ঢাকার অন্যতম প্রধান দুই শিল্প কেন্দ্র সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চলে গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে পোশাক ও চামড়াসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত চাপ ও চাহিদানুযায়ী সরকারি গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় কারখানাগুলোকে তাদের ভারী যন্ত্রপাতি, বয়লার ও বিদ্যুৎ উৎপাদক জেনারেটর চালু রাখতে অতিরিক্ত মূল্যের ডিজেল, সিএনজি ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ওপর সরাসরি ভরসা করতে হচ্ছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে একদিকে যেমন শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থা ধসে অর্ধেকের নিচে নেমে আসছে, তেমনি অন্যদিকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে সামগ্রিক পণ্য উৎপাদন ব্যয় লাফিয়ে বাড়ছে। শিল্প মালিকরা বলছেন, চাহিদা ও চাপের এই ধারাবাহিক ঘাটতি অব্যাহত থাকলে সাভারের শিল্পাঞ্চলে অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির সাভার ও আশুলিয়া জোনাল অফিসের আনুষ্ঠানিক উপাত্ত অনুযায়ী, এই শিল্প জোনের প্রায় ৭০৭টি তালিকাভুক্ত কারখানা এবং স্থানীয় বাণিজ্যিক ও আবাসিক খাতে দৈনিক গ্যাসের ন্যূনতম চাহিদা অন্তত ২৮ কোটি ঘনফুট। অথচ বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রায় এক সপ্তাহ আগে এই অঞ্চলে সার্বিক গ্যাসের লাইন সরবরাহ ভয়াবহ রূপ নিয়ে দৈনিক মাত্র ১০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছিল। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কিছুটা উন্নতি হয়ে তা দৈনিক ১৩ থেকে ১৫ কোটি ঘনফুটে পৌঁছালেও তা চাহিদার তুলনায় অর্ধেকের চেয়েও কম। তিতাসের জোনাল অফিসের কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, মূল উৎস থেকেই পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় কারখানাগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা বা কাঙ্ক্ষিত চাপ ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
গ্যাসের এই আশঙ্কাজনক চাপ হ্রাসের ধাক্কা সরাসরি লেগেছে সাভারের বৃহৎ পোশাক ও ডাইং কারখানাগুলোতে। উদাহরণস্বরূপ, স্থানীয় পাকিজা ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং ইন্ডাস্ট্রিজে স্বাভাবিকভাবে কাজ চালানোর জন্য অন্তত ৫ পিএসআই প্রেসার প্রয়োজন হলেও তা কমে ১ থেকে ২ পিএসআই-এ নেমেছে। বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের ফলে ওই কারখানার উৎপাদন খরচ প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। আগের স্বাভাবিক সময়ে যেখানে প্রতিষ্ঠানটিতে দৈনিক প্রায় দুই লাখ গজ কাপড় উৎপাদিত হতো, তা এখন কমে মাত্র এক লাখে এসে ঠেকেছে। একইভাবে ওলাইল এলাকার অন্যতম শীর্ষ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক আল-মুসলিম গ্রুপেও প্রয়োজনীয় ২০ পিএসআই প্রেসারের বিপরীতে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে ৪ থেকে ৬ পিএসআই-এর নিচে, যার খেসারত গুণতে হচ্ছে বিকল্প জ্বালানির চড়া ব্যয় বহনের মাধ্যমে।
শুধু পোশাক খাতই নয়, গ্যাসের এ সংকটে ভয়াবহ বিপদে পড়েছে সাভারের চামড়াশিল্প নগরীও। শিল্প নগরীর প্রায় ১৪৫টি ট্যানারি কারখানার মধ্যে অর্ধেকেরই সংযোগে বর্তমানে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না এবং বাকি অর্ধেক কারখানা চাহিদার মাত্র ৫০ শতাংশ গ্যাস পাচ্ছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সূত্রমতে, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গ্যাসের চাপ না থাকায় আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। তিতাস কর্তৃপক্ষ ওই এলাকায় বর্তমানে ২ থেকে ৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করলেও তা মোট চাহিদার বিপরীতে একেবারেই অপ্রতুল।
গ্যাস সংকটের এই বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব এখন কেবল কারখানা মালিক ও ব্যবসায়ীদের লোকসানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; ছড়িয়ে পড়ছে সাধারণ শ্রমিকদের কর্মসংস্থানেও। স্থানীয় গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন যে, সাভার ও আশুলিয়ার সাত শতাধিক কারখানায় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শ্রমিকদের ওভারটাইম, কাজের গতি ও সার্বিক উৎপাদনশীলতা স্থবির হয়ে পড়েছে। শিল্পোদ্যোক্তা ও বিজিএমইএ-র শীর্ষ প্রতিনিধিরা বলছেন যে, সাভার-আশুলিয়া শিল্প বলয়ে দ্রুত গ্যাসের প্রয়োজনীয় প্রেসার ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের শিল্পপণ্যের প্রতিযোগী সক্ষমতা মারাত্মক হুমকিতে পড়বে।