• বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ১১:৫৫ অপরাহ্ন

নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে শুকরিয়া: মুমিনের জীবনের পরম প্রশান্তি

Reporter Name / ৭ Time View
Update : বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬

মানুষের জীবন এক অদ্ভুত যাত্রা। এই যাত্রাপথ সব দিন একরকম থাকে না। কখনো সফলতার আলোতে হৃদয় আনন্দে ভরে ওঠে, আবার কখনো ব্যর্থতা ও দুঃখের ঘন মেঘে চারপাশ অন্ধকারে ঢেকে যায়। জীবনের এমন কিছু চরম মুহূর্ত আসে, যখন চারপাশের পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, আর হয়তো সামনে এগোনো সম্ভব নয়। বুকভরা ক্লান্তি, সীমাহীন হতাশা আর অজানা শঙ্কা আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ধরে। কিন্তু ঠিক সেই ঘোর অমানিশার মুহূর্তগুলোতে যদি আমরা একটু থেমে নিজের জীবনের দিকে গভীরভাবে তাকাই, তবে এক ভিন্ন সত্য উপলব্ধি করতে পারি। আমরা বুঝতে পারি—এত কিছুর পরও আমরা এখনো শ্বাস নিচ্ছি, এখনো বেঁচে আছি, এবং এখনো মহান রবের অসংখ্য নিয়ামতের মাঝেই ডুবে আছি। আর একজন প্রকৃত মুমিনের হৃদয় থেকে এই গভীর উপলব্ধিই একটি পরম প্রশান্তির শব্দ বের করে আনে—‘আলহামদুলিল্লাহ’ বা সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য।

অগণিত নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও আমাদের বিস্মৃতি

মানুষের একটি সাধারণ প্রবৃত্তি হলো, সে জীবনে যা কিছু হারিয়েছে কিংবা যা পায়নি, তা নিয়েই বেশি আক্ষেপ করে। অথচ আল্লাহ তাআলা প্রতিদিন আমাদের এমন অসংখ্য নিয়ামত দিয়ে চলেছেন, যার কোনো হিসাব আমরা রাখি না। হে আল্লাহ! তুমি এখনো আমাকে প্রতিটি নিঃশ্বাস গ্রহণ করার সুযোগ দিচ্ছো—এর জন্য আলহামদুলিল্লাহ। তুমি আমাকে এমন সব অজানা উৎস থেকে প্রতিনিয়ত রিজিক দিচ্ছো, যা আমি কখনো কল্পনাও করতে পারিনি—এর জন্য আলহামদুলিল্লাহ। তুমি আমার হৃদয়কে এখনো কঠিন পরিস্থিতিতে শক্ত রেখেছো, যদিও কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে আমি হয়তো হাল ছেড়েই দিতে চেয়েছিলাম—এর জন্যও আলহামদুলিল্লাহ। আমাদের প্রাপ্তির খাতা যে কত বড়, তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা করতে চাও, তবে তা কখনো গুণে শেষ করতে পারবে না।’ (সুরা আন-নাহল: আয়াত ১৮)। আসলেই আমাদের প্রতিটি সকালের ঘুম থেকে ওঠা, প্রতিটি সুস্থতার মুহূর্ত এবং বেঁচে থাকার প্রতিটি নতুন সুযোগ মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একেকটি অমূল্য উপহার।

কষ্টের মাঝেও লুকিয়ে থাকে আল্লাহর অপার রহমত

জীবনের কঠিন সময়গুলো কিংবা পরীক্ষাগুলো কখনোই মানুষকে ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার জন্য আসে না; বরং এগুলো আসে মানুষকে আরও বেশি শক্তিশালী, ধৈর্যশীল এবং আল্লাহর আরও কাছাকাছি নিয়ে আসার জন্য। আমরা আমাদের সীমিত জ্ঞান দিয়ে অনেক সময় বুঝতে পারি না যে, কেন হঠাৎ করে একটি সম্ভাবনার দরজা বন্ধ হয়ে গেল, কেন লালন করা একটি স্বপ্ন পূরণ হলো না, কিংবা কেন এত কষ্টের পাহাড় ডিঙিয়ে আমাদের চলতে হচ্ছে। কিন্তু আল্লাহ আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ অবগত। তাঁর পরিকল্পনাই সর্বোত্তম। হতাশাগ্রস্ত মানুষের মনে আশা জাগাতে আল্লাহ তাআলা নিজেই বলেন, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি।’ (সুরা আলাম নাশরাহ: আয়াত ৫-৬)। একই কথা দুবার উচ্চারণ করে আল্লাহ মূলত মুমিনের হৃদয়ে এই বিশ্বাস গেঁথে দিয়েছেন যে, দুঃখের রাত যত গভীর হোক না কেন, সুখের ভোর আসবেই।

হিদায়াতের আলো ও মুমিনের জীবনের সৌন্দর্য

একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো ‘হিদায়াত’ বা সঠিক পথের দিশা। হিদায়াত থাকলে মানুষ দুনিয়ার চরম অন্ধকারের মাঝেও আলোর পথ খুঁজে পায়। তাই আমাদের প্রতিনিয়ত প্রার্থনা হওয়া উচিত—হে আল্লাহ! তুমি আমার প্রতিটি পদক্ষেপে হিদায়াত দান করো। এমন পথে পরিচালিত করো, যে পথ সরাসরি তোমার সন্তুষ্টির দিকে নিয়ে যায়। আমার দুর্বল হৃদয়কে অহংকার, হতাশা এবং যাবতীয় গুনাহ থেকে রক্ষা করো। কোরআনের সুরা আল-ফাতিহার ৬ নম্বর আয়াতে আমরা প্রতিনিয়ত এই দোয়াই করি—‘আমাদের সরল পথের হিদায়াত দান করুন।’

প্রকৃতপক্ষে একজন মুমিনের জীবনের পুরো বিন্যাসটাই দারুণ বিস্ময়কর ও সৌন্দর্যে ভরপুর। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের ব্যাপারটি বড়ই বিস্ময়কর। তার প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। সুখ পেলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়; আর কষ্ট পেলে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে তাও তার জন্য কল্যাণকর হয়।’ (মুসলিম)। সুখে আল্লাহকে ভুলে না যাওয়া এবং দুঃখে তাঁর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়াই মুমিনের প্রকৃত পরিচয়।

জীবনের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি অধ্যায়ে মহান আল্লাহর রহমতের ছাপ লুকিয়ে রয়েছে। কখনো তা স্পষ্ট, আবার কখনো তা কঠিন পরীক্ষার আড়ালে আবৃত। তাই আজও যদি কোনো কারণে হৃদয় ভেঙে যায়, পথ চলা কঠিন হয়ে ওঠে কিংবা চোখে অশ্রু জমে—তবুও পরম বিশ্বাস নিয়ে বলা উচিত, আলহামদুলিল্লাহ। কারণ, আল্লাহ এখনো আমাদের নিঃশ্বাস দিচ্ছেন, বাঁচার আশা দিচ্ছেন এবং তাঁর দিকে ফিরে আসার অবারিত সুযোগ দিচ্ছেন। হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে তোমার স্মরণে প্রশান্ত রাখো, আমাদের পদক্ষেপকে হিদায়াতের পথে দৃঢ় করো, আর আমাদের সব কষ্টকে তোমার রহমত ও বরকতে কল্যাণে পরিণত করে দাও। আমিন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category