• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৩ পূর্বাহ্ন
Headline
মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্র নাকি মতাদর্শের কারাগার: উচ্চশিক্ষালয়ে ক্রমবর্ধমান দমনপীড়ন ও সংকটের স্বরূপ বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলন – ২ ইসরায়েলে আরও একটি প্যাট্রিয়ট পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র সাত বছরে ছয় নির্বাচন, কেন থিতু হতে পারছে না ইসরায়েল? ৫৫ বছরে সবজির দাম স্থিতিশীল রাখতে উদ্যোগ নেই: বাণিজ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যখাতে আওয়ামী লীগ সরকার ব্যাপক লুটপাট করেছে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঠাকুরগাঁও উপ-নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই : ইসি সচিব ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ডেভিড ইমন ৭ দিনের রিমান্ডে আগামীতে স্কুল-মাদ্রাসায় একই প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হবে: শিক্ষামন্ত্রী ঢাকা শহরে পদ্মা থেকে ১০০ কোটি লিটার পানি সরবরাহের নতুন প্রকল্প

ডলার ও ভূরাজনীতি ঘিরে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ দূতের সফর

Reporter Name / ৯০ Time View
Update : রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

আগামী ৩০ জুলাই তিন দিনের সফরে বাংলাদেশে আগমন করছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গড়। বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সফরকে কূটনৈতিক সৌজন্যমূলক সফর বা রুটিন ফাইলওয়ার্ক মনে হলেও, নেপথ্যে রয়েছে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার এক জটিল খেলা। চলতি বছরের গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এটিই হতে যাচ্ছে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কোনো হাই-প্রোফাইল মিশন। এর আগে সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর এবং পরবর্তীতে সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ড লিঞ্চ ঢাকা সফর করলেও, এবার সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বাসভাজন বিশেষ দূতকে ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সাথে বৈঠকের পাশাপাশি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের সূচি রয়েছে তাঁর। এই আকস্মিক সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো চীন, রাশিয়া ও ব্রিক্সের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে নতুন ঢাকার সাথে সরাসরি কূটনৈতিক দরকষাকষি শুরু করা।

মার্কিন কূটনীতিতে এই তোড়জোড়ের পেছনের ঘটনাপ্রবাহ তৈরি হয়েছে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির বড় মঞ্চে। গত জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের মস্কো সফর ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে আশঙ্কার ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে। কারণ বেইজিং ও মস্কোর সাথে ঢাকার এই উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ শুধু দ্বিপক্ষীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে উদীয়মান অর্থনৈতিক ব্লক ব্রিক্সের সাথে। বিশ্বজুড়ে পশ্চিমা অর্থনৈতিক আধিপত্যের বিকল্প হিসেবে চীন ও রাশিয়া ব্রিক্সকে শক্তিশালী করার যে চেষ্টা চালাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি মার্কিন প্রশাসনের মূল উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওয়াশিংটনের প্রধান ভয় হলো, বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বাংলাদেশ যদি ব্রিক্সের মাধ্যমে চীন ও রাশিয়ার সাথে আর্থিক বা বাণিজ্যিক সমঝোতায় পৌঁছে যায়, তবে ওই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও কৌশলগত রুটে আমেরিকার একচ্ছত্র তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।

এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্ব রাজনীতিতে ‘ডলার পলিটিক্স’ বা মার্কিন মুদ্রার একক কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। রাশিয়া ও চীন বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিকল্প মুদ্রা চালুর মাধ্যমে ডিডলারাইজেশন বা ডলার-মুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে বাংলাদেশ কীভাবে সাড়াদান করে তা পর্যবেক্ষণ করছে ট্রাম্প প্রশাসন। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রো-ডলার ও মার্কিন ডলারের একক ব্যবহারই দেশটির অর্থনীতি ও প্রভাবের মূল শক্তি। বাংলাদেশ যদি ব্রিক্সের প্ল্যাটফর্মে গিয়ে নিজেদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রা বা বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণে এগোয়, তবে তা আমেরিকার বাণিজ্যিক নিরাপত্তার জন্য বড় আঘাত হিসেবে গণ্য হবে। বিশেষ দূত সার্জিও গড়ের এই মিশনের একটি অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই হলো বাংলাদেশকে পশ্চিমা তথা ডলার-বিরোধী এই অর্থনৈতিক অক্ষ থেকে দূরে রাখা এবং ডলারের ব্যবহার বজায় রাখতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমঝোতায় উপনীত হওয়া।

অর্থনৈতিক চাপের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের ওপর ওয়াশিংটনের কাছে শক্তিশালী একটি অস্ত্র রয়েছে, যা হলো ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ বা এআরটি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পাদিত এই চুক্তিতে এমন কিছু নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ঢাকার স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত করে ফেলে। এই চুক্তির বিধান স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ সম্পূর্ণ বাজারভিত্তিক অর্থনীতির বাইরে এমন কোনো দেশের সাথে বিশেষ বা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনৈতিক চুক্তি সম্পাদন করতে পারবে না। সহজ কথায়, ব্রিক্স বা চীন-রাশিয়ার সাথে কোনো বিশেষ আর্থিক বা বাণিজ্যিক সমঝোতায় পৌঁছালে আমেরিকা তাতক্ষণিকভাবে এই এআরটি চুক্তি বাতিল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। চুক্তি বাতিল হলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশী রপ্তানি পণ্যের ওপর নতুন করে চড়া শুল্ক আরোপিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। সার্জিও গড়ের আসন্ন বৈঠকে এই শুল্ক সম্পর্কিত রেডলাইনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উত্থাপিত হতে পারে।

অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বর্তমানে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের মধ্যে এক দৃশ্যমান শ্লথগতি ও রাজনৈতিক অস্বস্তি বিরাজ করছে। অতীতে দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পলিসি অনেকটাই ভারতের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন ঢাকার সাথে দিল্লির কূটনৈতিক দূরত্ব তৈরি হওয়ায় ওয়াশিংটন এই অঞ্চলে কোনো ধরনের প্রভাবের শূন্যতা তৈরি হতে দিতে নারাজ। ভারত নিষ্ক্রিয় থাকলে এই সুযোগে চীন ও রাশিয়া যাতে ব্রিক্সের মাধ্যমে বাংলাদেশে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শিকড় মজবুত করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর দিল্লির মাধ্যমে নয়, বরং সরাসরি ঢাকার সাথে টেবিল টকে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওয়াশিংটন চাইছে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতে এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত ভারসাম্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে।

কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সার্জিও গড়ের এই তিন দিনের সফর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চলতি মেয়াদের আগামী দুই বছরের বাংলাদেশ নীতি নির্ধারণে চূড়ান্ত ভূমিকা পালন করবে। ওয়াশিংটন কি বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও বিকল্প অর্থনৈতিক অবস্থানের সাথে আপস করে বাণিজ্য বজায় রাখবে নাকি কঠোর শুল্ক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের পথ বেছে নেবে, তা নির্ধারিত হবে এই মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে। ৩০ জুলাইয়ের এই সফর কেবল একটি রুটিন ছবি তোলার কর্মসূচি নয়, বরং পরাশক্তিগুলোর অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক রেডলাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার এক নতুন পরীক্ষার মুখোমুখি নতুন ঢাকা।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category