• শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৪ অপরাহ্ন

বিতর্কিত কর্মকর্তাদের গণপদোন্নতিতে প্রশাসনে তুমুল বিতর্ক

Reporter Name / ৪ Time View
Update : শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

দেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর প্রশাসনিক ঘটনার সাক্ষী হলো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সরকারি চাকরি থেকে নিয়ম অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক অবসরে পাঠানোর মাত্র ৯ দিন পর এক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়ে যুগ্ম সচিব বানানোর চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। মাইনুল হক ভূঁইয়া নামের ওই কর্মকর্তা কেবল একা নন, তাঁর পাশাপাশি অতীতে নানা ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও অসদাচরণের দায়ে বিভাগীয়ভাবে দণ্ডপ্রাপ্ত বেশ কয়েকজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকেও এই বৃহৎ পদোন্নতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব পদে একসঙ্গে ১৭৯ জন কর্মকর্তার পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করার পর দেশের সিভিল প্রশাসনে এটাই এখন পর্যন্ত একসঙ্গে সবচেয়ে বড় ও ব্যাপক পদোন্নতির ঘটনা। তবে এই বিশাল তালিকায় যোগ্য ও মেধাবীদের বাদ দিয়ে বিতর্কিতদের ঠাঁই দেওয়ায় সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সামগ্রিক যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশাসনের অন্দরেই তীব্র ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন উঠেছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা ওই বিশেষ প্রজ্ঞাপনের ৫৩ নম্বর ক্রমিকে স্থান পেয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সাবেক উপসচিব মাইনুল হক ভূঁইয়া। অথচ এর ঠিক কিছুদিন আগে, গত ৩০ জুন একই মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁর বয়স ৫৯ বছর পূর্ণ হওয়ায় সরকারি চাকরি আইনের ৪৩ এর ১(ক) ধারা মোতাবেক তাঁকে রাষ্ট্রীয় চাকরি থেকে চূড়ান্ত অবসরে পাঠানো হয়েছিল। অবসরে যাওয়া একজন সাবেক কর্মকর্তাকে পুনরায় সচল পদে পদোন্নতি দেওয়ার এই ঘটনাটি আমলাতন্ত্রের ইতিহাসে এক বিরল আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই গুরুতর অসঙ্গতির বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক বা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা বা স্পষ্টীকরণ দেওয়া হয়নি। তবে এই বিষয়ে সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত মাইনুল হক ভূঁইয়া জানিয়েছেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পুরোপুরি জেনেশুনেই তাঁকে এই পদোন্নতি দিয়েছে এবং এটি কোনো অনিচ্ছাকৃত ভুল নয়। যেহেতু তাঁর অবসর ও পদোন্নতি দুটি প্রজ্ঞাপনই একই মন্ত্রণালয় থেকে হয়েছে, তাই হয়তো আগামীতে অন্য একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকার এই আইনি জটিলতা বা অস্পষ্টতা দূর করতে পারে।

মাইনুল হকের এই অদ্ভুত পদোন্নতির চেয়েও প্রশাসনকে বেশি নাড়া দিয়েছে পদোন্নতির তালিকায় অতীতে বিভিন্ন অপরাধে শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সদম্ভ উপস্থিতি। এই তালিকায় স্থান পাওয়া দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত উপসচিব মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। তিনি যখন ডেমরার সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তখন তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে তিন বছরের জন্য বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) স্থগিত রাখার মতো লঘুদণ্ড প্রদান করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তিনি মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে আপিল করলেও তাঁর সেই সাজা বহাল রাখা হয়। অনুরূপভাবে, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপসচিব মো. শাহীনুর ইসলামও এই পদোন্নতি ভাগ্য লাভ করেছেন। নীলফামারীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিস্তা নদীর একটি বালুমহালের ইজারাগ্রহীতার কোটি টাকার চেক সরকারি ব্যাংকে জমা না দিয়েই অর্থ প্রাপ্তির সম্পূর্ণ ভুয়া ও জাল চুক্তি করার দায়ে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। সেই মামলার তদন্তে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে এক বছরের জন্য বেতন গ্রেডের সর্বনিম্ন ধাপে অবনমিতকরণের দণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

তালিকায় দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের এই ভিড়ে আরও যুক্ত হয়েছেন স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের উপসচিব মুহাম্মদ মকবুল হোসেন। তিনি যখন রংপুর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডে কর্মরত ছিলেন, তখন বিভিন্ন সরকারি নির্মাণকাজে ভয়াবহ দুর্নীতি এবং চরম প্রশাসনিক অসদাচরণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। শাস্তি হিসেবে তাঁর দুই বছরের জন্য দুটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখার লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যদিও পরবর্তীতে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল তাঁর এই সাজা বাতিল করে। এছাড়া সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর মধ্যে রয়েছে উপসচিব ছাদেকুর রহমানের পদোন্নতি। পবিত্র কোরবানির পশুর বর্জ্য যথাসময়ে ও সুচারুভাবে অপসারণে চরম অবহেলা ও উদাসীনতার অভিযোগে খোদ প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশে গত ২৮ মে তাঁকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি কাজ করছিল এবং তিনি এখনও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হিসেবে সংযুক্ত আছেন। তদন্তের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ও ওএসডি দশা কাটার আগেই এমন একজন বরখাস্তকৃত কর্মকর্তার পদোন্নতি পাওয়াকে আমলারা এক প্রকার অলৌকিক ঘটনা বলে আখ্যা দিচ্ছেন। ছাদেকুর রহমান দাবি করেছেন যে জনপ্রশাসন সচিব শুনানির মাধ্যমে তাঁর বিষয়টি নিষ্পত্তি করে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন, তবে ওএসডি থাকার কারণ নিয়ে তিনি নীরবতা বজায় রাখেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মূলত বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৪ ও ২৫ ব্যাচের কর্মকর্তাদের এবং অতীতে বিভিন্ন সময়ে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত থাকা কর্মকর্তাদের ক্ষোভ প্রশমিত করতেই এই গণপদোন্নতির আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু চরম পরিতাপের বিষয় হলো, ২৫ ব্যাচের মেধা তালিকায় (Merit List) প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী অত্যন্ত দক্ষ ও সৎ দুই কর্মকর্তাকে এই পদোন্নতি থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাটিই মূলত প্রশাসনের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী কমিটি বা সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) নিরপেক্ষতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। প্রায় দীর্ঘ আট মাস ধরে চুলচেরা বিশ্লেষণ ও যাচাই-বাছাইয়ের নাটক করার পর এই কমিটি পদোন্নতির সারসংক্ষেপ চূড়ান্ত করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছিল। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে এই বোর্ডে দেশের প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র ও অর্থ সচিব এবং সিএজি-র মতো রাষ্ট্রের শীর্ষ কর্তারা প্রতিটি বৈঠকের জন্য মোটা অঙ্কের ভাতা নিলেও, এমন একটি ত্রুটিপূর্ণ তালিকা কীভাবে অনুমোদিত হলো তা নিয়ে ক্ষুব্ধ খোদ সিনিয়র আমলারাই।

এই চরম প্রশাসনিক কেলেঙ্কারির বিষয়ে জানতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. এহছানুল হককে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে সরকারের এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে দেশের প্রখ্যাত জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, বাংলাদেশের বিদ্যমান সরকারি চাকরি আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী কোনো অবস্থাতেই একজন অবসরে চলে যাওয়া বা পেনশনে থাকা কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। এই একটিমাত্র ভুলের কারণে সরকারের পুরো পদোন্নতির তালিকাটিই চরমভাবে বিতর্কিত ও কলঙ্কিত হয়ে গেছে, যা দেশবাসীর মনে সরকারি সিদ্ধান্ত ও আইনি কাঠামোর ওপর তীব্র অনাস্থা তৈরি করবে। দেশের জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মতে, সরকারি চাকুরিতে পদোন্নতি কোনো ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা বা দয়া-দাক্ষিণ্যের বিষয় নয়। এটি সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রশাসনিক ন্যায্যতা, চেইন অব কমান্ড এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার মূল স্তম্ভের সাথে জড়িত। মেধার অবমূল্যায়ন করে দণ্ডপ্রাপ্ত ও অবসরপ্রাপ্তদের এমন পুরস্কৃত করার ঘটনা অন্তর্বর্তী সময় পার করে আসা সরকারের ভাবমূর্তিকে জনসাধারণের দরবারে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে, যা অনতিবিলম্বে আইনি ব্যাখ্যার মাধ্যমে সংশোধন করা আবশ্যক।

তথ্যসূত্র: ভয়েজ বাংলা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category