• শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ১২:৪০ পূর্বাহ্ন

উদ্যোক্তা ঋণের সহজ শর্তে আসছে যুব ব্যাংক

Reporter Name / ৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ব্যাংকিং খাতের সার্বিক সক্ষমতা বিবেচনা করে অনেক দিন ধরেই নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদরা ব্যাংকের সংখ্যা কমানোর তাগিদ দিয়ে আসছেন। এমনকি সম্প্রতি দেশের জাতীয় সংসদেও ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনার বিষয়ে জোরালো আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান ব্যাংকের সংখ্যা কমানোর এই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেই দেশের তরুণদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা ও বিশেষায়িত একটি নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। সম্ভাবনাময় তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে এবং আর্থিক সহায়তা দিতে প্রস্তাবিত এই ব্যাংকটির নাম রাখা হয়েছে ‘যুব ব্যাংক’।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের এই নতুন ব্যাংক খোলার নীতিগত পরিকল্পনাটি উঠে আসে গত ৭ই মে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সভায়। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ওই সভায় দেশের বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থার কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তুলে ধরা হয়। সভায় জানানো হয়, দেশের প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কঠিন শর্ত, প্রয়োজনীয় জামানত (ক্ল্যাটারাল) প্রদানের অক্ষমতা, পূর্ব অভিজ্ঞতা বা আর্থিক সক্ষমতার অভাবে তরুণ সমাজ সহজে ঋণ সুবিধা পায় না। এর ফলে দেশের হাজার হাজার যুবকের বুকচেরা সম্ভাবনাময় ও সৃজনশীল উদ্যোগগুলো আলোর মুখ দেখার আগেই অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়ে যায়। এই বাস্তবতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সভায় একটি যুববান্ধব বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। যেখানে তরুণরা অত্যন্ত সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পাবে, যা দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন স্টার্টআপের বিকাশ এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা কার্যক্রমে বড় ধরনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।

এই প্রাথমিক আলোচনার সূত্র ধরে সভায় প্রস্তাবিত ‘যুব ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠার সামগ্রিক সম্ভাব্যতা যাচাই, ব্যাংকের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আইনি নীতিমালা প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন কাঠামো এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব এই উদ্যোগের সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, তারা বর্তমানে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণদের সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ‘সিড ফাইন্যান্সিং’ বা প্রাথমিক মূলধন ঋণ দিয়ে থাকেন। এখন এই ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক ঋণ কার্যক্রমকে আরও বড় পরিসরে এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্যই মূলত একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিষয়ে নীতিগত আলোচনা চলছে। যারা খুব স্বল্প পুঁজি নিয়ে নতুন ব্যবসা শুরু করতে চান, তাদের পাশে দাঁড়ানোই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি এখনো একেবারে প্রাথমিক স্তরে রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিভিন্ন অংশীজন ও আর্থিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হবে।

তবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের এই মহৎ উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনার বিপরীতে দেশের বর্তমান ব্যাংকিং খাতের বাস্তব চিত্র এবং অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন অত্যন্ত হতাশাজনক। বর্তমানে দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি বড় বিশেষায়িত ব্যাংক সচল রয়েছে, যেগুলো হলো—বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক (পিকেবি)। এর বাইরে তফসিল-বহির্ভূত বা বিশেষায়িত আরও পাঁচটি ব্যাংক রয়েছে, যার মধ্যে আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক এবং পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক অন্যতম। দুঃখজনক বিষয় হলো, বিশেষায়িত এই ব্যাংকগুলোর প্রায় প্রতিটিই বর্তমানে চরম মূলধন ঘাটতি, ক্রমাগত লোকসান এবং আকাশচুম্বী খেলাপি ঋণের মতো বহুমুখী ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটে নিমজ্জিত।

দেশের কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনের মূল স্লোগান নিয়ে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক নিজেই এখন তীব্র অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। বছরের পর বছর ধরে ধারাবাহিক লোকসান গুনতে থাকা এই ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি বর্তমানে ২৯ হাজার ২০৭ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কে গিয়ে ঠেকেছে। কেবল বিগত ছয় অর্থবছরেই ব্যাংকটি ১৯count হাজার কোটি টাকারও বেশি নিট লোকসান দিয়েছে। এর চেয়েও ভয়ংকর চিত্র হলো ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৪৯ দশমিক ৪৪ শতাংশই এখন খেলাপি ঋণের খাতায় নাম লিখিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাস শেষে দেশের সব বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ৪৭ হাজার ৮৬ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ১৯ হাজার ১৭৫ কোটি টাকাই খেলাপি হয়ে গেছে। অর্থাৎ, বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের গড় হার দাঁড়িয়েছে ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ, যা যেকোনো সুস্থ অর্থনীতির জন্য এক চরম বিপদের সংকেত।

একইভাবে, ২০১০ সালে প্রবাসীদের সার্বিক কল্যাণ ও অভিবাসন ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকও প্রতিষ্ঠার দেড় দশকে প্রবাসীদের জীবনে বড় কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে পারেনি। সীমিত পরিসরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে ২০১৮ সালে একে তফসিলভুক্ত করা হলেও গত অর্থবছরে ব্যাংকটির লোকসান হয়েছে প্রায় শতকোটি টাকা।

এই চরম অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং সংকটের মধ্যে বিদ্যমান বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর কোনো ধরনের আমূল সংস্কার না করে আরেকটি সমজাতীয় নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদরা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এই বিষয়ে কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন যে, এভাবে খাত বা নাম ধরে ধরে ব্যাংক তৈরি করার কোনো বৈজ্ঞানিক বা অর্থনৈতিক প্রয়োজন নেই। পৃথিবীর কোনো উন্নত দেশে এত বিপুল সংখ্যক ব্যাংক থাকে না। দেশের বিদ্যমান ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য এমনিতেই অত্যন্ত নাজুক। যে উদ্দেশ্যে ব্যাংকগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্য অর্জিত হয় না। তিনি মনে করেন, নতুন ব্যাংক তৈরি করে রাষ্ট্রের ওপর ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে বরং বিদ্যমান দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত (মার্জ) করে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করা উচিত। তরুণদের যে ধরনের আর্থিক সুবিধার কথা বলা হচ্ছে, তা বিদ্যমান ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেই সঠিক তদারকির মাধ্যমে দেওয়া সম্ভব।

সম্প্রতি দেশের জাতীয় সংসদেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা দেশের জনগণের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং রাষ্ট্রের অপচয় কমাতে ব্যাংকের সংখ্যা অবিলম্বে কমিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রায় বিশাল এক জনগোষ্ঠী এখনো আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়ে গেছে। সেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ ভালো, কিন্তু আমাদের দেশে যে মহৎ উদ্দেশ্যে ব্যাংক তৈরি করা হয়, পরবর্তীতে তা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও সুশাসনের অভাবে ভেঙে পড়ে। বর্তমানে দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও বিদেশী মিলিয়ে মোট ৬২টি তফসিলি ব্যাংক এবং ৫টি তফসিল-বহির্ভূত ব্যাংক রয়েছে। এই বিশাল ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের সুশাসন নিশ্চিত না করে নতুন কোনো ব্যাংক খোলা হলে, সেটিও যে ভবিষ্যতে আরেকটি দুর্বল ও লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে না, সেই গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা সরকার কীভাবে দেবে—চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category