সীমা নেই। নাটোরের লালপুর থেকে আসা রোজিনা খাতুন নামের এক অসহায় মায়ের সাথে রামেক হাসপাতালের বাইরে কথা হয়। তিনি চরম হতাশা নিয়ে জানান, তার মেয়ের শুরুতে কেবল সাধারণ ঠান্ডা-জ্বর ছিল। তারা বুঝতে পারেননি এটি হাম। পরে গায়ে দানা উঠলে হাসপাতালে ছুটে আসেন। তিনি বলেন, “হাসপাতালে রোগীর এত চাপ যে ডাক্তাররা ঠিকমতো সময় দিতে পারছেন না। সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো এই পরিবেশে বাচ্চাকে রাখা। সে ঠিকমতো কিছুই খেতে পারছে না, যন্ত্রণায় কেবল সারাক্ষণ কাঁদছে।”

চারঘাট উপজেলা থেকে আসা সেতারা বেগম নামের আরেক অভিভাবক জানান তার অবর্ণনীয় কষ্টের কথা। তিনি বলেন, “হাসপাতালে এসে বেড পেতেই অনেক সময় লেগেছে। বাচ্চার অবস্থা দেখে সারাক্ষণ ভয় কাজ করে। হাসপাতালের ভেতরে পর্যাপ্ত ওষুধ নেই, অনেক দামি ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে, যা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য অনেক বড় একটা আর্থিক বোঝা। শিশুদের জন্য আরও উন্নত ও আলাদা ব্যবস্থা করা উচিত ছিল।”

সবচেয়ে মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা সাজিয়া আক্তার। রোজা ঈদের আগে তিনি তার ছয় বছর বয়সী ছেলে শহীদকে কেবল নিউমোনিয়ার চিকিৎসা করাতে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। তখন তার শরীরে হামের ছিটেফোঁটাও ছিল না। কিন্তু অত্যন্ত অবহেলার সাথে তাকে একটি হাম আক্রান্ত শিশুর পাশের বেডে রাখা হয়। সেখান থেকেই শিশুটি হামে আক্রান্ত হয় এবং তার অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে যে তাকে বেশ কিছুদিন আইসিইউতে (ICU) পর্যন্ত রাখতে হয়েছিল। একইভাবে, সিফাত নামের আরেক শিশুর বাবা সাদিকুল ইসলামও ক্ষোভের সাথে জানান, নিউমোনিয়া নিয়ে ভর্তি হয়ে তার সন্তান হাসপাতাল থেকেই হামে আক্রান্ত হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের দায় এড়ানোর চেষ্টা ও নীরবতা

চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা এই চরম অব্যবস্থাপনার অভিযোগের বিষয়ে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান জানান, হামের বিস্তার রোধে শুরু থেকেই আলাদা ওয়ার্ডের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রোগীর স্বজনরা সেই আইসোলেশন বা আলাদা থাকার স্বাস্থ্যবিধি ঠিকমতো মেনে চলেননি বলেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবে রামেক হাসপাতালের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভূমিকা ছিল আরও বেশি রহস্যজনক ও হতাশাজনক। এই চরম জাতীয় সংকটের বিষয়ে কথা বলার জন্য রামেক হাসপাতালের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাসকে একাধিকবার ফোন এবং মেসেজ দেওয়া হলেও তিনি কোনো প্রকার সাড়া দেননি। এমনকি হাসপাতালের নার্স ও ডিউটি ডাক্তাররা তার সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দিলেও তাকে পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, গত ২২ মে রাত ৮টা ১১ মিনিটে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলামকে ফোন করা হলে তিনি কল রিসিভ করেন ঠিকই, কিন্তু “রাজশাহী থেকে হাম কীভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লো?”—এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি শোনার সাথে সাথেই তিনি কোনো জবাব না দিয়ে কলটি কেটে দেন।

বর্তমানে ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সরাসরি সহায়তায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নতুন করে টিকাদান ক্যাম্পেইন চালিয়ে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তবে রামেক হাসপাতালের সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার (২২ মে পর্যন্ত) তথ্য অনুযায়ী, সেখানে নতুন করে আরও চারজন হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন এবং ৭১ জন মুমূর্ষু শিশু এখনো চিকিৎসাধীন রয়েছে। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিলে হয়তো আজ দেশের এতগুলো কোমলপ্রাণ শিশুকে অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হতো না।

তথ্যসূত্র: আজকের কাগজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category