দেশের স্থানীয় সরকার কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে বিবেচিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌশলগত জটিলতা তীব্র হয়ে উঠেছে। জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তনের পর এই নগর সংস্থায় ক্ষমতার ভরকেন্দ্র কার দিকে ঝুঁকবে, তা নিয়ে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ভোটের মাঠে চলছে নানা পর্যালোচনা। একদিকে আইনি প্রক্রিয়ার স্বীকৃতি ও মাঠপর্যায়ের জনসমর্থন, অন্যদিকে প্রবীণ নেতৃত্বের দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ—এই দ্বৈত অবস্থানের কারণে দলের প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে তৈরি হয়েছে তুমুল আলোচনা।
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তরুণ রাজনীতিক ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে পুরান ঢাকাসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় তাঁর একটি বিস্তৃত সামাজিক ও পারিবারিক ভিত্তি রয়েছে। বিগত জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং সরকারের দায়িত্বে অংশগ্রহণের কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর দৃশ্যমান উপস্থিতি তৈরি হয়। পাশাপাশি বিগত ২০২০ সালের সিটি নির্বাচনের ফলাফল সংক্রান্ত জটিলতায় নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের রায় এবং পরবর্তীতে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় তাঁর অবস্থান নিয়ে কর্মীদের মধ্যে তৈরি হওয়া আবেগ ভোটের মাঠে একটি বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে।
অন্যদিকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক এবং বর্তমান নগর প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা অভিজ্ঞ রাজনীতিক আব্দুস সালামের অবস্থানও সাংগঠনিক দিক থেকে বেশ সুসংহত। নগরীর ২৪টি থানা ও ৮২টি ওয়ার্ডের তৃণমূল কমিটির ওপর তাঁর দীর্ঘদিনের প্রভাব ও সাংগঠনিক যোগাযোগ রয়েছে। দলের একটি অংশের মতে, নির্বাচনের মাঠ পরিচালনা এবং নগর ভবনের মতো বিশাল প্রশাসনিক কাঠামো সামলানোর জন্য অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত নেতৃত্বের প্রয়োজন। ফলে মাঠের জনপ্রিয়তা এবং সাংগঠনিক কাঠামোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যকার এই ভারসাম্য রক্ষা করা দলটির নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে ঢাকা দক্ষিণের নির্বাচনী মাঠ কেবল একটি দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও নতুন প্ল্যাটফর্মগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে এখানে বহুমাত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ডাকসুর সাবেক ভিপি সাদিক কায়েম এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার মতো তরুণ নেতৃত্বকে সামনে এনে প্রচার চালানো হচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রজন্মের ভোট এবং তরুণ ভোটারদের মনস্তত্ত্ব এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
পুরান ঢাকা, ওয়ারী, সূত্রাপুর বা কোতোয়ালির মতো ঐতিহ্যবাহী এলাকাগুলোর স্থানীয় ভোটার নেটওয়ার্কের পাশাপাশি প্রায় ২৫ লাখ ভোটারের এই বিশাল নির্বাচনী এলাকায় শ্রমজীবী ও তরুণ জনগোষ্ঠীর মনোভাব বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে। নির্বাচনের প্রার্থী চূড়ান্ত করার পর বিজয়ী নেতৃত্বের মূল চ্যালেঞ্জ কেবল রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখা নয়, বরং যানজট, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা ও নাগরিক সেবার সংকটে জর্জরিত দক্ষিণ ঢাকাকে একটি কার্যকর ও আধুনিক বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তর করা।