উচ্চশিক্ষার স্বপ্নে বিভোর হয়ে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মেধাবী তরুণ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন| তবে সম্ভাবনাময় এই বিদেশযাত্রার আড়ালে গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর প্রতারণার জাল| বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে ব্যাংকে পর্যাপ্ত আমানত বা সলভেন্সি সার্টিফিকেট দেখাতে গিয়ে বহু শিক্ষার্থী দ্বারস্থ হচ্ছেন সংঘবদ্ধ চক্রের| ব্যাংকে বিপুল অঙ্কের অলীক আমানত দেখিয়ে কাগুজে সচ্ছলতার সনদ বিক্রির এই রমরমা কারবারে জড়িয়ে পড়েছেন কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এবং শিক্ষা পরামর্শক বা কনসালট্যান্সি ফার্মগুলো| দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে ব্যাংকে কোনো প্রকৃত অর্থ জমা না থাকা সত্ত্বেও তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে ৪০ থেকে ৬০ লাখ টাকার জাল স্টেটমেন্ট| এই প্রাতিষ্ঠানিক অনৈতিকতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে; বাংলাদেশি পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি পশ্চিমা দেশগুলোর দূতাবাসগুলোতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে সাধারণ ভিসা আবেদনকারীদের প্রত্যাখ্যানের হার|
শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে এই অনিয়মের গভীরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে| অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের মতো শীর্ষস্থানীয় গন্তব্যে উচ্চশিক্ষায় যাওয়া একাধিক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে কোটি বা অর্ধকোটি টাকার স্থায়ী আমানত দেখানো কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না| এই সুযোগে বিভিন্ন কনসালট্যান্সি ফার্মের মধ্যস্থতায় নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকে নামমাত্র অর্থ জমা রেখে কিংবা কোনো অর্থ জমা না দিয়েই মোটা অঙ্কের ‘সার্ভিস ফি’ দিয়ে সলভেন্সি সার্টিফিকেট কেনা হয়েছে| অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীকে ব্যাংকের দরজায়ও যেতে হয়নি, ভিসা প্রসেসিং এজেন্সির মাধ্যমেই মিলেছে এই নথিপত্র| অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে ঋণ বিতরণের স্বাভাবিক গতি স্থবির থাকায় কিছু ব্যাংকের শীর্ষ কার্যালয় ও শাখা ব্যবস্থাপকরা স্টুডেন্ট ফাইল খোলা এবং অর্থের বিনিময়ে সনদ দেওয়াকে ‘কাঁচা টাকা আয়ের’ স্থায়ী উৎসে পরিণত করেছেন|
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই জালিয়াতি প্রকাশ্যে আসায় ঢাকায় নিযুক্ত পশ্চিমা দেশগুলোর দূতাবাসগুলোতে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে| যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ ১৩টি ইউরোপীয় ও পশ্চিমা মিশন যৌথভাবে জাল নথিপত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে| সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাতে ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক সরাসরি ভিসা আবেদনে ভুয়া ব্যাংক বিবরণী জমার বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রতিকার দাবি করেন| এর পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ভিসা প্রক্রিয়ার সব ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সার্টিফিকেটে অনলাইন যাচাইযোগ্য কিউআর কোড যুক্ত করার বাধ্যতামূলক নির্দেশনা জারি করা হলেও বাস্তবে অনিয়ম থামেনি| বরং ব্যাংকার ও দালালদের যোগসাজশে উদ্ভাবিত হয়েছে আরও চতুর কৌশল| শিক্ষার্থী বা অভিভাবকের নামে কৃত্রিম ঋণ তৈরি করে সেই অর্থকেই আবার চক্রাকারে আমানত দেখিয়ে ব্যাংকের নিজস্ব কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার বা সিবিএস থেকেই আপাতদৃষ্টিতে ‘বৈধ’ সলভেন্সি সার্টিফিকেট তৈরি করা হচ্ছে, যা মূলত এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক জালিয়াতি|
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই অনৈতিক ব্যবসা আজ আর গোপনে চলছে না, বরং প্রকাশ্য বিজ্ঞাপনে তা ছড়িয়ে পড়েছে| ফেসবুকে একাধিক পেজ ও গ্রুপের মাধ্যমে ‘ফান্ড সাপোর্ট’ বা জরুরি সলভেন্সি জোগাড়ের নিশ্চয়তা দিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভিজিটিং কার্ড আদান-প্রদান করা হচ্ছে| এ বিষয়ে শিক্ষা ও ক্যারিয়ার কনসালট্যান্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এফএসিডি-সিএবি) পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, প্রতিবেশী দেশগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় স্বল্পসুদে ব্যাংক ঋণ ও সচ্ছলতা প্রমাণের রাষ্ট্রীয় কাঠামো রয়েছে, যা বাংলাদেশে অনুপস্থিত| ফলে অনেক সাধারণ শিক্ষার্থী উপায়ান্তর না দেখে অনৈতিক পথের শিকার হচ্ছেন| তবে অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা স্বীকার করেন, ব্যাংকারদের সরাসরি মদদ ছাড়া কোনো কনসালট্যান্সি ফার্মের পক্ষে এই ধরনের আনুষ্ঠানিক জাল সনদ তৈরি করা সম্ভব নয়|
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এই প্রবণতাকে ফৌজদারি অপরাধ ও ব্যাংকিং নীতিমালার চূড়ান্ত ব্যত্যয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন| ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিনও এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে আর্থিক খাতের বিশ্বাসযোগ্যতার চরম অপব্যবহার বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন| তাঁর মতে, কেবল কিউআর কোড বসিয়ে এই বহুমাত্রিক জালিয়াতি ঠেকানো অসম্ভব; এর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে একটি একক ডিজিটাল ভেরিফিকেশন গেটওয়ে গড়ে তোলা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে যেকোনো দূতাবাস রিয়েল-টাইমে তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারবে|
আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালেই বাংলাদেশ থেকে অর্ধলক্ষাধিক শিক্ষার্থী ৫৫টি দেশে গেছেন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই খাতে শিক্ষার্থীদের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮৯ কোটি ডলার, যা দেশের ৫৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট সরকারি বরাদ্দের সমপরিমাণ| এত বিশাল ব্যয়ের এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি যখন কিছু লোভী ব্যক্তি ও দুর্বল সুশাসনের ব্যাংকের কারণে কলঙ্কিত হচ্ছে, তখন তার চরম খেসারত দিতে হচ্ছে সৎ ও প্রকৃত মেধাবীদের| বিভিন্ন দূতাবাস এখন নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকের আর্থিক নথি সরাসরি কালো তালিকাভুক্ত করছে এবং নথির সত্যতা নিয়ে সন্দেহের জেরে ঢালাওভাবে ভিসা বাতিল করছে| পাসপোর্ট সূচকে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে ৯৭তম অবস্থানে নেমে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য এই অনৈতিক সনদ বাণিজ্য নতুন করে কূটনৈতিক ও বৈশ্বিক মর্যাদার সংকট তৈরি করছে| অবিলম্বে অর্থলিপ্সু ব্যাংক কর্মকর্তা ও মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়বে|
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা