• বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ১২:৫২ পূর্বাহ্ন

প্যারাগুয়ের রূপকথায় বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল জার্মানি

Reporter Name / ৪ Time View
Update : বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬

বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চে জার্মানি মানেই ছিল এক অপরাজেয় শক্তি, এক নির্মম ও নিখুঁত ফুটবল যন্ত্র। যার চাকা ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার আগপর্যন্ত অবিরত ঘুরত। ১৯৫৪ সালের সেই ঐতিহাসিক ‘মিরাকল অব বার্ন’ থেকে শুরু করে ২০১৪ সালের বিশ্বজয়—জার্মান ফুটবল যুগে যুগে প্রতিপক্ষের স্বপ্ন ভেঙে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে। কিন্তু গত এক দশক ধরে সেই চেনা জার্মান মেশিনের চাকায় যেন মরিচা ধরেছে। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের চরম হতাশার পর ২০২৬ সালের চলতি বিশ্বকাপেও সেই একই অন্ধকারের পুনরাবৃত্তি ঘটল। এবার নকআউটের প্রথম পর্বেই লাতিন আমেরিকার লড়াকু দল প্যারাগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিতে হলো চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। এই পরাজয় কেবল একটি ম্যাচ থেকে ছিটকে যাওয়া নয়, বরং দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে বিশ্বমঞ্চে টাইব্রেকারে অপরাজিত থাকার যে অনন্য রেকর্ড জার্মানি ধরে রেখেছিল, তারও এক করুণ অবসান। বোস্টনের রোমাঞ্চকর রাতে প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলের জাদুকরী গ্লাভস জার্মান ফুটবলের সেই অহংকারকে চূর্ণ করে দিয়েছে।

দীর্ঘ ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের মূল পর্বে সুযোগ পাওয়া প্যারাগুয়ে দলগত ঐতিহ্য কিংবা তারকা দ্যুতিতে জার্মানির চেয়ে যোজন যোজন পিছিয়ে ছিল। কাগজ-কলমে ম্যাচটি ছিল ফুটবলের এক চরম অসম লড়াই। প্যারাগুয়ের অভিজ্ঞ কোচ গুস্তাভো আলফারো খুব ভালো করেই জানতেন যে, শক্তিশালী জার্মানির আক্রমণভাগকে রুখতে হলে রক্ষণভাগকে নিশ্ছিদ্র করার কোনো বিকল্প নেই। তিনি দলকে ছক কষেছিলেন অত্যন্ত রক্ষণাত্মক ৪-৫-১ ফরমেশনে। জার্মান কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যান ম্যাচ শুরুর আগেই নিজ শিষ্যদের সতর্ক করেছিলেন যে, প্যারাগুয়ের এই কংক্রিটের দেয়াল ভাঙা মোটেও সহজ হবে না। ম্যাচের শুরু থেকেই সেই পূর্বাভাসের সত্যতা মেলে। প্যারাগুয়ের খেলোয়াড়রা মাঠের নিজেদের অর্ধে এতটাই নিচে নেমে রক্ষণাত্মক ব্লক তৈরি করেছিলেন যে, জার্মান ফরোয়ার্ডরা বারবার আক্রমণ করেও সেই গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছিলেন। নাগেলসম্যান তাঁর আক্রমণভাগে বড়সড় পরিবর্তন এনে ডেনিজ উনদাভকে মূল স্ট্রাইকার হিসেবে নামান এবং কাই হাভার্টজকে কিছুটা পেছনে খেলার সুযোগ দেন। তবে দলের সবচেয়ে বড় তারকা ও মাঝমাঠের প্রাণ জামাল মুসিয়ালাকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখার সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত বড় প্রশ্ন চিহ্নের মুখে পড়ে।

আধুনিক ফুটবলের ব্যাকরণ অনুযায়ী, এই ধরনের জমাট রক্ষণভাগ ভাঙতে প্রয়োজন হয় উইং দিয়ে বিদ্যুৎগতির ড্রিবলিং কিংবা নিখুঁত পাসিং। কিন্তু জার্মানির দুই উইঙ্গার লিরয় সানে এবং ফ্লোরিয়ান ভির্টজ সেদিন নিজেদের নামের বিচার করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। মাঝমাঠে পাভলোভিচ ও এনমেচাকে নিয়ে গড়া জার্মানির মিডফিল্ডে ছন্দের চরম অভাব স্পষ্ট ছিল। অপরদিকে, বোবাদিয়া, কুবাস ও গুস্তাভো গোমেজদের নিয়ে গড়া প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগ প্রতিটি আক্রমণ রুখতে ছিল সমান উদ্যমী ও মরিয়া। সময় গড়ানোর সাথে সাথে জার্মান খেলোয়াড়রা যত বেশি অধৈর্য হয়ে উঠছিলেন, প্যারাগুয়ে তত বেশি তাদের রক্ষণকে আরও শক্ত করছিল। প্রথমার্ধের ঠিক শেষ মুহূর্তে জার্মানির এই অধৈর্যতার চড়া মূল্য দিতে হয়। একটি কর্নার থেকে ফিরে আসা বল দ্রুত ডান প্রান্তে পেয়ে যান মাতিয়াস গালারসা। তাঁর বাড়ানো নিখুঁত এক ক্রসে দুর্দান্ত হেডে বল জালে জড়ান হুলিও এনসিসো। জার্মান রক্ষণভাগ তখন সম্পূর্ণ নিশ্চল এবং গোলরক্ষক ম্যানুয়েল ন্যুয়ার ছিলেন একেবারেই অসহায়। স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে যখন প্যারাগুয়ের সমর্থকরা উৎসবে মেতে ওঠেন, তখন জার্মান সমর্থকদের চোখে ভেসে উঠছিল বিগত দুই বিশ্বকাপের সেই দুঃসহ স্মৃতি।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই জার্মানি অল-আউট আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পুরো ম্যাচে প্রায় ৭৫ শতাংশ বলের দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে এবং প্রতিপক্ষের গোলমুখে ২১টি শট নিয়েও জার্মানি কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পাচ্ছিল না। মাঝমাঠের গতি বাড়াতে নাগেলসম্যান বেশ কিছু পরিবর্তন আনলেও রক্ষণভাগের দুর্বলতা কাটেনি। উল্টো জশুয়া কিমিখের একটি মারাত্মক ভুলের কারণে প্যারাগুয়ে প্রায় দ্বিতীয় গোলটি পেয়েই যাচ্ছিল, কিন্তু অভিজ্ঞ ম্যানুয়েল ন্যুয়ার সে যাত্রায় দলকে রক্ষা করেন। অবশেষে ম্যাচের ৫৪ মিনিটে জার্মানি তাদের বহু কাঙ্ক্ষিত সমতাসূচক গোলটি পায়। বাঁ প্রান্ত থেকে ফ্লোরিয়ান ভির্টজের একটি চমৎকার ক্রস থেকে আলতো হেডে গোল করেন আর্সেনাল স্ট্রাইকার কাই হাভার্টজ। সমতায় ফেরার পর মনে হয়েছিল জার্মানরা হয়তো তাদের চিরচেনা আগ্রাসী রূপে ফিরবে, কিন্তু প্যারাগুয়ের ডিফেন্ডাররা বীরত্বের সাথে খেলা পরিচালনা করে নির্ধারিত ৯০ মিনিট ১-১ সমতায় শেষ করেন। অতিরিক্ত সময়েও ম্যাচের ভাগ্য বদলায়নি। অতিরিক্ত সময়ের শেষভাগে জনাথন তাহ কর্নার থেকে বল জালে জড়ালেও ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর (VAR) প্রযুক্তির সাহায্যে ফাউলের কারণে সেই গোল বাতিল হয়ে যায়। ১২০ মিনিটের লড়াই শেষে ম্যাচটি গড়ায় স্নায়ুক্ষয়ী টাইব্রেকারে।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে টাইব্রেকার মানেই ছিল জার্মানির নিশ্চিত জয়। সব ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা মিলিয়ে বিগত ৫০ বছর ধরে টাইব্রেকারে অপরাজিত ছিল তারা। ১৯৭৬ সালের ইউরো ফাইনালে চেকোস্লোভাকিয়ার কাছে হারার পর থেকে এই স্নায়ুর যুদ্ধে জার্মানিকে কেউ হারাতে পারেনি। কিন্তু বোস্টনের এই ঐতিহাসিক রাতে ইতিহাস তার নতুন এক নায়ককে বেছে নেয়, যার নাম অরল্যান্ডো গিল। প্যারাগুয়ের এই গোলরক্ষকের জীবনকাহিনি কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়। মাত্র কয়েক বছর আগেও চরম দারিদ্র্যের কারণে যাকে নিজের ফুটবল খেলার বুট ও সরঞ্জাম পর্যন্ত বিক্রি করে দিতে হয়েছিল, সেই গিল আজ হয়ে উঠলেন পুরো প্যারাগুয়ে জাতির স্বপ্নপূরণের মহানায়ক। টাইব্রেকারের শুরুতেই জার্মানির নির্ভরযোগ্য তারকা কাই হাভার্টজের শট বাম দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আটকে দেন গিল। এরপর নিক ভোল্টেমাডের শটটিও একই দক্ষতায় প্রতিহত করেন তিনি। গিলের এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্স জার্মানির শত বছরের আত্মবিশ্বাসকে নাড়িয়ে দেয়।

নাটকের অবশ্য তখনও কিছু অংশ বাকি ছিল। অভিজ্ঞতার পুরো ঝুলি ঢেলে দিয়ে ম্যানুয়েল ন্যুয়ারও প্যারাগুয়ের একটি শট ঠেকিয়ে এবং অন্য একটি শট লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে বাধ্য করে জার্মানিকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে জার্মানির জোনাথন তাহ তাঁর শটটি গোলবারের অনেক ওপর দিয়ে আকাশে উড়িয়ে মারেন। ফলে চূড়ান্ত পেনাল্টি নেওয়ার সমস্ত চাপ এসে পড়ে প্যারাগুয়ের ২৯ বছর বয়সী ডিফেন্ডার হোসে কানালের ওপর। ইনজুরিতে পড়া মূল খেলোয়াড় আলডেরেটের পরিবর্তে এই ম্যাচে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। কানালের বাঁ পায়ের একটি বুলেট গতির শট সরাসরি জার্মানির জালের ওপরের কোণায় আছড়ে পড়ার সাথে সাথেই নিশ্চিত হয়ে যায় প্যারাগুয়ের ঐতিহাসিক জয়। এর সাথে সাথেই অবসান ঘটে দীর্ঘ ২৮ বছর পর প্যারাগুয়ের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার অপেক্ষার।

ম্যাচ শেষে বিধ্বস্ত জার্মান কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যান অত্যন্ত হতাশ কণ্ঠে ফুটবলের এই নিষ্ঠুর সত্যটি মেনে নেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্বীকার করেন যে, নকআউটের প্রথম পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়া জার্মান ফুটবলের ঐতিহ্যের সাথে কোনোভাবেই খাপ খায় না। এটি টানা তৃতীয়বারের মতো বড় আসরে জার্মানির চরম ব্যর্থতা এবং সবাইকে এখন এটি মেনে নিতেই হবে যে, জার্মানি আর বিশ্ব ফুটবলের প্রথম সারির বা পরাশক্তি দলগুলোর তালিকায় নেই। অন্যদিকে প্যারাগুয়ের জন্য এটি ছিল এক অবিস্মরণীয় ও উৎসবের রাত। এই ঐতিহাসিক বিজয়ের সুসংবাদ পাওয়ার পর প্যারাগুয়ের রাষ্ট্রপতি দেশটিতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছেন। কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের পরবর্তী প্রতিপক্ষ শক্তিশালী ফ্রান্স হলেও, টাইব্রেকারে জার্মানিকে বিদায় করে দেওয়া এই লাতিন পরাশক্তি এখন যেকোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটাতে প্রস্তুত।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category