• বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ১১:৪১ অপরাহ্ন

নকশার ভুলে স্থবির ১৭ হাজার কোটির ঢাকা-সিলেট মেগা প্রকল্প

Reporter Name / ৪ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এক মহাসড়ক লাইফলাইন হিসেবে বিবেচিত ‘সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প’ এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পটি মূলত প্রাথমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মারাত্মক ত্রুটি এবং মূল নকশার ভুলের কারণে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জমি অধিগ্রহণে চরম ধীরগতি, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তরে দীর্ঘসূত্রতা এবং সংশোধিত নকশার সময়মতো অনুমোদন না হওয়া। ফলে মাঠপর্যায়ে একের পর এক জটিলতা তৈরি হচ্ছে, যা প্রকল্পটির নির্মাণ সময় এবং ব্যয় দুটোই বহুলাংশে বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। এখানেই শেষ নয়, প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়া, কর আদায় ও বিল পরিশোধে প্রায় ২৫০ কোটি টাকার বিশাল আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্রও সরকারি অডিটে বা নিরীক্ষায় উন্মোচিত হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক নিবিড় ও বিশেষ সমীক্ষা প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো উঠে এসেছে। এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি গভীর দুঃখ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আইএমইডির দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ছয় বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদের প্রায় ৮৯ শতাংশ সময় ইতিমধ্যে পার হয়ে গেছে। অথচ চলতি বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত প্রকল্পের সামগ্রিক ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ২৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ, সিংহভাগ সময় শেষ হয়ে গেলেও কাজের চার ভাগের তিন ভাগই এখনো বাকি রয়ে গেছে। প্রকল্পে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৪২১ কোটি ৬৩ লাখ ৫৯ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রধান অর্থায়নকারী সংস্থা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) ঋণই হলো ৩ হাজার ৭০৪ কোটি ৬৪ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। বর্তমানের এই মন্থর গতি সচল না হলে নির্ধারিত সময়ে কোনোভাবেই কাজ শেষ করা সম্ভব নয় বলে আইএমইডি স্পষ্ট করে দিয়েছে। এই বিষয়ে প্রকল্পের পরিচালক এ কে এম ফজলুল করিম বাস্তব সত্যটি স্বীকার করে বলেন, প্রাথমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বাস্তবায়ন পর্যায়ের মধ্যে কিছু মারাত্মক অসামঞ্জস্যতা ধরা পড়েছে। প্রাথমিক ভূতাত্ত্বিক জরিপের সীমাবদ্ধতার কারণে কাজের মাঝপথে এসে ডিএস-১ লটে কাদা এবং ডিএস-৭ লটে অনুপযুক্ত জৈব মাটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যার কারণে নকশা সংশোধন ও ভূমি উন্নয়ন করতে গিয়ে কাজে বড় ধরনের বিলম্বের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

আইএমইডির তদন্ত দল প্রকল্পের গোড়ায় গলদটি চিহ্নিত করে বলেছে, ২০১৯ সালে প্রণীত সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ভূগর্ভস্থ মাটির পরিস্থিতি এবং গ্যাস-বিদ্যুতের পাইপলাইনের অবস্থান যথাযথভাবে নির্ণয় করা হয়নি। ফলে বাস্তবে সড়ক নির্মাণ করতে গিয়ে ঠিকাদারেরা যখন একের পর এক কাদা ও দুর্বল মাটির সন্ধান পান, তখন বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কাদা অপসারণ ও বারবার নকশা পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে, যা পুরো নির্মাণসূচিকে তছনছ করে দিয়েছে। এর পাশাপাশি জমি অধিগ্রহণের চিত্রটিও অত্যন্ত হতাশাজনক। ১৯০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ এই সড়কের জন্য মোট ৮২৯ দশমিক ৮৩ একর জমির প্রয়োজন হলেও প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এ পর্যন্ত মাত্র ৩১২ দশমিক ১৫ একর বা ৩৭ দশমিক ৬১ শতাংশ জমি বুঝে পেয়েছে। জমি না পাওয়ায় ১৯০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ঠিকাদারদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে মাত্র ৯১ দশমিক ২২ কিলোমিটার। ইউটিলিটি স্থানান্তরের ক্ষেত্রে দেখা গেছে বিদ্যুতের কাজ ৪৬ শতাংশ হলেও তিতাস গ্যাসের পাইপলাইন স্থানান্তরের অগ্রগতি মাত্র শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং জালালাবাদ গ্যাসের ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ। জেলা প্রশাসন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের চরম অভাবের কারণেই ঠিকাদারেরা অনেক স্থানে কাজের উপযোগী জায়গা পাচ্ছেন না। মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনে দেখা গেছে, মূল সড়ক নির্মাণের অগ্রগতি মাত্র ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ, সার্ভিস লেনের ১৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং সেতুর ৩১ দশমিক ১৪ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আর ইউ-টার্ন বা ফুটওভারব্রিজের কাজ এখনো খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে, মাঠপর্যায়ে শুরুই হয়নি।

নির্মাণকাজের এই ধীরগতির সমান্তরালে প্রকল্পটিতে ভর করেছে বিশাল আর্থিক কেলেঙ্কারি। সরকারি ও অভ্যন্তরীণ অডিটে দেখা গেছে, সর্বনিম্ন বৈধ দরদাতাকে অবৈধভাবে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন, ঠিকাদারকে অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ এবং কর কর্তনে অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ২৪৯ কোটি ৯৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকার বিশাল আর্থিক অনিয়ম করা হয়েছে। এছাড়া কোনো কাজ না করেই প্রকৌশলীদের অর্ধস্থায়ী আবাসন বা কোয়ার্টারের নামে ৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকার ভুয়া বিল পরিশোধ, মূল্য সমন্বয়ের নামে ২৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকা অতিরিক্ত প্রদান, ঠিকাদারের বিল থেকে প্রাপ্য ৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকার ভ্যাট ও আয়কর সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া এবং কোনো ভেরিয়েশন বা আইনি অনুমোদন ছাড়া ৪৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকার অতিরিক্ত বিল পাসের মতো গুরুতর আর্থিক অপরাধের প্রমাণ অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সব আপত্তির সিংহভাগই এখনো নিষ্পত্তিহীন অবস্থায় রয়েছে। এর বাইরে আইএমইডির দল কাজের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে; বেশ কিছু অংশে ব্যবহৃত কংক্রিটের কমপ্রেসিভ স্ট্রেংথ বা স্থায়িত্বের মান নির্ধারিত নকশার চেয়ে অনেক কম পাওয়া গেছে। এমনকি নির্মাণস্থলে শ্রমিকদের কোনো ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই), নিরাপত্তা বেষ্টনী বা সতর্কীকরণ সংকেত না থাকায় প্রতিদিন মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

এই মেগা প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি নির্মাণকাজের অব্যবস্থাপনার কারণে স্থানীয় জনজীবন চরম বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলমান খোঁড়াখুঁড়ি ও ধুলাবালির কারণে ৮৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ স্থানীয় মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ধুলাবালি, তীব্র শব্দদূষণ, যত্রতত্র ফেলে রাখা নির্মাণবর্জ্য এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ৬৯ দশমিক ২৩ শতাংশ বাসিন্দা অতিষ্ঠ। এছাড়া জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ নিয়েও স্থানীয়দের মনে চরম ক্ষোভ রয়েছে। প্রায় ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ জমির মালিক এখনো তাদের ঘরবাড়ি ও জমির ক্ষতিপূরণের কোনো টাকাই পাননি। আর যে সামান্য কয়েকজন টাকা পেয়েছেন, তাদের মধ্যে ৭২ দশমিক ৫২ শতাংশ মনে করেন যে তারা ন্যায্য মূল্য পাননি, যা একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের জন্য অনভিপ্রেত। এই বিষয়ে এডিবির সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার (পরিবহন) হুমায়ুন কবির জানান, এডিবির পক্ষ থেকে অর্থ ছাড়ে কোনো বিলম্ব না হলেও ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন ও দুর্বল ঠিকাদার পারফরম্যান্সের কারণেই এই দশা। আইএমইডির চূড়ান্ত সুপারিশে বলা হয়েছে, এখনই যদি সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় জমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তর শেষ করা না হয়, তবে এই ১৭ হাজার কোটির প্রকল্প দেশের জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category