• শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৭ পূর্বাহ্ন
Headline
আমাদের ১০টি কমন স্বভাব টাকা ছাপিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংককে ঋণ দেবে না বাংলাদেশ ব্যাংক ঢাবিতে নেকাব পরা শিক্ষার্থীকে অপমান ইসলামবিদ্বেষী মানসিকতা: বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস পশ্চিমবঙ্গ মাদরাসা সার্ভিস কমিশন বিলুপ্ত ঘোষণা করল বিজেপি সরকার মোদির সঙ্গে ত্রিবেদীর দীর্ঘ বৈঠক, তারেক রহমানের সফর নিয়ে আলোচনা প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে বৈঠক ১২ ডিসেম্বরের আগেই নবায়ন হবে গঙ্গা চুক্তি: পানিসম্পদমন্ত্রী শিক্ষকদের দাবি পর্যায়ক্রমে মেনে নেবে সরকার: রিজভী ভিসা সহজীকরণ ও বাণিজ্য বৃদ্ধি জোরদারে ইন্দোনেশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও মাহ্দী আমিনের বৈঠক দুর্নীতি করে শিক্ষকদের ভাতা বন্ধ করেছিল ফ্যাসিবাদী সরকার: মাহদী আমিন

বিপন্ন কন্যাশিশুদের রক্ষায় নীতি বদল জরুরি

Reporter Name / ৫ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা একটি দেশ। তবে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেবল পরিবেশগত বিপর্যয় বা অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আমাদের সমাজের গভীরতম লিঙ্গবৈষম্যকেও প্রকট করে তোলে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের একটি বৈশ্বিক গবেষণায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে কীভাবে বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস এবং তীব্র তাপপ্রবাহের মতো জলবায়ু বিপর্যয় কন্যাশিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশ, কেনিয়া, পেরু, সেনেগাল এবং জিম্বাবুয়ের প্রায় পাঁচ হাজার তরুণী ও কন্যাশিশুর ওপর পরিচালিত এই জরিপ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, বৈরী জলবায়ুর সবচেয়ে বড় ও নীরব শিকার হচ্ছে সমাজের পিছিয়ে পড়া নারী ও কন্যাশিশুরা।

গবেষণার ভয়াবহ পরিসংখ্যান বলছে, জলবায়ু সংকটের কারণে সৃষ্ট অভাব-অনটনের মুখে প্রতি দশজন কিশোরীর মধ্যে অন্তত একজন ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। জরিপে অংশ নেওয়া দশজনের মধ্যে নয়জনই আক্ষেপ নিয়ে জানিয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের টিকে থাকা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং মানসিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রচণ্ড চাপ ফেলে। স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এই বঞ্চনার চিত্র আরও মর্মান্তিক। ৭৬ শতাংশ তরুণী জানিয়েছে, দুর্যোগের সময় তারা ন্যূনতম একটি সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা পেতেও চরম সংগ্রাম করে; আর খরাকবলিত এলাকাগুলোতে এই স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার হার প্রায় ৮৪ শতাংশ। এর চেয়েও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, দুর্যোগের পর প্রতি দশজনে একজন নারী অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের শিকার হয়েছেন এবং ৩৩ শতাংশ নারী তাদের নিজ সমাজে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে দেখেছেন। প্রায় অর্ধেক অংশগ্রহণকারী দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে গর্ভাবস্থা বা সন্তান প্রসবজনিত নানা জটিলতা বৃদ্ধির কথা জানিয়েছেন এবং ২৮ শতাংশ নারী ও কন্যাশিশুর ওপর পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতা বাড়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

ঘূর্ণিঝড় সিডরের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে ২০২৬ সালে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্যোগকবলিত এলাকায় ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বাল্যবিবাহের হার আগের চেয়ে ৯ শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা দুর্যোগ কেটে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়। এই রূঢ় চিত্র প্রমাণ করে যে, দুর্যোগের পর শুধু তাৎক্ষণিক কিছু জরুরি ত্রাণ বিতরণ করেই এই গভীর সামাজিক ঝুঁকিগুলো মোকাবিলা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দুর্যোগের কয়েক মাস পরও যখন পরিবারগুলো আয়ের উৎস হারিয়ে গৃহহীন অবস্থায় থাকে, তখন অর্থনৈতিক চাপ কমাতে তারা কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে করে তড়িঘড়ি করে বিয়ে দিয়ে দেয়। বিশেষ করে দুর্যোগের কারণে যেসব কন্যাশিশুর শিক্ষাজীবন মাঝপথে ব্যাহত হয়, তাদের বাল্যবিবাহ বা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণ বেড়ে যায়। তাই দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমকে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় প্রশাসন, স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং শিশু সুরক্ষা গোষ্ঠীগুলোকে একসঙ্গে কাজ করে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করে তাদের পুনরায় শিক্ষার মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে হবে।

একই ধারাবাহিকতার অভাব ও অবহেলা পরিলক্ষিত হয় প্রজনন ও যৌন স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও। জলবায়ু সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় সম্প্রদায়ের ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্যোগের সময় নারীদের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী, ঋতুকালীন স্বাস্থ্যসেবা এবং গর্ভাবস্থার জরুরি চিকিৎসা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নারীদের জন্য পর্যাপ্ত আলো, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং পৃথক নিরাপদ শৌচাগারের ব্যবস্থা না থাকায় তারা পদে পদে যৌন হয়রানি ও সহিংসতার চরম ঝুঁকিতে দিন কাটান। তাই যেকোনো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার পরিকল্পনায় প্রজনন স্বাস্থ্যসেবাকে সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি ‘অত্যাবশ্যকীয় সেবা’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে অবশ্যই নারীবান্ধব ও সুরক্ষিত করে তুলতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, যেকোনো জলবায়ু নীতি, প্রশমন বা খাপ খাওয়ানোর কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে নারী ও কন্যাশিশুদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতি, নিরাপত্তাহীনতা এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার যে তিক্ত ও মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা তারা নিজেদের জীবনে ধারণ করেন, তা কেবল বৈজ্ঞানিক ডেটা বা জলবায়ুর পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। নীতি নির্ধারণী টেবিলে যদি নারীদের কণ্ঠস্বরকে অবহেলা করা হয়, তবে এমন অনেক সূক্ষ্ম ঝুঁকি নীতিনির্ধারকদের চোখের আড়ালে থেকে যাবে, যা জলবায়ু সংকটকে কন্যাশিশুদের জন্য আরও বেশি ধ্বংসাত্মক করে তুলবে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, সুরক্ষিত ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে হলে জলবায়ু নীতিমালায় নারীদের কথা শোনা এবং তাদের নেতৃত্বকে স্বীকার করে নেওয়া এখন আর কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের এক অলঙ্ঘনীয় মানবিক দায়িত্ব।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category