• সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ০৯:৩৩ অপরাহ্ন
Headline
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এডিবি প্রেসিডেন্টের সৌজন্য সাক্ষাৎ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে ইরানের সম্মতি, চুক্তির সম্ভাবনা আতাউর রহমান সম্পর্কে আবুল হায়াতের আবেগঘন স্মৃতিচারণ সুস্থ ও প্রাকৃতিকভাবে মোটাতাজা গরু চেনার উপায় চুক্তি না হলে ইরানের সঙ্গে ‘বড় সংঘাতের’ হুঁশিয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টাঙ্গাইলে রডবাহী ট্রাক খাদে উল্টে নিহত পনেরো যাত্রী টানা তৃতীয় বছরের মতো গাজায় নেই কোরবানির ঈদ চাঁদপুরে আকস্মিক ঝড়ের কবলে যাত্রীবাহী লঞ্চ আহত অর্ধশতাধিক গরু কোরবানির দাবিতে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু খামারিদের বিক্ষোভ শিশু রামিসা হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল শুনানি জুনে

টাঙ্গাইলে রডবাহী ট্রাক খাদে উল্টে নিহত পনেরো যাত্রী

Reporter Name / ২ Time View
Update : সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬

পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা হলো না একদল খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষের। উৎসবের আনন্দময় যাত্রাপথ মুহূর্তের মধ্যেই পরিণত হলো এক ভয়ংকর মৃত্যুপুরীতে। পরিবারের সদস্যদের সাথে ঈদের ছুটি কাটানোর বুকভরা আশা নিয়ে যে মানুষগুলো রড বোঝাই একটি ট্রাকে চড়ে বসেছিলেন, গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই তাদের সেই স্বপ্ন চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। সোমবার (২৫ মে) ভোররাতের দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ১৫ জন যাত্রী নিহত এবং আরও অন্তত ৮ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। মহাসড়কের যমুনা সেতু পূর্ব থানা এলাকার অন্তর্গত যোকারচর ১৮ নম্বর ব্রিজ সংলগ্ন সরাতৈল নামক স্থানে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রড বোঝাই ট্রাকটি খাদে পড়ে গেলে এই ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনাটি ঘটে। অতিরিক্ত যাত্রীর ভার এবং ভারী লোহার রডের নিচে চাপা পড়ে এই বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে, যা পুরো এলাকায় এক শোকাবহ ও চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

দুর্ঘটনার শিকার এই মানুষগুলোর পেছনের জীবন সংগ্রাম অত্যন্ত করুণ ও মর্মস্পর্শী। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিহত এবং আহত ব্যক্তিরা সকলেই অত্যন্ত দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষ ছিলেন। তারা মূলত নোয়াখালী জেলার চৌমুহনী এলাকায় থেকে গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষের ফেলে দেওয়া চুল এবং নষ্ট বা ভাঙারি মোবাইল ফোন কিনে তা বিক্রি করে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করতেন। আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে স্ত্রী, সন্তান ও পরিজনদের সাথে উৎসব উদযাপনের জন্য তারা উত্তরবঙ্গের নিজ নিজ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। গণপরিবহন বা বাসের অতিরিক্ত ভাড়ার চাপ এড়াতে এবং কিছুটা সাশ্রয়ের আশায় তারা ফেনী জেলার মহিপাল থানা এলাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী ওই পণ্যবাহী ট্রাকে উঠেছিলেন। তাদের হয়তো ধারণা ছিল, জীবনের ঝুঁকি থাকলেও অল্প খরচে তারা প্রিয়জনদের কাছে পৌঁছাতে পারবেন। কিন্তু ঢাকা মেট্রো-ট-১২-৫৪৭১ নম্বরের ওই পণ্যবাহী ট্রাকটি যে তাদের জন্য একটি মৃত্যুফাঁদ হয়ে অপেক্ষা করছিল, তা ঘুণাক্ষরেও কেউ টের পাননি।

ভোর চারটার দিকে চারপাশ যখন ঘুটঘুটে অন্ধকার এবং যাত্রীদের চোখে ঘুমের রেশ, ঠিক তখনই ঘটে যায় এই ভয়ংকর দুর্ঘটনা। প্রত্যক্ষদর্শী এবং উদ্ধারকারী দলের সূত্রমতে, ট্রাকটি ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের সরাতৈল এলাকায় পৌঁছানোর পর চালক হঠাৎ করেই স্টিয়ারিংয়ের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। অতিরিক্ত গতির কারণে মুহূর্তের মধ্যেই বিশালাকার ট্রাকটি মহাসড়কের পাশ দিয়ে নিচের গভীর খাদে উল্টে পড়ে যায়। এ সময় ট্রাকে থাকা সাধারণ যাত্রীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভারী লোহার রডের নিচে চরমভাবে চাপা পড়েন। রডের বিশাল ওজন এবং ট্রাকের কাঠামোর নিচে পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই অনেকের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার পরপরই অন্ধকারে যাত্রীদের আর্তনাদ ও গোঙানির শব্দে চারপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দারা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি বুঝতে পেরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেন।

খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এলেঙ্গা ফায়ার স্টেশনের ইনচার্জ আতাউর রহমানের নেতৃত্বে উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। একই সাথে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ, যমুনা সেতু পূর্ব থানা পুলিশ এবং হাইওয়ে পুলিশের একটি বিশাল দল উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে মহাসড়কে যানজট নিরসন এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের বিশেষ দলগুলোও দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধার অভিযানে যুক্ত হয়। কিন্তু ট্রাকভর্তি ভারী লোহার রডের নিচে চাপা পড়া মানুষগুলোকে উদ্ধার করা মোটেও সহজ কাজ ছিল না। ফায়ার সার্ভিস এবং পুলিশ সদস্যদের দীর্ঘ ও প্রাণান্তকর চেষ্টার পর টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের ভারী রেকার এবং বঙ্গবন্ধু সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) রেকার ঘটনাস্থলে নিয়ে আসা হয়। এসব ভারী যন্ত্রপাতির সাহায্যে ট্রাক ও রডের স্তূপ সরিয়ে একে একে ১৫ জন হতভাগ্য যাত্রীর নিথর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। একই সাথে রডের নিচ থেকে মুমূর্ষু অবস্থায় আরও অন্তত ৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করে দ্রুত চিকিৎসার জন্য টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

দুর্ঘটনায় নিহত ১৫ জনের মধ্যে ৬ জনের পরিচয় নিশ্চিত করতে পেরেছে পুলিশ, বাকি ৯ জনের নাম-পরিচয় এখনো অজ্ঞাত রয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন নওগাঁ জেলার মান্দা থানার রাজেন্দ্র বাড়ি এলাকার সাকিম মিয়ার ২০ বছর বয়সী ছেলে মো. সাগর মিয়া এবং একই এলাকার শহিদুল ইসলামের ২৫ বছর বয়সী ছেলে রবিউল ইসলাম। এছাড়াও নিহত হয়েছেন রাজশাহী জেলার তানোর থানার বাতানপুর এলাকার আলতাফ হোসেনের ১৯ বছর বয়সী ছেলে ইসমাইল হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ থানার ৬০ বছর বয়সী বৃদ্ধ নজরুল এবং একই জেলার ৪৫ বছর বয়সী মামুন। অপর নিহত ব্যক্তি হলেন নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর থানার মালঞ্চী গ্রামের সাইদুলের ছেলে ২৫ বছর বয়সী সারিকুল। অন্যদিকে, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আটজনেরও পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন মান্দা থানার ডেমরা এলাকার মজিবরের ছেলে বাবু (৩৫) ও শহিদুলের ছেলে সমেজ, হোসেনপুর এলাকার আব্দুল রহিমের ছেলে আব্দুল রহমান (৩৫), দশপাড়া এলাকার নজরুলের ছেলে তুহিন, পাকুরিয়া এলাকার সফেদ আলীর ছেলে আলমগীর (৪০) ও ছোরহাব আলীর ছেলে সিদ্দিক আলী (৪০), রাজেন্দ্র বাড়ি এলাকার মৃত সাহেব আলীর ছেলে খোরশেদ (২৬) এবং নাটোর জেলার মৃত মান্নানের ছেলে নয়ন বিশ্বাস (৩২)।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মতো দেশের অন্যতম ব্যস্ত একটি রুটে সাময়িকভাবে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার কারণে মহাসড়কে এমনিতেই যানবাহনের প্রচণ্ড চাপ ছিল। উদ্ধারকাজ পরিচালনার সময় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হলে সাধারণ যাত্রীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে মহাসড়কে যানজট নিরসনের দায়িত্বে থাকা পুলিশ এবং ট্রাফিক বিভাগের সদস্যরা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ডাইভার্সন বা বিকল্প পথের ব্যবস্থা চালু করেন। তারা ঢাকাগামী সব ধরনের যানবাহনকে ভূঞাপুর লিংক রোড ব্যবহার করে ঢাকার দিকে যাওয়ার নির্দেশনা দেন এবং উত্তরবঙ্গগামী যানগুলোকে মহাসড়কের ঢাকা লেন ব্যবহার করে চলাচলের সুযোগ করে দেন। ট্রাফিক পুলিশের এই ত্বরিত পদক্ষেপের কারণে উদ্ধারকাজ চলাকালেও বিকল্প পথে ধীরে ধীরে যান চলাচল অব্যাহত থাকে। পরবর্তীতে দুর্ঘটনাকবলিত ট্রাক এবং রডগুলো মহাসড়ক থেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে নেওয়ার পর বর্তমানে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক রয়েছে।

যমুনা সেতু পূর্ব থানা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিহতদের মৃতদেহের প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। নিহত অজ্ঞাতনামা নয়জন যাত্রীর নাম ও সঠিক ঠিকানা যাচাই করার জন্য বিভিন্ন থানায় বার্তা পাঠানো হয়েছে এবং আনুষঙ্গিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

পণ্যবাহী ট্রাকে যাত্রী পরিবহনের ওপর সরকারিভাবে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও প্রতি বছর ঈদের সময় এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আমাদের মহাসড়কগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। বাস মালিকদের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং গণপরিবহনের তীব্র সংকটের কারণেই মূলত নিম্ন আয়ের এসব দরিদ্র মানুষ পণ্যবাহী ট্রাক বা পিকআপ ভ্যানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে বাধ্য হন। এই অসহায় মানুষগুলোর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং মহাসড়কে পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন কঠোরভাবে বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও বেশি দায়িত্বশীল ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category