গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, বোর্ড, করপোরেশন এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ প্রশাসনিক পদগুলোতে রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ডের ব্যক্তিবর্গকে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হলেও, প্রজ্ঞাপনের সুনির্দিষ্ট আইনি শর্ত বাস্তবায়নে চরম গাফিলতি ও শিথিলতার চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। সম্প্রতি সরকারের তরফ থেকে অন্তত ১৭ জন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ১১টি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও ৮টি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সর্বোচ্চ পদে বসানো হয়েছে। নিয়োগের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জারি করা প্রতিটি দাপ্তরিক প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, সরকারি বা আধা-সরকারি সংস্থা ছাড়াও অন্য কোনো পেশা, ব্যবসা কিংবা রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে যেকোনো ধরণের সাংগঠনিক বা কর্ম-সম্পর্ক যোগদানের পূর্বেই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, সরকারের দেওয়া সেই অপরিহার্য প্রশাসনিক ও আইনি শর্ত পুরোপুরি উপেক্ষা করে কোনো ধরণের পদত্যাগ ছাড়াই স্ব স্ব পদে বহাল রয়েছেন নিয়োগপ্রাপ্ত নেতারা।
আইনি ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের বর্তমান প্রধান নির্বাহী পদে নিয়োগ লাভ করেছেন রাজনৈতিক দল বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বরত নেতা মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। অতিরিক্ত সচিবের (গ্রেড-২) মর্যাদা সম্বলিত এই পদটিতে গত ২৩ জুলাই এক বছরের জন্য তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তিনি আজ পর্যন্ত দলটির পরিবেশবিষয়ক সম্পাদকের কার্যালয় বা পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেননি। দাপ্তরিক প্রজ্ঞাপনের শর্তভঙ্গের কারণ হিসেবে তাঁর ভাষ্য, সুদীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রাম ও ত্যাগের পর এই ধরনের পদাভিষেক তাঁর প্রাপ্য এবং আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের বিষয়টি নিছক একটি প্রথাগত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ামাত্র, যা পরবর্তীতে সম্পন্ন করা হবে। যদিও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় কিংবা প্রশাসনিক দপ্তর থেকে এ ধরনের কোনো পদত্যাগপত্র পেশ কিংবা গ্রহণের আনুষ্ঠানিক নথিপত্র এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করা হয়নি।
কেবল বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনই নয়, দেশের চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনসহ অন্তত ১১টি অতিগুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের নীতি-নির্ধারণী চেয়ারে যাদের বসানো হয়েছে, তাদের একটি বড় অংশই নিজ নিজ রাজনৈতিক দল বা অঙ্গসংগঠনের সাংগঠনিক পদের পদে বহাল রয়েছেন। চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে আসা শামসুজ্জামান সহ একাধিক কর্মকর্তা দলীয় সিদ্ধান্ত ও সরকারি নির্দেশনার নানা ব্যাখ্যা দিয়ে পদ সামলাচ্ছেন। কিন্তু সরকারি বিধি ও প্রজ্ঞাপনের ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার সর্বোচ্চ নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নেন, তবে তাঁকে কোনো রাজনৈতিক ভাবমূর্তি বা রাজনৈতিক দলের দলীয় পরিচয় সাথে নিয়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক পদের ওপর ভর করে সরকারি চেয়ারে বসার এই প্রবণতা দেশের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাকে ব্যাহত করছে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিচ্ছেন।
অপরদিকে, নগর উন্নয়ন ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করতে দেশের আটটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সর্বোচ্চ পদে যে আটজন চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে অন্তত সাতজনই সরাসরি রাজনৈতিক দলটির সাথে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে কেবল কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে একজন পেশাদার ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি প্রকৌশলীকে রাখা হলেও খুলনা, সিলেট, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের শীর্ষে রয়েছেন দলটির বিভিন্ন মহানগর ও জেলা শাখার সভাপতি, আহ্বায়ক কিংবা যুগ্ম আহ্বায়ক পর্যায়ের নীতি-নির্ধারকেরা। যেমন—খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান কর্মকর্তা খুলনা মহানগর শাখার শীর্ষ পদ সামলাচ্ছেন, অন্যদিকে সিলেট ও কুমিল্লার প্রধানরাও নিজ নিজ মহানগর শাখার প্রশাসনিক শীর্ষ পদে আসীন রয়েছেন। একইভাবে রংপুর ও ময়মনসিংহের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও উত্তর ও দক্ষিণ জেলা এবং মহানগর শাখার নেতৃত্বে রয়েছেন, যাদের প্রজ্ঞাপনেও প্রথাগত নিয়ম অনুসারে অন্যান্য সংগঠনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া ছিল।
এই প্রাতিষ্ঠানিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও আইনি ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত রাজনৈতিক নেতাদের একটি অংশ দাবি করছেন যে, নিয়োগপত্রের ‘সংগঠন’ শব্দটি দিয়ে মূলত ব্যবসায়ী সমিতি, ক্লাব বা অলাভজনক সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে বোঝানো হয়েছে এবং রাজনৈতিক দল এর অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে এই ব্যাখ্যাটি আইনি এবং সরকারি চাকরির আচরণবিধির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার ২৫ নম্বর ধারায় সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে যে, প্রজাতন্ত্রের কোনো সরকারি কর্মচারী বা পদে আসীন ব্যক্তি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারবেন না কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত রাখতে পারবেন না। মন্ত্রী ও প্রশাসনিক আইনি বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, রাজনৈতিক দলও আইনের দৃষ্টিতে একটি ‘সংগঠন’, তাই সরকারি কোনো পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার পর দলীয় পদের মায়া ত্যাগ না করা সরাসরি চুক্তি ভঙ্গের শামিল।
এ সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায় ও রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, নীতিগতভাবে যদি ‘সংগঠন’ বলতে রাজনৈতিক দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করা হয়, তবে নিয়োগপ্রাপ্ত সব কর্মকর্তা নিয়ম মেনেই দলীয় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেবেন বা পদত্যাগ করবেন। অতীতে ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের শাসনকালেও দলীয় নেতাদের গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ নানা সংস্থায় বসিয়ে দলীয় পদ ধরে রাখার যে খারাপ নজির তৈরি হয়েছিল, বর্তমান মেয়াদেও সেই একই ধারার পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলে মনে করছেন সাধারণ নাগরিক ও সুশীল সমাজ। সাবেক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা বোর্ডগুলোর প্রধানের পদ কোনো গণপ্রতিনিধিত্বশীল রাজনীতিবিদের নিজস্ব দপ্তর নয়; এগুলো সম্পূর্ণ সরকারি প্রশাসনিক আসন। তাই প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সুশাসন বজায় রাখার স্বার্থে এই পদগুলোতে আসীন হওয়ার আগেই দলীয় রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি।