• বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ১১:৪২ অপরাহ্ন

অক্টোবরে শুরু হতে পারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন

Reporter Name / ৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এবার দেশের তৃণমূল রাজনীতিকে সচল ও গতিশীল করতে বড় ধরনের প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও অন্তর্বর্তীকালীন প্রক্রিয়ার পর গঠিত নতুন সরকার। আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ এবং সিটি কর্পোরেশন—স্থানীয় সরকারের সব স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন করার একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের অক্টোবর মাস থেকেই ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এই সুবৃহৎ নির্বাচনি কর্মযজ্ঞের আনুষ্ঠানিক সূচনা করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন ও জনপ্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এবং মাঠপর্যায়ে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই ধারাবাহিক নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় সরকারের এই বিশাল নির্বাচনি আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করতে সরকারের বিশাল অঙ্কের বাজেট বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন যে, স্থানীয় সরকারের সব স্তরের ভোট শেষ করতে সরকারের সম্ভাব্য প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে কেবল প্রাথমিক ধাপে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্যই প্রয়োজন হবে ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই বিপুল পরিমাণ নির্বাচনি বাজেট সংকুলানের জন্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই অর্থ বিভাগের সাথে কাজ শুরু করেছে। প্রতিমন্ত্রীর মতে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকস এবং বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাথে চূড়ান্ত আলোচনার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনকে ভোট আয়োজনের আনুষ্ঠানিক পরামর্শ বা সবুজ সংকেত দেওয়া হবে। পরবর্তীতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন তাদের নিজস্ব তফসিল ও সক্ষমতার আলোকে চূড়ান্ত ভোটের তারিখ ঘোষণা করবে।

নির্বাচন আয়োজনের এই প্রশাসনিক প্রস্তুতির সমান্তরালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালা সংশোধনের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে নির্বাচন কমিশন। আইনি কাঠামোকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে ইতিমধ্যেই সংশোধিত আইনের একটি চূড়ান্ত খসড়া সর্বসাধারণ ও অংশীজনদের মতামতের জন্য ইসির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছিল। এই খসড়া নীতিমালার ওপর দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন নাগরিক সমাজ ও স্টেকহোল্ডারদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ লিখিত মতামত সংগ্রহ করা হয়েছে। এবারের সংশোধিত বিধিমালায় বেশ কিছু বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রস্তাব আনা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে—অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার প্রথাগত সুযোগ বন্ধ করা, নির্বাচনি প্রচারণায় সব ধরনের এনালগ বা কাগজের পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, প্রবাসীদের জন্য ডাকযোগে ভোট দেওয়ার বা পোস্টাল ব্যালট সুবিধা বাতিল করা এবং নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণার প্রভাব বলয় থেকে সংশ্লিষ্ট উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়রদের সম্পূর্ণ দূরে রাখা। এছাড়া অযোগ্য বা অতিমাত্রায় ডামি প্রার্থীর মনোনয়ন ঠেকাতে জামানতের অর্থের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমদ জানান, অংশীজনদের কাছ থেকে প্রাপ্ত সব যৌক্তিক মতামত খসড়ায় সন্নিবেশিত করে চূড়ান্ত আইনি রূপ দেওয়া হচ্ছে এবং কমিশন শুরুতে ছোট নির্বাচন বা ইউনিয়ন পরিষদ দিয়েই মাঠের ভোট শুরু করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

দীর্ঘদিন পর স্থানীয় পর্যায়ে তৃণমূলের সাধারণ মানুষের ব্যাপক ও স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হওয়ায় এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং উৎসবমুখর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সাধারণত ইউনিয়ন পরিষদ বা স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে জাতীয় রাজনীতির একটি পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ প্রতিফলন ঘটে থাকে। ফলে স্থানীয় প্রার্থীদের নিজস্ব জনপ্রিয়তা, দলীয় সাংগঠনিক শক্তি এবং প্রার্থীর প্রতি সাধারণ ভোটারদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা—সবকিছুই এবারের ব্যালট যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে। অক্টোবর মাসে ভোটগ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের ভৌত অবকাঠামোগত মান নিশ্চিত করা, নির্বাচনি গোপনীয় সামগ্রী সংগ্রহ এবং স্থানীয় মাঠ প্রশাসনের সাথে নিয়মিত সমন্বয় সভা চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সাথে প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটের পরিবেশ বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে প্রাথমিক নিরাপত্তা ছক তৈরি করা হচ্ছে। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও স্বৈরাচারী দল আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না। ফলে দলটির অনুপস্থিতিতেই গ্রামীণ রাজনীতিতে এক নতুন ও তীব্র নির্বাচনি উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যেই দেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান, মেয়র ও মেম্বার প্রার্থীদের গণসংযোগ এবং সামাজিক-ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো বৃদ্ধি পেয়েছে।

তৃণমূলের এই বিশাল নির্বাচনি উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও ব্যাপক প্রস্তুতি ও প্রার্থিতা ঘোষণার তৎপরতা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামী এবং নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ইতিমধ্যেই তাদের নির্বাচনি কর্মকাণ্ড ও প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ গুছিয়ে এনেছে। বিভিন্ন হাট-বাজার, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও জনসমাগমস্থল সম্ভাব্য প্রার্থীদের রঙিন ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টারে সেজে উঠেছে। ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে প্রার্থীরা ব্যক্তিগত যোগাযোগের পাশাপাশি ডিজিটাল বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা তৃণমূলের মাঠ চষে বেড়ানোর পাশাপাশি বর্তমান সরকারের চলমান ইতিবাচক ও জনকল্যাণমুখী কর্মকাণ্ড ভোটারদের সামনে তুলে ধরছেন। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী এই বিষয়ে জানান যে, স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাদের দলীয় প্রস্তুতি অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং ইসির পক্ষ থেকে দিনক্ষণ বা তফসিল ঘোষণা হওয়ার পর দলীয় পূর্ণ শক্তি নিয়ে নেতাকর্মীরা ধানের শীষের পক্ষে ভোটের মাঠে নামবেন। সরকারের জাতীয় সফলতার ইতিবাচক প্রভাব তৃণমূলের ভোটেও পড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এদিকে, দেশের প্রধান দলগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১২টি সিটি কর্পোরেশনের জন্য তাদের দলীয় প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করে ফেলেছে। ইতিমধ্যেই ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সম্ভাব্য জামায়াত প্রার্থীদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ জানান, পৌরসভা, জেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতা, সততা ও স্থানীয় জনপ্রিয়তাকে প্রাধান্য দিয়ে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। কিছু কিছু এলাকায় কৌশলগত কারণে ১১-দলীয় ঐক্যের শরিক দলগুলোর সাথে আসন বা প্রার্থী সমঝোতা হতে পারে, তবে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলোতে জামায়াত এককভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে, দেশের নতুন রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ইতিমধ্যে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়র পদে তাদের প্রথম ধাপের ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে চমক দিয়েছে। এনসিপির স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে আসা পরিচ্ছন্ন ইমেজ এবং রাজনীতির বাইরে থাকা যোগ্য ও তরুণ সমাজসেবীদের যাচাই-বাছাই করেই এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং খুব শিগগিরই তারা দ্বিতীয় ধাপে আরও ১০০টি উপজেলার প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন। সব মিলিয়ে, অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাওয়া এই স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অভূতপূর্ব নির্বাচনি আবহ তৈরি হয়েছে, যা আগামী দিনে দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।

তথ্যসূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category