• মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ১২:২১ পূর্বাহ্ন

চীনা যুদ্ধবিমান কেনা ঠেকাতে ওয়াশিংটনের ব্যাপক তৎপরতা

Reporter Name / ২ Time View
Update : সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরের ঠিক আগমুহূর্তে ঢাকাকে একপ্রকার প্রচ্ছন্ন সতর্কবার্তা দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বেশ কৌশলী ভঙ্গিতে মন্তব্য করেছেন, দীর্ঘ মেয়াদে আমেরিকার ওপর বাজি ধরলে কখনো পস্তাতে হবে না। যদিও রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্যটি ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে মার্কিন দলকে সমর্থন দেওয়ার আলোচনার আড়ালে এসেছে, তবে ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিল খেলায় এই মন্তব্যকে নিছক খেলার গণ্ডিতে আটকে রাখার কোনো সুযোগ নেই। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি আসলে ঢাকার প্রতি ওয়াশিংটনের একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও কৌশলগত বার্তা। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর এই চীন সফরে বেইজিংয়ের কাছ থেকে অত্যাধুনিক ‘জে-১০সি’ (J-10C) যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে, যা আমেরিকা কোনোভাবেই চাইছে না। বাংলাদেশ যাতে সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে বেইজিংয়ের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে না পড়ে, ঠিক সেই ভূ-রাজনৈতিক অ্যাসাইনমেন্ট নিয়েই মার্কিন রাষ্ট্রদূত ঢাকায় তাঁর তৎপরতা বাড়িয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই তাঁর প্রথম বিদেশ সফর, যার গন্তব্য মালয়েশিয়া হয়ে এশিয়ার উদীয়মান পরাশক্তি চীন।

পর্দার আড়ালের খবর অনুযায়ী, এই সফরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সমীকরণ। বাংলাদেশ চীন থেকে প্রায় ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা মূল্যের আধুনিক ফাইটার জেট বা যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে, বিগত সময়ে আকাশযুদ্ধে এই চীনা ফাইটার জেটের দুর্দান্ত কার্যকারিতা দেখার পর ঢাকার সামরিক পরিকল্পনাবিদেরা এটিকে নিজেদের আকাশসীমা প্রতিরক্ষার জন্য একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন। ইউরোপ বা আমেরিকার তৈরি যুদ্ধবিমানের আকাশছোঁয়া দামের তুলনায় এই চীনা যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচকে একটি সেরা কম্বিনেশন মনে করছে ঢাকা। শুধু তাই নয়, ড্রোনের সম্পূর্ণ প্রযুক্তি হস্তান্তরের (Technology Transfer) মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি অত্যাধুনিক ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের বিষয়ে চীনা ইলেকট্রনিক্স জায়ান্টগুলোর সাথেও আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে। সামরিক খাতের বাইরেও রয়েছে বেইজিংয়ের কাছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার সরাসরি আর্থিক সহায়তা বা ঋণ চাওয়া, যা চিনা ইকোনমিক কনসোলের মতো মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নে ব্যবহৃত হবে। সাথে থাকছে নিজস্ব মুদ্রায় সরাসরি লেনদেন বা কারেন্সি সোয়াপের মতো ডজনখানেক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি।

এমন একতরফা চীনা আধিপত্যের পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনও হাত গুটিয়ে বসে নেই। ঢাকাকে বেইজিংয়ের কক্ষপথ থেকে দূরে রাখতে আমেরিকা ইতিমধ্যেই তাদের তৈরি বিখ্যাত ‘অ্যাপাচি’ অ্যাটাক হেলিকপ্টার এবং বিধ্বংসী ড্রোন বিক্রির বিকল্প প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পাঠানো এক অভিনন্দন বার্তায় রুটিন প্রতিরক্ষা চুক্তি (GSOMIA/ACSA) সই করার জন্য এক ধরনের প্রচ্ছন্ন চাপ দিয়ে রেখেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত অনুযায়ী, আমেরিকার কৌশলগত স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে এমন কোনো দেশ থেকে বাংলাদেশ পারমাণবিক চুল্লি বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না। একই সাথে, ওয়াশিংটন ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের কাছ থেকে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার একটি বড় প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিয়েছে।

তবে বৈশ্বিক এই দুই পরাশক্তির মাঝে নিজেদের কৌশলগত ভারসাম্য ঠিক রাখতে ঢাকাও অত্যন্ত চতুর ভূ-রাজনৈতিক চাল চালছে। সম্প্রতি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য প্রায় ৪০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা খরচ করে একঝাঁক মার্কিন ‘বোয়িং’ বিমান কেনার খসড়া তৈরি করছে বাংলাদেশ, যা মূলত ওয়াশিংটনকে অর্থনৈতিকভাবে শান্ত রাখার একটি কৌশল। একদিকে বেইজিংয়ের হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রজেক্টের ঋণ ও আধুনিক ফাইটার জেটের আকর্ষণ, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের বিশাল রপ্তানি বাজার সুবিধা ও সামরিক চাপ—এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতের মাঝে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি কীভাবে ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category