• শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৫০ পূর্বাহ্ন

পৌর চেয়ারম্যান থেকে রাষ্ট্রপতি- মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবন

Reporter Name / ২ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬

প্রায় ৩৫ বছর পর সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হলেন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। এ নির্বাচনে ২৫৫টি ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন ক্ষমতাসীন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির মহাসচিব ও সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন।

তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে ছিলেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি বা এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমদ। তিনি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শাসনের সময় দলটির মনোনয়নে নির্বাচিত ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার মেয়াদের দেড় বছরের মতো সময় বাকি থাকতেই পদত্যাগ করেন গত ২৪ জুলাই।

চলতি মাসের শুরুতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলে বিএনপির পক্ষ থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়া হয়।

আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণের পর আগামী পাঁচ বছরের জন্য বঙ্গভবনের বাসিন্দা হচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তৃণমূল থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসতে বিএনপির কঠিন সময়ে দলকে নেতৃত্ব দেয়া এবং ‘ক্লিন ইমেজে’র রাজনীতিক বলে পরিচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ এক পথ।

ছাত্রজীবনে ছাত্র রাজনীতি, সেখান থেকে শিক্ষকতা, সে পেশা ছেড়ে ফের রাজনীতির মাঠ। রাজনীতিতে নেমেই নির্বাচিত হয়েছিলেন ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান।

খালেদা জিয়া কারাবন্দী ও তারেক রহমানের নির্বাসিত অবস্থায় মামলা-নির্যাতনে যখন বিএনপি অনেকটা টালমাটাল অবস্থায় ছিল তখন দেশের ভেতর দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।

দলের রাজনীতিতে তার দায়িত্বশীল ভূমিকা আর পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে বিশেষ কৃতিত্বই তাকে রাষ্ট্রপতির পদের জন্য যোগ্য করে তুলেছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, খালেদা জিয়ার যখন কারা অন্তরীণ, রাজনীতিতে বেশ টালমাটাল অবস্থায় বিএনপি, তখন মির্জা ফখরুলের দৃঢ় অবস্থান আমরা দেখেছি। বারবার গ্রেফতার হয়েছেন, লাঞ্ছিত হয়েছেন, তারপরও তিনি মাটি কামড়ে পড়েছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ১৯৬০ এর দশকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হন তিনি। তাকে সে সময় কারাগারেও যেতে হয়েছিল।

শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দেন। এরপর বিভিন্ন কলেজের শিক্ষকতা করেন তিনি। পরে তিনি ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে সে সময়ের উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর পিএস পদে যোগ দেন।

কয়েক বছর পর ১৯৮৬ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন মির্জা ফখরুল।

দুই বছরের মাথায় ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন তিনি।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময়ে ১৯৯০ সালে তিনি যোগ দেন বিএনপিতে। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি এবং পরে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য হন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শামছুল আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সদালপী, বিনয়ী এবং পরিশ্রমী হিসেবে পরিচিত ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। নিঃস্বার্থ একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি সকলের কাছে সমাদৃত।

১৯৯১ সালে তিনি বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচন করেন। তবে সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার জয়ের দেখা পান নি তিনি। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি।

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

ওই বছরই চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় মির্জা ফখরুল প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এরপর মন্ত্রীসভায় পরিবর্তন আনা হলে তিনি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান এবং ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি ওই পদেই বহাল ছিলেন।

বিএনপির নেতৃত্বে আসার আগে আগে মির্জা ফখরুল জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন দীর্ঘদিন।

গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, মেয়র, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী- সবই ছিলেন তিনি। দায়িত্ব পালনের সময় আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের অনেক ধরনের নেতিবাচক ইমেজ তৈরি হয়, তবে মির্জা ফখরুল এসব অভিযোগ থেকে মুক্ত ছিলেন।

২০০৬ সাল থেকে ২০২৪ সাল – এ সময়কালে রাজনীতিতে কঠিন একটা সময় পার করেছে বিএনপি। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব আটক ও কারাবরণ, কখনো দল ভাঙনের মুখে পড়েছে।

আওয়ামী লীগের শাসনামলের প্রায় পুরোটা সময় বিএনপি রাজনীতিতে অনেকটাই কোণঠাসা অবস্থানে ছিল। চ্যালেঞ্জিং সেই সময়ে দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন মির্জা ফখরুল।

সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবি হয় বিএনপির। সে নির্বাচনে সংসদ সদস্য পদে দলীয় মনোনয়ন পেলেও জিততে পারেননি তিনি।

এরপর ২০০৯ সালের জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন মির্জা ফখরুল।

মাত্র দুই বছরের মাথায় ২০১১ সালে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা যান। তার মৃত্যুর পর মির্জা ফখরুলকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন খালেদা জিয়া। ওই বছরই আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়।

দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের প্রতিবাদে ২০১৪ সালের পাঁচই জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি। আন্দোলনে নামে বিএনপি।

বিএনপির সিনিয়র নেতৃত্ব গ্রেপ্তা‌র, মামলা ও দমন-পীড়নের মুখে পড়ে। এর প্রায় দুই বছর পর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির পুর্নাঙ্গ মহাসচিব হন মির্জা ফখরুল।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারারুদ্ধ হন। ওই বছরের শেষে অনু্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক ও নানা মামলা জটিলতায় পড়ে বিএনপি। একদিকে খালেদা জিয়ার বন্দিজীবন, অন্যদিকে দলটির তৎকালীন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান তখন লন্ডনে নির্বাসিত। সেই কঠিন সময়ে দেশের ভেতরে দলকে নেতৃত্ব দেন মির্জা ফখরুল।

গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছিলেন, এত ঝড় ঝাপ্টার মধ্যেও বিএনপিকে ভাঙা যায়নি, কারণ তখন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতো একজন মহাসচিব ছিলেন যিনি দেশের ভেতরে থেকে দলটাকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

দেশের ভেতর দলের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে কয়েক দফায় কারাগারে যেতে হয়েছে তাকে বিভিন্ন মামলায়। বিভিন্ন সময় হামলা ও নির্যাতনের মুখেও পড়েন তিনি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কথার লড়াই ছিল সব সময়ই। সভা সমাবেশে বক্তৃতা দিতে গিয়ে একে অপরকে আক্রমনাত্নক ভাষার ব্যবহারও চলে হরহামেশাই। কিন্তু এদিক দিয়ে অনেকটাই ব্যতিক্রম মির্জা ফখরুল।

অধ্যাপক শামছুল আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, তার রাজনীতির যে বৈশিষ্ট্য আমরা লক্ষ করেছি, তা ছিল অত্যন্ত নম্র, বিনয়ী এবং সদালাপী উনি। অন্য দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি কখনো কটূক্তি করতেন না। সবাইকে সম্মান দিয়ে কথা বলতেন এবং শ্রদ্ধার সাথে দেখতেন।

যে কারণে শুধু বিএনপিতেই না, অন্যান্য রাজনৈতিক দল কিংবা সাধারণ মানুষের কাছেও মির্জা ফখরুলের অন্য ধরনের সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি গড়ে উঠেছে।

মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রপতি পদটি একটা সম্মানজনক পদ। এ পদটি মির্জা ফখরুলের প্রাপ্যই ছিল। আমরা চাইবো তিনি যেন দলীয় দৃষ্টির বাইরে এসে রাষ্ট্রের অভিভাবক হয়ে উঠতে পারেন।

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন পেশায় একজন আইনজীবী। মা মির্জা ফাতেমা আমিন ছিলেন গৃহিনী।

তাঁর বাবা দুইবার পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। তিনি এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যও ছিলেন।

ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে মির্জা ফখরুল ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। সেখান থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

মির্জা ফখরুলের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তিনি চাকরি করেন। এই দম্পতির দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ।

বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে সেখানেই শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে এখন একটি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।

মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিনও বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত। তিনি বর্তমানে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি। বড় ভাই মির্জা ফখরুলের মতো তিনিও ছিলেন ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র।

ছাত্রজীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নাট্যমঞ্চে অভিনয় করেছেন। এছাড়া আবৃত্তিসহ নানা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশ নিতেন।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category