• শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৬ পূর্বাহ্ন

আঞ্চলিক পরাশক্তিদের ফাঁদে ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬

লোহিতসাগরের তপ্ত বাতাসে এখন কেবলই বারুদের গন্ধ আর কামানের দূরবর্তী গর্জন| বালুকাময় উপকূলীয় শরণার্থীশিবিরগুলোতে সারি সারি প্লাস্টিক ও কাপড়ের তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছে হাজার হাজার পরিবার| মাথায় পানির জার নিয়ে ধীরপায়ে হেঁটে চলা ক্লান্ত নারীদের চোখেমুখে চরম অনিশ্চয়তা, আর দূরে সমুদ্রের সীমানায় গর্জে উঠছে যুদ্ধজাহাজ| ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যে ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতির পর পুরো আরব উপদ্বীপে শান্তির একটি ক্ষীণ আশা তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেই ভঙ্গুর স্থিতি ধসে পড়ে সংঘাত আরও মারাত্মক রূপ নিয়েছে| তবে আপাতদৃষ্টিতে এটিকে রিয়াদ বনাম সানার সংঘাত মনে হলেও, এই রক্তক্ষয়ী ধ্বংসযজ্ঞের মূল সুতোটি ইয়েমেনের মাটিতে বাঁধা নেই| বরং অনেক দূরের দুই রাজধানী—ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের আক্রমণাত্মক যুদ্ধনীতি পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাবিস্ফোরণের কিনারে দাঁড় করিয়েছে| ইয়েমেনের প্রতিরোধ আন্দোলন আনসারুল্লাহ বা হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের এই লড়াই তাই কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং বাণিজ্যপথ দখল ও ভূরাজনীতির এক জটিল আন্তর্জাতিক আধিপত্যবাদী প্রকল্পের সাম্প্রতিকতম বিস্তার|

মধ্যপ্রাচ্যের চলতি সংকটের মূল সূচনা ঘটে বছরের শুরুর দিকে, যখন আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতিকে পুরোপুরি পদদলিত করে ইরান ভূখণ্ডে নজিরবিহীন যৌথ হামলা চালায় ওয়াশিংটন ও তেল আবিব| একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর এমন আকস্মিক ও সরাসরি আগ্রাসনে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হন, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যকে তছনছ করে দেয়| যে পশ্চিমা বিশ্ব প্রতিনিয়ত নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের ছবক দিয়ে থাকে, তাদের এমন প্রকাশ্য আইন লঙ্ঘন বৈশ্বিক কূটনীতির দ্বিমুখী চরিত্রকে আবারও নগ্ন করে তোলে| নিজেদের মিত্রদের জন্য এক মানদণ্ড আর বিরোধীদের জন্য অন্য কঠোর নিয়ম—পশ্চিমাদের এই পক্ষপাতদুষ্ট আচরণই মধ্যপ্রাচ্যকে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়েছে| এর জবাবে ইরান সরাসরি পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেয় এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নৌপথ অবরুদ্ধ করে দেয়| তেহরানের কাছে এটি ছিল নিছক কোনো অবরোধ নয়, বরং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক অপরিহার্য প্রতিরক্ষা কৌশল|

হরমুজ প্রণালি বন্ধের এই তীব্র অভিঘাত খুব দ্রুত লোহিতসাগরে ছড়িয়ে পড়ে| এর আগে ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতির পর হুতিরা সাময়িকভাবে তাদের সামরিক অভিযান স্থগিত রেখেছিল এবং লোহিতসাগরের বাণিজ্যিক নৌপথে অনেকটাই স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছিল| কিন্তু তেহরানের ওপর পশ্চিমা আগ্রাসনের পর আনসারুল্লাহ যোদ্ধারা স্পষ্ট অবস্থান নেয় যে, গাজা ও ইরানের ওপর বর্বর আক্রমণ চলবে আর ইয়েমেন নীরব দর্শক হয়ে থাকবে—তা হতে পারে না| দশকের পর দশক ধরে পশ্চিমা অবরোধ ও বিমান হামলার মধ্যে বেড়ে ওঠা একটি জনগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদা ও ফিলিস্তিনি সংহতির এই প্রকাশকে পশ্চিমা গণমাধ্যম নিছক বাইরের নির্দেশ বলে চিত্রিত করার চেষ্টা করে| অথচ ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয়কে আন্তর্জাতিক মহল যেভাবে বছরের পর বছর উপেক্ষা করে এসেছে, সেই নীরব ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত লোহিতসাগরের পানিপথকে বিশ্বরাজনীতিতে তাদের কথা শোনানোর প্রধান হাতিয়ারে পরিণত করেছে| জুলাইয়ের মাঝামাঝি সানা বিমানবন্দরে ইরান থেকে আসা একটি বিমান আটকে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইয়েমেনের ভেতরকার গৃহযুদ্ধ নতুন করে উসকে ওঠে, যার ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ তিন বছরের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিটি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে|

এই সর্বগ্রাসী সংঘাতের শিকড় মূলত আরও গভীরে প্রোথিত| এটি কেবল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের কোনো একক অভিযান নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পশ্চিমা ও ইহুদিবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা স্বাধীন ও প্রতিরোধকামী শক্তিগুলোকে স্থায়ীভাবে মুছে ফেলার এক বৃহত্তর ব্লুপ্রিন্ট| গাজায় হামাসের অবকাঠামো ধ্বংসের চেষ্টা, লেবাননে হিজবুল্লাহর নেতৃত্বের ওপর বিধ্বংসী আঘাত এবং সিরিয়ার ক্ষমতার পালাবদলের পর তেহরানের ওপর এই আক্রমণ কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়| ইরানের মিত্রবলয়কে একের পর এক উপড়ে ফেলার যে ছক কষা হয়েছে, তার মুখে দাঁড়িয়ে ইয়েমেনের প্রতিরোধ টিকিয়ে রাখা তেহরানের জন্য যেমন ভূকৌশলগত বাধ্যবাধকতা, তেমনি হুতিদের কাছে এটি অস্তিত্বের চরম লড়াই| ফলে লোহিতসাগরের তীর থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ পর্যন্ত এক বিস্তৃত রণাঙ্গন উন্মুক্ত হয়েছে|

সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে হুতিদের রণকৌশলগত অগ্রগতি পুরো অঞ্চলকে নতুন সমীকরণের মুখে ফেলেছে| সংগঠনটি লোহিতসাগরের পশ্চিম উপকূল ধরে দ্রুত অগ্রসর হয়ে বাব এল মান্দেব প্রণালির প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বাবুল মোখাসহ বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে| অন্যদিকে সৌদি আরবের অভ্যন্তরে আরামকোর তেল শোধনাগার এবং খামিস মুশাইতের মতো সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে| এই তীব্র যুদ্ধের নির্মম বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ; গত কয়েক মাসেই দেড় লাখেরও বেশি নিরীহ মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং মারিব অঞ্চলে চলছে এক রক্তক্ষয়ী মানবিক সংকট| হুতিরা সানাসহ দেশের একটি বিশাল অংশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করায় সংঘাতের আগুন এখন আর এক সীমানায় আটকে নেই| একটি পাথর পানিতে নিক্ষেপ করলে তার ঢেউ যেমন দূরবর্তী তীরে গিয়ে আঘাত করে, তেমনি পশ্চিমা আগ্রাসনের ঢেউ এখন সৌদি আরবের জ্বালানি নিরাপত্তাকে সরাসরি বিপন্ন করে তুলেছে|

এই রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক তেলবাণিজ্য ও অর্থনীতির জটিল অঙ্ক| পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব বাধ্য হয়ে লোহিতসাগরের বিকল্প পথ দিয়ে তাদের তেল রপ্তানি স্বাভাবিক রাখার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে| কিন্তু হুতিদের উপকূলীয় অগ্রযাত্রার কারণে লোহিতসাগরের বাব এল মান্দেব প্রণালিও এখন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ| ফলে সৌদি আরবের তেল অর্থনীতির সুরক্ষায় ফ্রান্স তাদের সেনা পাঠিয়েছে লোহিতসাগরের বন্দর পাহারা দিতে| সৌদি কর্তৃপক্ষ পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে নতুন সামরিক ও নিরাপত্তা সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছে| অথচ সমস্যার মূল চাবিকাঠি ওয়াশিংটনের হাতেই রয়ে গেছে| কারণ যারা প্রথমে আগ্রাসন চালিয়ে সংকট তৈরি করেছে, তারাই এখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে বিপুল অঙ্কের অস্ত্র বিক্রি করছে এবং তথাকথিত নিরাপত্তা ছাতার নামে তাদের নিজস্ব ভূকৌশলগত ফাঁদে আটকে রাখছে| আগুন লাগিয়ে যারা পানি বিক্রির ব্যবসা করে, তারা আর যাই হোক কোনো শান্তির দূত হতে পারে না|

এই ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে সবচেয়ে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক ও দুর্বল মানুষদের| সানার ধ্বংসস্তূপে কিংবা লোহিতসাগরের ধূলিধূসর শরণার্থীশিবিরে অনাহারে দিন কাটানো যে শিশুটি রাতের আঁধারে একমুঠো খাবারের আশায় পথ চেয়ে থাকে, সে জানে না হরমুজ প্রণালি বা বাব এল মান্দেব কী জিনিস| আবার বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের মূল্যস্ফীতির খেসারত দিতে হচ্ছে কোটি কোটি সাধারণ কর্মজীবী মানুষকে| সৌদি আরবের মতো রাষ্ট্রগুলো যতই পশ্চিমা নিরাপত্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হচ্ছে, ততই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে| হরমুজ ও বাব এল মান্দেবের জোড়া অস্থিরতা মূলত এই সত্যটিকেই প্রমাণ করে যে, সংকটটি সৌদি বনাম হুতির নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বহিরাগত আধিপত্যের আগ্রাসন|

এই অন্তহীন ধ্বংসযজ্ঞ থেকে স্থায়ী মুক্তির পথ কোনো সামরিক বিজয়ে নেই, তা নিহিত রয়েছে আঞ্চলিক দেশগুলোর পারস্পরিক অর্থবহ সংলাপ ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির মধ্যে| চীনের সফল মধ্যস্থতায় অতীতে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে যে কূটনৈতিক পুনঃসংযোগ ঘটেছিল, তা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে পশ্চিমাদের ছায়া ও হস্তক্ষেপ ছাড়াই মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব| বাব এল মান্দেব ও হরমুজের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে উপকূলীয় দেশগুলোর একটি যৌথ বহুপাক্ষিক কাঠামোর মাধ্যমে| এই শান্তি প্রক্রিয়ায় ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা বা ওআইসিকে কাগুজে বিবৃতি দেওয়ার অভ্যাস ছেড়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে, যেখানে পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর, ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশের মতো ভারসাম্যপূর্ণ মুসলিম দেশগুলো একটি কার্যকর মধ্যস্থতার প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে পারে| বিশ্বশক্তিগুলোরও উচিত কোটি কোটি ডলারের মারণাস্ত্র বিক্রির ব্যবসা বন্ধ করে সেই অর্থ ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুল, বন্দর ও হাসপাতাল পুনর্নির্মাণে বিনিয়োগ করা| বাইরের শক্তির আঁকা সংঘাতের মানচিত্রে নিজেদের রক্ত ঝরানো বন্ধ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে এখনই একতাবদ্ধ হয়ে তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ লেখার সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে|


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category