• মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১১:১০ পূর্বাহ্ন
Headline
দেশীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস: বছরে ১৭ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ আমদানি ভারত থেকে উৎপাদন বিপর্যয় ও রফতানি বাণিজ্যে অশনিসংকেত: জ্বালানি সংকটে স্থবির শিল্প খাত আকাশপথে ‘জিম্মি’ রাজশাহী-ঢাকা রুটের যাত্রীরা সহযোদ্ধা থেকে প্রতিপক্ষ: ক্যাম্পাসে আধিপত্যের নতুন দ্বন্দ্বে ছাত্রদল ও শিবির বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ১০ দেশের মন্ত্রিসভার আকার কেমন দুবাইয়ে দুই রোবটের ‘বিয়ে’, সামাজিক মাধ্যমে চাঞ্চল্য নুসরাত হত্যা মামলায় দুজনের ফাঁসি, চারজনের যাবজ্জীবন বিরোধী দলের পাশাপাশি সরকারকেও দায়িত্বশীল হতে হবে: জামায়াত আমির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় ক্লাবে পরিণত করেছে বিএনপি দেশে বেকার টাই-পরা লোকের সংখ্যা বাড়ছে: এনামুল হক

দেশীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস: বছরে ১৭ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ আমদানি ভারত থেকে

Reporter Name / ০ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬

দেশের অভ্যন্তরে জাতীয় চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও স্থানীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে নিয়মিত অলস বসিয়ে রেখে প্রতি বছর প্রতিবেশী ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানি করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্যমতে, ভারত থেকে বিদ্যুৎ কিনতে বর্তমানে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বছরে ব্যয় হচ্ছে ১৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হতে যাচ্ছে ‘সেটেলমেন্ট নোডাল এজেন্সি’ বা এসএনএ চার্জের অতিরিক্ত আর্থিক দায়। ফলে একদিকে অলস দেশীয় কেন্দ্রগুলোর জন্য প্রতি বছর প্রায় অর্ধ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্র ভাড়া গুনতে হচ্ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রায় চড়া মূল্যে প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ খাত এক তীব্র দ্বিমুখী সংকটের মুখে পড়েছে।
বিগত সরকারের সময়ে প্রাথমিক জ্বালানির টেকসই সরবরাহ নিশ্চিত না করেই বিতর্কিত বিশেষ দায়মুক্তি আইনের সুযোগ নিয়ে একের পর এক বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। দেশে গড় চাহিদার তুলনায় সক্ষমতা অস্বাভাবিক বাড়িয়ে ফেলা হলেও গ্যাস ও কয়লার তীব্র ঘাটতির কারণে নিজস্ব কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয়নি। অথচ চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক, কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখার শর্তে বিপুল অঙ্কের অর্থ কেন্দ্র ভাড়া হিসেবে নিয়মিত পরিশোধ করতে হচ্ছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের হিসাব মতে, বিদ্যুৎ খাতে কেবল এই অলস ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদই প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা গচ্ছা যাচ্ছে। এমন চরম অপচয়মূলক কাঠামোর মধ্যেই স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থার সংস্কার না করে ভারত থেকে মোট ২ হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ আমদানির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বলবৎ রাখা হয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের চারটি প্রধান উৎস থেকে বাংলাদেশ প্রায় ১ হাজার ৬৪১ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ আমদানি করেছে। এই তালিকায় রয়েছে ভারতের আদানি পাওয়ারের ঝাড়খণ্ড কেন্দ্র, এনটিপিসি বিদ্যুৎ ব্যাপার নিগম লিমিটেড (এনভিভিএন), পিটিসি ইন্ডিয়া এবং সেম্বকর্প এনার্জি ইন্ডিয়া। এই বিপুল আমদানির বিপরীতে শুধু বিদ্যুতের মূল মূল্য বাবদ বাংলাদেশকে গুনতে হয়েছে ১৬ হাজার ৯৯৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ চলে গেছে বিতর্কিত আদানি পাওয়ারের পকেটে, যাদের কাছ থেকে প্রায় ৮০৩ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে ব্যয় হয়েছে ১১ হাজার ৯৩৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এছাড়া এনভিভিএন-এর জন্য ৩ হাজার ৪৫৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা, পিটিসি ইন্ডিয়ার জন্য ১ হাজার ৬৫১ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং সেম্বকর্পের জন্য ১ হাজার ৯৫৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। এর পাশাপাশি এনভিভিএন-এর বিদ্যুতের জন্য সঞ্চালন বা হুইলিং চার্জ বাবদ আরও ২১১ কোটি ৭১ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। সব মিলিয়ে চার উৎস থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের পেছনে এক বছরেই দেশের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১১ কোটি ৪৬ লাখ টাকায়।
এই পর্বতপ্রমাণ ব্যয়ের ওপর এখন নতুন করে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসছে ‘সেটেলমেন্ট নোডাল এজেন্সি’ বা এসএনএ চার্জ। আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের দৈনিক সময়সূচি তৈরি, মিটারিং থেকে ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ, সরবরাহ ও ব্যবহারের হিসাব মেলানো এবং গ্রিড পরিচালনার প্রশাসনিক ব্যয় মেটানোর নামে ভারতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই মাশুল আরোপ করেছে। শুরুতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ইউনিট প্রতি ০.০১ রুপি দাবি করলেও পরবর্তীতে বিপিডিবির আবেদনের প্রেক্ষিতে তা কমিয়ে ০.০০৫ ভারতীয় রুপি নির্ধারণ করা হয়। প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় এনভিভিএন-এর মাধ্যমে আসা ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ওপর এই চার্জ প্রযোজ্য হবে। যদি এই বিদ্যুৎ পূর্ণ সক্ষমতায় আমদানি করা হয়, তবে প্রতি ঘণ্টায় দিতে হবে প্রায় ৫ হাজার ৮০০ রুপি এবং দৈনিক ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার ২০০ রুপি। সে হিসাবে বছরে ভারতীয় মুদ্রায় ৫ কোটি টাকার বেশি বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭ কোটি টাকার বাড়তি মাশুল যুক্ত হবে। আদানির ক্ষেত্রে মূল চুক্তিতেই বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যয় অন্তর্ভুক্ত থাকায় নতুন করে চুক্তি না লাগলেও এনভিভিএন-এর সঙ্গে দ্রুত চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে।
দৃশ্যত ইউনিট প্রতি ০.০০৫ রুপি চার্জ খুব বড় অঙ্ক মনে না হলেও, যখন শত শত কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ বছরের পর বছর ধরে আমদানি করা হবে, তখন দীর্ঘমেয়াদে তা জাতীয় কোষাগারে এক বিশাল আর্থিক বোঝা সৃষ্টি করবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের নিজস্ব বিদ্যুৎ অবকাঠামোকে অকার্যকর রেখে বিদেশের ওপর কৌশলগত জ্বালানিনির্ভরতা বাড়ানো কোনোভাবেই একটি স্বাধীন অর্থনীতির জন্য টেকসই পরিকল্পনা হতে পারে না। ডলার সংকট ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের এই সময়ে চড়া মূল্যে বিদ্যুৎ আমদানি এবং তার ওপর একের পর এক নতুন মাশুল চাপিয়ে দেওয়া দেশের ভোক্তাদের ওপর বাড়তি বিদ্যুতের দামের চাপ তৈরি করবে। তাই ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা কমানোর লক্ষ্যে চুক্তিগুলো দ্রুত পুনর্বিবেচনা করা, দেশীয় গ্যাস ও কয়লা উত্তোলন বৃদ্ধি করে নিজস্ব কেন্দ্রগুলো চালু করা এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানিনির্ভরতা হ্রাস করাই বিদ্যুৎ খাতকে আর্থিক দেউলিয়াত্ব থেকে রক্ষার একমাত্র উপায়।

 

 

তথ্যসূত্র: নয়দিগন্ত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category