মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পারদ যখন চরম সীমায় এবং লোহিত সাগরে রণহুঙ্কার যখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মেরুদণ্ডে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে, তখন ইসলামাদের কূটনৈতিক নীতি এক অভূতপূর্ব পরীক্ষার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে| ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের একযোগে চালানো বিধ্বংসী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরবের চারটি শহর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যকার ছায়াযুদ্ধকে এক উন্মুক্ত সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে| এমন এক সংকটময় মুহূর্তে সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির বাধ্যবাধকতা রক্ষা করা, নাকি ভৌগোলিকভাবে সংলগ্ন প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে গড়ে ওঠা গভীর সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক অটুট রাখা—এই দুই চরম বৈপরীত্যের ফাঁদে পড়েছে পাকিস্তান| সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া এড়াতে ইসলামাবাদ এখন তার চিরচেনা ‘নীরব কূটনীতি’ ও মধ্যস্থতাকারীর রূপরেখা নিয়ে মাঠে নেমেছে, যার কেন্দ্রে রয়েছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির|
সংকটের সূত্রপাত ঘটে সম্প্রতি যখন সৌদি আরবের চারটি প্রধান শহরে হুতিরা ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়| এতে অন্তত ৭৩ জন আহত হন এবং দেশটির একাধিক তেল শোধনাগারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ে| এই ধ্বংসাত্মক আঘাতের পর সতর্কতামূলক জরুরি ব্যবস্থা হিসেবে সৌদি সরকার তাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘পূর্ব-পশ্চিম কৌশলগত তেল পাইপলাইন’ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে| তবে মাঠের পরিস্থিতি সবচেয়ে দ্রুত ও নাটকীয় মোড় নেয় ইয়েমেনের রণক্ষেত্রে| হুতি যোদ্ধারা আকস্মিক অভিযানের মাধ্যমে লোহিত সাগরের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে এবং সংলগ্ন দ্বীপগুলো নিজেদের দখলে নেয়| সরকারি বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হলে বৈশ্বিক সমুদ্রবাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার বাব এল-মান্দেব প্রণালির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত অতীব সংবেদনশীল ‘মায়্যুন দ্বীপ’-এ হুতি যোদ্ধারা আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের ঘাঁটি গেড়ে বসে| ফলে পুরো লোহিত সাগর উপকূল এখন হুতিদের নিয়ন্ত্রণে| এই সামুদ্রিক করিডোর অবরুদ্ধ হওয়ার চরম আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০৭ ডলারের মাইলফলক ছাড়িয়ে গেছে| সৌদি আরবের জ্বালানি রপ্তানির জন্য দুটি প্রধান ধমনি রয়েছে—একটি হরমুজ প্রণালি, যা সরাসরি ইরানের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে; অন্যটি বাব এল-মান্দেব, যা এখন ইরানের মিত্র হুতিদের নিয়ন্ত্রণে| ফলে সৌদির বৈশ্বিক জ্বালানি রফতানি কার্যত একই সঙ্গে দুই দিক থেকে অবরুদ্ধ হওয়ার মুখোমুখি|
লোহিত সাগরের এই নাটকীয় অগ্রগতিতে তেহরানের উচ্ছ্বাস কোনো গোপন বিষয় থাকেনি| ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ সামাজিক মাধ্যমে হুতিদের এই সাফল্যকে প্রকাশ্যে স্বাগত জানিয়েছেন| দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার প্রভাবশালী উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবার হুতিদের ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর এক অপরাজেয় স্তম্ভ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, হরমুজে ইরানের সামরিক শক্তি এবং ইয়েমেনে হুতিদের অভিযান একযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের চরম কৌশলগত বিপর্যয়ে ফেলে দিয়েছে|
এই উত্তেজনার পটভূমিতে চলতি সপ্তাহের শুরুতে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এক কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়েছিলেন যে, সৌদি ভূখণ্ডে বড় ধরনের সামরিক আগ্রাসন ছড়িয়ে পড়লে দুই দেশের মধ্যকার ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ কার্যকর করা হবে| এই চুক্তির মূল ভিত্তি হলো সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার ওপর আঘাত এলে তা পাকিস্তানের নিরাপত্তা কাঠামোর প্রতি হুমকি হিসেবে বিবেচিত হবে| কিন্তু প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সামরিক বার্তার ঠিক পরপরই ভিন্ন দৃশ্যপট উন্মোচিত হয়| ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সরাসরি টেলিফোনে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে পৃথক ও সংবেদনশীল ফোনালাপ সম্পন্ন করেন| এই আলোচনার পর আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা জোরালো হয়েছে যে, পাকিস্তান রিয়াদের সুরক্ষায় সরাসরি ইয়েমেনে সেনা বা যুদ্ধবিমান পাঠানোর আত্মঘাতী পথ এড়িয়ে তেহরানের সঙ্গে গোপন অথচ কার্যকর কূটনীতির টেবিলেই সংকট নিষ্পত্তির পথ খুঁজছে|
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য জনসমক্ষে অত্যন্ত সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখছে| বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল যে, সৌদির অনুরোধে ইসলামাবাদ নাকি ইরানকে অনুরোধ জানিয়েছে হুতিদের ওপর লাগাম টানার জন্য; আবার অন্য এক খবরে বলা হয়েছিল সৌদি আরব সরাসরি পাকিস্তানে গিয়ে হুতি অবস্থানে বিমান হামলার প্রস্তাব দিয়েছে| তবে সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান এই ধরনের সব খবরকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন| যদিও তেহরানের মাধ্যমে হুতিদের বার্তা পাঠানোর বিষয়ে কোনো স্পষ্ট হাঁ বা না বলেননি তিনি| মুখপাত্র কেবল এটুকুই জানিয়েছেন যে, সমগ্র অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং পারস্পরিক নিরাপত্তার জন্য পাকিস্তান সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে কেবল সংলাপ ও কার্যকর কূটনীতির পথেই এগোবে| ইসলামাবাদের ইনস্টিটিউট অব রিজিওনাল স্টাডিজের সভাপতি ও পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব জওহর সালিমের মতে, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে মুখের ভাষার চেয়ে কী গোপন রাখা হচ্ছে তা অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ; এবং পাকিস্তানের বর্তমান ভাষা স্পষ্টতই সরাসরি সামরিক যুদ্ধ এড়িয়ে ডি-এসকেলেশন বা উত্তেজনা প্রশমনের কৌশলের দিকে ইঙ্গিত করছে|
এই নীরব কূটনৈতিক তৎপরতার মূল সূত্র গাঁথা রয়েছে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির ও তেহরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যে| গত এপ্রিল মাস থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত জেনারেল আসিম মুনির অন্তত চারবার রাষ্ট্রীয় সফরে ইরানে গেছেন| সাম্প্রতিক উত্তেজনা শুরুর পর সেই ব্যক্তিগত সামরিক কূটনীতি আরও গভীর হয়েছে| ইরানের নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, গত এক সপ্তাহে সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির মধ্যে অন্তত তিন থেকে চারবার টেলিফোনে সংবেদনশীল আলোচনা হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র দুটির আনুষ্ঠানিক খবর প্রকাশ করেছে তেহরান| বাকি ফোনালাপগুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই নথির আড়ালে রাখা হয়েছে| একই সঙ্গে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও তুর্কি প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় রেখে চলছেন| আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান এই মুহূর্তে সৌদি আরবের দেওয়া চূড়ান্ত সতর্কবার্তা ও নিরাপত্তা উদ্বেগের বার্তাটি ইরানের নীতিনির্ধারকদের কান পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর ‘ব্যাকচ্যানেল’ বা যোগাযোগ সেতু হিসেবে কাজ করছে|
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মধ্যপ্রাচ্যের এই দুই প্রভাবশালী পরাশক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে পাকিস্তানকে এর আগেও এমন কঠিন দোটানায় পড়তে হয়েছিল| এক দশক আগে, ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযানে স্থলসেনা, আধুনিক রণতরী ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করার জন্য রিয়াদ থেকে সরাসরি অনুরোধ পাঠানো হয়েছিল| কিন্তু পাকিস্তানের সংসদ দীর্ঘ বিতর্কের পর সর্বসম্মতভাবে সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল| সে সময় ইসলামাবাদ যুক্তি দিয়েছিল যে, সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ সৌদি আরব ও শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরানের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কোনো এক পক্ষে ঢলে পড়লে পাকিস্তানের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় ও সামাজিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিনষ্ট হবে| পরবর্তীতে চলতি বছরের শুরুর দিকে যখন আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছিল, তখন সৌদি আরবে সেনা পাঠানোর আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে পাকিস্তান সম্মুখ সমরে সরাসরি জড়ায়নি|
আঞ্চলিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বিপক্ষীয় মক্কা চুক্তির আওতায় রিয়াদের প্রতি পাকিস্তানের সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি থাকলেও তার অর্থ এই নয় যে কোনো হামলা হওয়ামাত্রই পাকিস্তান স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরাসরি আঞ্চলিক কোনো যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে| ইরানে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি এবং জওহর সালিম একমত পোষণ করে জানিয়েছেন যে, সৌদির সম্মুখ যুদ্ধের ময়দানে পাকিস্তানি পদাতিক সেনার শারীরিক উপস্থিতি চেয়েও এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি দরকার একটি রাজনৈতিক ঢাল| পাকিস্তান যদি তার প্রভাব খাটিয়ে তেহরানের মাধ্যমে হুতিদের সামরিক আগ্রাসনের গতি কিছুটা হলেও কমাতে পারে, তবে তা যেকোনো সামরিক অভিযানের চেয়ে সৌদি আরবের জাতীয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য অনেক বেশি ফলপ্রসূ হবে|
তবে রিয়াদের কিং ফয়সাল সেন্টারের আন্তর্জাতিক গবেষক উমর করিমের মতো তাত্ত্বিকরা ভিন্ন মাত্রার ঝুঁকির কথাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন| তাঁদের মতে, নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকার ঝুঁকিও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে| পাকিস্তান যদি সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পাদিত প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত চুক্তির প্রতি দৃশ্যমান কোনো দায়বদ্ধতা না দেখায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে রিয়াদের সঙ্গে তার কৌশলগত আস্থার সম্পর্কে গভীর ফাটল দেখা দিতে পারে| ফলে একদিকে মক্কার ধর্মীয় ও সামরিক অঙ্গীকার রক্ষা করে সৌদির আস্থা অক্ষুণ্ণ রাখা, আর অন্যদিকে সীমান্তের ওপারে থাকা তেহরানের সঙ্গে নতুন করে শত্রুতা তৈরি না করা—এই দুই সমীকরণের সরু সুতোয় দাঁড়িয়ে এখন পাকিস্তানের পেশাদার সেনাবাহিনীকে এক বিপজ্জনক কূটনৈতিক খেলা পরিচালনা করতে হচ্ছে|