দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিএনপির নির্বাচনী অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। কিন্তু রূপরেখা বাস্তবায়নের শুরুতেই উপকারভোগীদের সঠিক তালিকা তৈরি, তথ্য সংগ্রহ এবং আনুষ্ঠানিক কার্ড বিতরণের প্রাথমিক খরচ নিয়ে চরম বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সর্বক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয় কমানো এবং কৃচ্ছ্রসাধনের ঘোষণা দেওয়া হলেও, এই সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পের আওতায় কার্ড প্রস্তুত ও প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন করতেই প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা খরচের বিশাল বাজেট প্রাক্কলন করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে কার্ড বিতরণের একক একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য ৫০ কোটি টাকার একটি ব্যয় প্রস্তাব নিয়ে। সরকারের এমন ব্যয়বহুল নীতিকে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ‘খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি’ বলে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
প্রশাসনের এমন বিপুল বাজেট প্রস্তাবনার বিষয়ে তীব্র সমালোচনা করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মতামত দেন যে, আনুষ্ঠানিক একটি উদ্বোধনী আয়োজনে যদি এত বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় করা হয়, তবে প্রকল্পের মূল সামাজিক উদ্দেশ্যটাই ব্যাহত হয়। তাঁর মতে, এ ধরনের বিলাসী আয়োজনের নামে বরাদ্দ না রেখে সেই অর্থ সরাসরি অসচ্ছল ও অভাবগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা হিসেবে দেওয়া যেত। তবে প্রকল্পের মূল কাঠামোর দায়িত্বে থাকা পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন বিষয়টি ব্যাখ্যা করে জানান যে, সম্ভাব্য ব্যয়ের খাত হিসেবে অনুষ্ঠানে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে পুরো অর্থ যে খরচ হবে, তা নিশ্চিত নয়। তিনি দাবি করেন, অনুষ্ঠান আয়োজনের চূড়ান্ত খরচের ক্ষেত্রে মিতব্যয়িতা বজায় রাখার সুযোগ রয়েছে।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে পাইলট বা পরীক্ষামূলকভাবে কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হতেই তৃণমূল পর্যায়ে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মারাত্মক অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। অনুসন্ধানী তথ্যে দেখা গেছে, ঢাকার মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলোর একটি বড় অংশ সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অথচ বিপরীত চিত্রে দেখা গেছে যে, এলাকার তুলনামূলকভাবে সচ্ছল ব্যক্তি এবং বহুতল ঘরের একাধিক বাড়িওয়ালারা অনায়াসে এই বিশেষ ফ্যামিলি কার্ড বাগিয়ে নিয়েছেন। কড়াইল বস্তির স্থানীয় বাসিন্দা ও পেশায় অটোরিকশাচালক মো. শান্ত তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে সাথে নিয়ে সহায়তা পাওয়ার আশায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেও তিনি কার্ড পাননি। অথচ তাঁর সচ্ছল বাড়িওয়ালা অনায়াসে কার্ড পেয়ে যান। এমন বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে অসচ্ছল মানুষের নাম তালিকার বাইরে রেখে সচ্ছলদের কার্ড পাইয়ে দেওয়ার একটি অশুভ প্রতিযোগিতা মাঠে সক্রিয় রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বশীল সূত্রের দেওয়া তথ্যমতে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সমাজসেবা অধিদপ্তরের ‘সোশ্যাল প্রটেকশন ফর ইম্প্রুভড রেজিলিয়েন্স, ইনক্লুশন অ্যান্ড টার্গেটিং’ (এসএসপিআইআরআইটি) নামের একটি বিদ্যমান প্রকল্পের প্রথম সংশোধনী এনে এই ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) সংশ্লিষ্ট সকল খাতের ব্যয় পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা শেষে অনাবশ্যক কিছু খরচ কমিয়ে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ পাঠিয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি দ্রুত দেশের সার্বিক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার তীব্র তাগিদ থাকলেও, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মূল বার্ষিক বাজেটে এর জন্য কোনো আলাদা আর্থিক বরাদ্দ রাখা ছিল না। এর ফলে চলতি অর্থবছরেই থোক বরাদ্দ খাত থেকে জরুরি ভিত্তিতে ১ হাজার ৫১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা হস্তান্তরের প্রশাসনিক তদারকি শুরু করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।
খাতওয়ারি আর্থিক হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রথম দফায় প্রায় ৪১ লাখ মানুষের হাতে স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড তৈরি ও বিতরণের জন্য প্রায় ৫৫০ কোটি ৮২ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে সারা দেশ থেকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সঠিক তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ৬৬ হাজার ৮১৫টি ট্যাবলয়েড পিসি এবং ৫টি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সুপার কম্পিউটার কেনা হবে, যা বাবদ সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২২১ কোটি ৩২ লাখ টাকার বেশি। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য নিয়োগ পাবে ৬০ হাজার মাঠকর্মী। ওই কর্মীদের বেতন, তথ্য এন্ট্রি, ডেটা প্রসেসিং ও ব্যবস্থাপনা বাবদ খরচ হবে প্রায় ৬৭৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এছাড়াও আটটি প্রধান বিভাগীয় শহরে সচেতনতামূলক সেমিনার করতে ৮০ লাখ টাকা, সমাজসেবা কর্মকর্তাদের তদারকি ভ্রমণ ভাতা বাবদ ৮ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন পেশাগত প্রশিক্ষণের খরচে ৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে।
মূলত ২০২৫ সালে প্রথম দফায় যখন এসএসপিআইআরআইটি প্রকল্পটি অনুমোদন পায়, তখন এর প্রাক্কলিত বাজেট ছিল ৯০৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা। পরবর্তীতে ফ্যামিলি কার্ডের মতো বিশাল জনবান্ধব কর্মসূচি আলাদা প্রকল্প হিসেবে না নিয়ে এই বিদ্যমান ফ্রেমওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করায় প্রকল্পের মোট বাজেট বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ৮১৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। পরবর্তীতে পিইসি সভার পর্যালোচনায় বিভিন্ন খাতের বাজেটে কাটছাঁট করে কেবল ফ্যামিলি কার্ড অংশের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা। প্রকল্পটির নির্বিঘ্ন পরিচালনার অজুহাতে পরামর্শক আউটসোর্সিং সেবা বৃদ্ধির পাশাপাশি অতিরিক্ত ১০টি গাড়ি (জিপ ও মাইক্রোবাস) ভাড়ায় চালনোরও রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।
নীতিমালা অনুসরণের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সরকারি দিকনির্দেশনায় ভূমিহীন, প্রান্তিক কৃষক, গৃহহীন এবং নারী প্রধান পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কঠোর নির্দেশনা ছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে রাজধানী ঢাকার তিনটি প্রধান ভাসমান এলাকাসহ বেশ কিছু ইউনিটে প্রায় ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারী প্রধান পরিবারকে এই কার্ডের সুবিধাভোগী করা হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কঠোর বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, স্থানীয় প্রশাসনিক তদারকি ও সামাজিক যাচাই পদ্ধতির তোয়াক্কা না করায় কার্ড বিতরণে নয়ছয় হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সুজন সম্পাদক বলেন, ২০০৭ সালে ইউনিয়ন পরিষদ আইনের আওতায় ‘ওয়ার্ড সভা’ ডাকার স্পষ্ট আইনি অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছিল। স্বচ্ছতার সাথে প্রকাশ্য বৈঠকে সবার সামনে দরিদ্রদের তালিকা প্রস্তুত করার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বারবার এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। ফলে প্রকৃত অসচ্ছল মানুষের নাম বাদ পড়ছে এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের লোকেরাই সরকারি এই সমাজকল্যাণমূলক সুযোগ বাগিয়ে নিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: টাইমস অফ বাংলাদেশ