• বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ১২:৫২ পূর্বাহ্ন

ঢাকার যানজট কমাতে আসছে ‘জ্যাম ট্যাক্স’

Reporter Name / ৩ Time View
Update : বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬

মেগাসিটি ঢাকার যানজট সমস্যা নিয়ন্ত্রণে এক দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক পরিকল্পনার দিকে এগোচ্ছে সরকার। রাজধানী জুড়ে ২০২৫ থেকে ২০৪৫ সাল পর্যন্ত ২০ বছর মেয়াদি যে সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (ইউআরএসটিপি) হালনাগাদ করা হচ্ছে, সেখানে কিলোমিটারপ্রতি ৬ দশমিক ২৭ টাকা হারে ‘যানজট শুল্ক’ বা জ্যাম ট্যাক্স আরোপের একটি আধুনিক সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই বিশেষ মাশুল ঢাকার সব সাধারণ বা অলিগলির সড়কে কার্যকর হবে না। এটি শুধুমাত্র সেসব প্রধান করিডোর বা মহাসড়কে প্রযোজ্য হবে, যেখানে ইতোমধ্যে মেট্রোরেল, বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) কিংবা উচ্চমানের বাস পরিষেবার মতো উন্নত আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা সচল রয়েছে। এই নতুন করের আওতাভুক্ত করা হয়েছে মূলত প্রাইভেট কার, ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল এবং পণ্যবাহী ট্রাককে। তবে নীতিমালায় এটিও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, এই শুল্ক ব্যবস্থা মাঠপর্যায়ে চূড়ান্তভাবে চালুর আগেই সাধারণ মানুষের জন্য বিকল্প হিসেবে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত গণপরিবহনের সুবিধা সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

বর্তমানে রাজধানী ঢাকার বুকে যানজট শুল্ক কার্যকর করার মতো একটিমাত্র আদর্শ করিডোর পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে, যা হলো উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বিস্তৃত প্রথম মেট্রোরেল রুট। চলমান এই মেট্রো লাইনের বাইরেও ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিতে বর্তমানে আরও দুটি এমআরটি বা মেট্রোরেল প্রকল্পের নির্মাণকাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। এর পাশাপাশি সরকারের দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনায় আরও তিনটি নতুন মেট্রো লাইনের রূপরেখা চূড়ান্ত করা আছে। ইউআরএসটিপির খসড়া প্রতিবেদনে এই ছয়টি মূল মেট্রো লাইনের পাশাপাশি ঢাকার ভবিষ্যৎ চাহিদার কথা মাথায় রেখে নতুন করে আরও দুটি মেট্রোরেল এবং পাঁচটি মনোরেল লাইন নির্মাণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই মেগা প্রজেক্টগুলো যখন ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে, তখন সংলগ্ন সব সড়ক করিডোরেই এই যানজট শুল্ক আরোপের আইনি পথ সুগম হবে। এর বাইরে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত নির্মাণাধীন বিআরটি রুট এবং সরকার পরিকল্পিত কোম্পানিভিত্তিক ডেডিকেটেড বাস রুটগুলোতেও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলের ওপর এই কিলোমিটারভিত্তিক মাশুল আদায় করা হবে।

রাজধানী ঢাকার রাজপথে যানবাহনের স্বাভাবিক গতি যে কতটা আশঙ্কাজনকভাবে ধসে পড়েছে, তা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গবেষণা সংস্থার পরিসংখ্যানে বারবার উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংক এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের যৌথ এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিগত ২০০৭ সালেও ঢাকার রাস্তায় যানবাহনের গড় গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২১ কিলোমিটার। কিন্তু দীর্ঘ দেড় দশকের ব্যবধানে, অর্থাৎ ২০২২ সাল নাগাদ সেই গতি অবিশ্বাস্যভাবে হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটারে। অর্থাৎ, ঢাকার রাজপথে গাড়ির গতি ঘণ্টায় প্রায় ১৬ কিলোমিটার কমে গেছে, যা মেগাসিটির ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপর এক চরমতম বিপর্যয় ও কাঠামোগত চাপের স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ।

বিশ্বব্যাংকের আরেকটি পৃথক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ঢাকার এই ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যামের কারণে প্রতিদিনের মানবসম্পদের ক্ষয়ক্ষতির এক শিউরে ওঠার মতো চিত্র উঠে এসেছে। সেই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন ঢাকার সড়কে থমকে থাকা যানবাহনের কারণে নাগরিকদের মূল্যবান প্রায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানীর ৭৩টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় বা ইন্টারসেকশনে নিয়মিত তীব্র যানজট তৈরি হওয়ায় পুরো শহরের ট্রাফিক নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ছে। এই বিপুল কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার ফলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতেও তার বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, যার কারণে দৈনিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৯৮ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে পৌঁছেছে। এই চরম সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্যই সরকার প্রথাগত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক এই যানজট শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে নীতিগত অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

প্রস্তাবিত এই যানজট শুল্ক ব্যবস্থাটি পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় এবং আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচালনা করা হবে। এই মাশুল আদায়ের মূল ভিত্তি হবে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন বা আরএফআইডি প্রযুক্তি। এজন্য নির্ধারিত উন্নত সড়কগুলোর বিভিন্ন কৌশলগত পয়েন্টে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ‘আরএফআইডি রিডার’ ডিভাইস স্থাপন করা হবে। যখনই কোনো নিবন্ধিত প্রাইভেট কার, ট্রাক বা মোটরসাইকেল ওই সড়ক দিয়ে অতিক্রম করবে, তখন আরএফআইডি রিডারের সাহায্যে কোনো ধরনের গাড়ি না থামিয়েই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট থেকে শুল্কের টাকা কেটে নেওয়া হবে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) যৌথভাবে এই সম্পূর্ণ ডাটাবেজ ও আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থাপনা তদারকি করবে। এর পাশাপাশি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ এবং ডিটিসিএর সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় একটি আন্তর্জাতিক মানের অত্যাধুনিক ট্রাফিক কন্ট্রোল সেন্টার গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে, যেখানে ডিএমপি মূলত সড়ক দুর্ঘটনা ও ট্রাফিক আইন প্রয়োগের দিকটি দেখবে এবং ডিটিসিএ মূলত বাস রুট ও যানজট শুল্ক আদায়ের দিকটি নিয়ন্ত্রণ করবে।

মহাপরিকল্পনায় এই নতুন শুল্ক আরোপকে কেবল রাস্তা থেকে গাড়ি কমানোর হাতিয়ার হিসেবেই দেখা হচ্ছে না, বরং একে ২০৪৫ সাল পর্যন্ত প্রস্তাবিত বিশাল পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য নতুন এক টেকসই অর্থায়নের উৎস বা রেভিনিউ মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা এই আধুনিক আন্তর্জাতিক ধারণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক মনে করেন, এই ব্যবস্থা সফল করতে হলে সবার আগে দেশের সম্পূর্ণ ট্রাফিক ডেটাবেজকে ডিজিটাল করতে হবে। প্রতিটি যানবাহনের বৈধ নিবন্ধন এবং গাড়ির কাচে ট্র্যাকিংয়ের জন্য ‘ট্রান্সপন্ডার’ বা আরএফআইডি স্টিকার থাকা বাধ্যতামূলক। সরকার যে একক পরিচিতি নম্বর বা ইউনিফাইড আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, তা পুরোপুরি কার্যকর হলে এই কর আদায় প্রক্রিয়া অত্যন্ত সহজ হবে।

তিনি আরও পরামর্শ দেন যে, সড়কের ট্রাফিক চাপ এবং সময়ের ওপর ভিত্তি করে এই মাশুলের হার পরিবর্তনশীল বা ‘ভেরিয়েবল মাশুল’ হওয়া উচিত। যেমন ভোর ৪টায় যখন রাস্তা সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকে, তখন এই মাশুল শূন্য বা সর্বনিম্ন হওয়া উচিত, আর কর্মব্যস্ত বা পিক আওয়ারে যখন জ্যাম সর্বোচ্চ থাকে, তখন এই মাশুলের হার বাড়িয়ে দেওয়া উচিত। মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে এই ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট কৌশলের কারণেই মানুষ বাড়তি টাকা বাঁচাতে অফ-পিক আওয়ার বা একদম ভোরে যাতায়াত করে, যার ফলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গাড়ির চাপের একটি চমৎকার সুষম বণ্টন ঘটে। এছাড়া এই শুল্ক থেকে অর্জিত অর্থ অন্য কোনো খাতে না নিয়ে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সড়কের মান উন্নয়নেই পুনঃবিনিয়োগ করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

প্রণয়নরত এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় যে তিনটি জরুরি অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে, তার মধ্যে এই যানজট শুল্ক আরোপের বিষয়টি অন্যতম। সম্পূর্ণ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি (PPP) মডেলে এই প্রকল্পটি মাঠে নামানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বিষয়ে সরকারের সচিব ও ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান জানান, ঢাকার যানজট নিরসন এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা দূর করতে সরকার ইতিমধ্যে টার্মিনাল স্থানান্তর, মনোরেল এবং ডেডিকেটেড রুট বা কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার মতো বড় কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে। এই বৃহত্তর ও সমন্বিত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ মহাপরিকল্পনারই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত অংশ হলো যানজট শুল্ক আরোপ। এই প্রযুক্তিগত ও নীতিগত উদ্যোগগুলো যদি মাঠপর্যায়ে সফলভাবে রূপায়ণ করা যায়, তবে আগামী দিনে রাজধানীর চিরচেনা যানজটের যন্ত্রণাদায়ক চিত্রে এক বৈপ্লবিক ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

 

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category