• সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ০৫:১১ অপরাহ্ন
Headline
যারা শাশুড়ি হতে যাচ্ছেন তাঁদের জন্য ১০টি পরামর্শ চিকিৎসার পর ফের কারাগারে দীপু মনি সংসদে ট্যাক্সের টাকায় যেন চরিত্র হনন না হয় বিরোধী দলের নির্বাচনি এলাকায় ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে: মির্জা ফখরুল যে কোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারাজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা হবে: প্রধানমন্ত্রী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী গ্রাহকদের জন্যে স্মার্টফোন সাশ্রয়ী করতে বাংলালিংকের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান চাকরির জন্য তরুণদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না: প্রধানমন্ত্রী কালো টাকা সাদা করার বিধান প্রত্যাহারসহ কর সংস্কারের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর বন্ধ হচ্ছে আবাসিক গ্যাস সংযোগ

মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ ও বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি

Reporter Name / ৩ Time View
Update : সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে মিয়ানমার বর্তমানে এক চরম অস্থিরতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ সংঘাত কেবল তাদের সীমানার ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর উত্তাপ এখন বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। রাখাইন রাজ্যের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি এবং সামরিক জান্তার মধ্যকার লড়াই এমন এক জটিল মোড় নিয়েছে, যেখানে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থ জড়িয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির সংকেত দিচ্ছে, বিশেষ করে যখন বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলগুলো বিশ্বরাজনীতির নতুন রণক্ষেত্রে রূপ নিচ্ছে।

মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল একটি দেশের গৃহযুদ্ধ হিসেবে দেখা ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত লড়াই। চীনের জন্য মিয়ানমার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির কিয়াকফিয়ু গভীর সমুদ্রবন্দর এবং এর সাথে সংযুক্ত পাইপলাইন ও সড়ক পথ মালাক্কা প্রণালীর ওপর চীনের নির্ভরতা অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে হটিয়ে সেখানে এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যারা পশ্চিমা বিশ্বের মিত্র হবে। এই লক্ষ্য অর্জনেই মার্কিন কংগ্রেসে ‘ব্রেভ বার্মা অ্যাক্ট’ পাস হয়েছে, যা জান্তা সরকারের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগের নতুন আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন কৌশলের লক্ষ্য হলো জান্তা সরকারের আয়ের প্রধান উৎসগুলোকে অকার্যকর করে দেওয়া। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মিয়ানমার অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এন্টারপ্রাইজ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া বিদেশি কোম্পানিগুলোকে বিমান জ্বালানি বা জেট ফুয়েল সরবরাহ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে সামরিক বাহিনী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানোর সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু আমেরিকার এই নীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। তারা একদিকে জান্তা সরকারকে দুর্বল করতে চায়, অন্যদিকে আরাকান আর্মির মতো শক্তিশালী বিদ্রোহী সংগঠনগুলোকে প্রচ্ছন্ন সমর্থন দেওয়ার পথ তৈরি করছে। এর ফলে মিয়ানমারের ভেতরেই বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত আরও তীব্রতর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির উত্থান এই সংকটকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। বর্তমানে তারা রাজ্যের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়েছে এবং নিজেদের প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলছে। চীনের দ্বিমুখী নীতি এক্ষেত্রে বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। একদিকে তারা জান্তা সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছে, অন্যদিকে আরাকান আর্মির সাথেও সখ্যতা রেখে চলেছে যাতে ক্ষমতার যে পক্ষই বিজয়ী হোক না কেন, তাদের কৌশলগত করিডোর বা কিয়াকফিয়ু বন্দর প্রকল্প যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এই জটিল সমীকরণে ভারতও উদ্বিগ্ন, কারণ তাদের ‘কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট’ প্রকল্প সিত্তুই বন্দরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। মিয়ানমারের অস্থিরতা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

এই সংকটের মূলে রয়েছে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান। টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপের খুব কাছেই রাখাইন রাজ্যের অবস্থান হওয়ায় সেখানে চলমান সংঘাত সরাসরি বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতে আমরা দেখেছি, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের গোলা এসে পড়েছে বাংলাদেশের সীমান্তে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করেছে। মানবিক করিডোর তৈরির আলোচনা হলেও সীমান্তের ওপারে চলমান এই সংঘাতের প্রকৃতি এমন যে, কোনো এক পক্ষকে সমর্থন দেওয়া বা নিরপেক্ষ থাকা—উভয়ই বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমেরিকার প্রক্সি যুদ্ধের পরিকল্পনা যদি মিয়ানমারে সফল হয়, তবে সেখানে এক দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, যার ঢেউ বাংলাদেশ এড়াতে পারবে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মিয়ানমারে সরকারের আমূল পরিবর্তনের ব্যাপারে বেশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তারা সামরিক জান্তার পতনকে অনিবার্য করে তুলতে চায়। কিন্তু এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া কতটা দীর্ঘ হবে বা এতে কত মানুষের প্রাণ ঝরবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই। আমেরিকা যদি সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ না করে প্রক্সি যুদ্ধের পথ বেছে নেয়, তবে মিয়ানমারের পরিস্থিতি হবে সিরিয়া বা লিবিয়ার মতো, যেখানে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী বিদেশি অস্ত্রের জোগান পেয়ে নিজেদের মধ্যে ধ্বংসাত্মক লড়াইয়ে লিপ্ত হবে। এই প্রক্সি যুদ্ধে চীন কখনোই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে না, কারণ কিয়াকফিয়ু বন্দর তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। ফলে, মিয়ানমার হয়ে উঠতে পারে মার্কিন ও চীনা আধিপত্যবাদের মুখোমুখি সংঘর্ষের ক্ষেত্র।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো এই সংঘাতের প্রভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের স্রোত। যদি পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে, তবে নতুন করে রোহিঙ্গা বা রাখাইন জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এছাড়া সেন্ট মার্টিন দ্বীপ এবং চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর বিদেশি পরাশক্তিগুলোর যে বিশেষ নজর রয়েছে, তা ভবিষ্যতে আমাদের সার্বভৌমত্বের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একদিকে আমেরিকার কৌশলগত প্রয়োজন, অন্যদিকে চীনের বড় বড় বিনিয়োগ—এই দুইয়ের চাপে পড়ে বাংলাদেশ একটি সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে অবস্থান করছে।

এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ নেবে? আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করা সবসময় সহজ নয়। বিশেষ করে যখন পাশের দেশ গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত এবং সেখানে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর অস্ত্র ও কৌশল বিনিয়োগ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সীমান্ত প্রহরা জোরদার করতে হবে এবং একই সাথে আন্তর্জাতিক মহলে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই আমাদের সীমান্ত দিয়ে যেন অস্ত্র বা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কোনো অস্থিতিশীল কার্যক্রম পরিচালিত না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মিয়ানমারের স্থিতিশীলতার জন্য আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।

মিয়ানমার কেবল তাদের সামরিক জান্তার পতন দেখছে না, বরং দেখছে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার খসড়া। ট্রাম্প সরকারের আগ্রাসী বৈদেশিক নীতি এবং চীনের রক্ষাকবচ—এই দুইয়ের লড়াইয়ে মিয়ানমারের সাধারণ মানুষ আজ বলির পাঠা। আমাদের মনে রাখতে হবে, মাত্র ১০০ মাইলের ব্যবধানে কিয়াকফিয়ু বন্দর আর সীমান্ত লাগোয়া রাখাইন স্টেট আমাদের দোরগোড়ায়। তাই যুদ্ধের ঝুঁকি বাংলাদেশের সীমানা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। যে কোনো মূল্যে আমাদের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা যেন আমাদের দেশের অভ্যন্তরে কোনোভাবেই ঢুকে না পড়ে, তার জন্য প্রয়োজন গোয়েন্দা নজরদারি ও কূটনৈতিক তৎপরতা। সময়টা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত হবে আমাদের ভবিষ্যতের রক্ষাকবচ।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category