• শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ১২:১২ পূর্বাহ্ন
Headline
মধ্যবিত্তের যে ১০টি অভ্যাস আর্থিক বিড়ম্বনা ডেকে আনে রথযাত্রায় হিন্দুদের পাশে থাকার নির্দেশ রিজভীর শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে কূটনৈতিক চেষ্টার কোনো ঘাটতি নেই সরকারি হিসাবে ৭ লাখ দেখালেও গাছ লাগানো হয়েছে ২ লাখ: প্রধানমন্ত্রী আগামী নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে: আইনমন্ত্রী তুরস্কের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বগুড়ায় হচ্ছে ড্রোন কারখানা: মীর শাহে আলম বন্যায় ভেসে গেল খামারের ৯০০ সাপ, লোকালয়ে আতঙ্ক যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরান চীন ও রাশিয়ার রেলসেতু ক্ষতিগ্রস্ত সুপার কম্পিউটারের ভবিষ্যদ্বাণী, বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠবে যে ৪ দল শীর্ষ ১০ শিল্পগ্রুপের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা করছে সরকার

নিজের তৈরি আইনেই নিষিদ্ধের ঝুঁকিতে আওয়ামী লীগ

Reporter Name / ৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬

স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর ইতিহাস ও আইনি মারপ্যাঁচে এক নজিরবিহীন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও সন্ত্রাসের অভিযোগে বর্তমানে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত চলছে। ১৯৭৫ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ক্রসফায়ারের শিকার সিরাজ শিকদার হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে বিগত আওয়ামী লীগ আমলের দেড় দশক এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সব অপরাধই এই তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে। তদন্তে অপরাধের প্রমাণ মিললে খোদ আওয়ামী লীগেরই প্রণীত ও সংশোধিত আইনের বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী দলটি দেশে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ হতে পারে এবং দলটির যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হতে পারে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বা বিশেষ প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময়ে যে আইনি অস্ত্র তৈরি করেছিল, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর এখন সেই নিজস্ব আইনেই দলটির অস্তিত্ব চরম সংকটের মুখে পড়েছে।

ট্রাইব্যুনাল এবং প্রসিকিউশন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনটি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারই প্রথম প্রণয়ন করেছিল। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে এই আইনের ২ নম্বর ধারা সংশোধন করে ‘অরগানাইজেশন’ বা ‘সংগঠন’ শব্দটি যুক্ত করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ প্রশাসনই। এখন এই বিদ্যমান আইনি কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে এগোচ্ছে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞদের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন নাৎসি বাহিনীর নৃশংস অত্যাচারের বিচার যেভাবে ১৯৪৫-৪৬ সালে ঐতিহাসিক নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে করা হয়েছিল, বর্তমান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের মাধ্যমে প্রায় একই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক বিচার করা সম্ভব।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক (কো-অর্ডিনেটর) আনসার উদ্দিন খান পাঠান জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত কার্যক্রম পুরোদমে চলমান। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছিল জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)। আবেদনটি তদন্ত সংস্থায় আসার পরপরই একটি বিশেষ টিম এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও ঐতিহাসিক বিষয়টির তদন্ত শুরু করেছে। তদন্ত সংস্থা স্পষ্ট করেছে যে, স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের দ্বারা এযাবৎকাল যত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হয়েছে, তার সবকটিই এই তদন্তের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। অনেক বছরের পুরনো ঘটনা এবং নথিপত্র দীর্ঘ হওয়ায় চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।

এই আইনি প্রক্রিয়াকে আরও সুনির্দিষ্ট করতে গত ২০২৫ সালের ১০ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন সংশোধন করে নতুন অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যা পরবর্তীতে জাতীয় সংসদেও অনুমোদন পায়। এই সংশোধিত অধ্যাদেশের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক দল, তার অঙ্গসংগঠন বা সমর্থক গোষ্ঠীকে সরাসরি শাস্তি দেওয়ার আইনি ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া হয়েছে। সংশোধিত আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, যদি ট্রাইব্যুনালের কাছে প্রতীয়মান হয় যে কোনো সংগঠন বা রাজনৈতিক দল এই আইনের আওতায় কোনো অপরাধ সংঘটন, উসকানি, মদদ বা ষড়যন্ত্র করেছে, তবে ট্রাইব্যুনাল উক্ত সংগঠনের কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত বা স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে। একই সাথে দলের নিবন্ধন বা লাইসেন্স বাতিল এবং দলের সব সম্পত্তি জব্দ করার একক ক্ষমতাও ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া হয়েছে। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিশ্চিত করেছেন যে, তদন্ত শেষ হওয়া মাত্রই খুব শীঘ্রই আওয়ামী লীগকে সংগঠন হিসেবে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে এবং আদালতের চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থগিতের বিষয়টি বিবেচনাধীন থাকবে।

ট্রাইব্যunal-এর চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এবং সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে জানান, ট্রাইব্যুনালের বিদ্যমান ও সংশোধিত আইনের আলোকে একটি রাজনৈতিক দলকে শারীরিক বা ব্যক্তিগত সাজা দেওয়া সম্ভব না হলেও, দলটিকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা বা তার লাইসেন্স বাতিল ও সম্পত্তি জব্দের পর্যাপ্ত বিধান রয়েছে। তবে এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোর্শেদসহ কিছু আইনজ্ঞ ভিন্নমত ও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ১৯৭৪ থেকে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সময়ের অপরাধগুলো প্রমাণ করার ক্ষেত্রে কিছু প্রায়োগিক জটিলতা রয়েছে, কারণ কোনো দল প্রকাশ্যে রেজুলেশন বা লিখিত সিদ্ধান্ত নিয়ে অপরাধ করে না। কেউ কেউ মনে করছেন, এই বিচারের পেছনে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে চরম চাপে রাখা কিংবা আগামী নির্বাচন থেকে পুরোপুরি দূরে রাখার মতো কৌশলগত উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। তবে বিচারে শেষ পর্যন্ত দলটি নিষিদ্ধ হলেও তারা ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ নতুন নামে রাজনীতিতে ফিরে আসার চেষ্টা করতে পারে।

বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে দেশে অন্তত ১ হাজার ৯২৬ জন মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এছাড়া জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দেশজুড়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে নির্বিচারে হত্যা এবং ২৫ হাজার মানুষকে গুরুতর আহত করার সরাসরি নির্দেশদাতা ও মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন। এই বিশাল অপরাধের দায়ভার একটি দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এড়াতে পারে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে চিফ প্রসিকিউটর আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাইব্যুনালে প্রতিবেদন দাখিল করলেই নিজের তৈরি আইনের ফাঁদে আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারিত হবে।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category