• শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২০ অপরাহ্ন

আমদানি করা জ্বালানির চেয়ে সাশ্রয়ী: সৌরবিদ্যুতে জোর দিচ্ছে সরকার

Reporter Name / ১ Time View
Update : শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬

বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি, তীব্র গ্যাস সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্ষয়ের এই সংকটময় সময়ে দেশের বিদ্যুৎ খাতে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে পাবনার পদ্মার চর| ধু ধু বালুচরের ৪০০ একর পতিত জমির ওপর নির্মিত ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে যোগ করছে শতভাগ দূষণমুক্ত সবুজ বিদ্যুৎ| যেখানে ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিট উৎপাদনে ২৮ টাকার বেশি এবং আমদানি করা কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে ১৫ টাকার কাছাকাছি খরচ হচ্ছে, সেখানে এই কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ মিলছে প্রায় ১৩ টাকায়| সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো, এই কেন্দ্রটি চালু রাখতে কোনো মূল্যবান ডলার খরচ করে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল বা কয়লা আমদানি করতে হয় না| পরিবেশের ক্ষতি না করে তুলনামূলক কম খরচে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের এমন কার্যকর সমাধান থাকা সত্ত্বেও নীতিগত দীর্ঘসূত্রতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অনীহার কারণে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশ এখনো প্রাথমিক স্তরেই আটকা পড়ে রয়েছে|

বিগত দেড় দশকের শাসনব্যবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিংহভাগ পরিকল্পনাই গড়ে উঠেছিল আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর| বিগত সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত মোট ১৩৬টি বিদ্যুৎ উৎপাদন চুক্তির প্রায় সবই ছিল তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর| বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৩৪৭ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও, তার মধ্যে সৌর, বায়ু ও পানিকেন্দ্রিক ১৯টি নবায়নযোগ্য প্রকল্প থেকে আসে মাত্র ১ হাজার ৮৯ মেগাওয়াট, যা সামগ্রিক সক্ষমতার মাত্র ৪ শতাংশ| নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করলে এই উৎপাদন দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৯২ মেগাওয়াটে, যা মোট জাতীয় সক্ষমতার মাত্র ৫ শতাংশ| অথচ এক দশক আগে ২০১২-১৩ অর্থবছরেও এই হিস্যা ছিল আড়াই শতাংশের বেশি| ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলারের মহাবিনিয়োগ সম্পন্ন হলেও তার মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বরাদ্দ পেয়েছিল নবায়নযোগ্য খাত| এর ফলে ২০২১ কিংবা ২০২৫ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা বারবার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে|

আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে জ্বালানি ও ডলার সংকটে দিশেহারা হয়ে তড়িঘড়ি করে বিশেষ বিধান আইনের আওতায় কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মতিপত্র প্রদান করা হয়েছিল| পরবর্তীতে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিল ঘোষিত হওয়ায় এবং অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার যুক্তিতে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তি ও সম্মতিপত্র বাতিল করে দেয়| এর বিপরীতে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বচ্ছ উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে যে ১১টি কেন্দ্রের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, সেখানে বিদ্যুতের গড় দর নেমে আসে প্রতি ইউনিট ৮ থেকে ১০ টাকার মধ্যে, এমনকি একটি কেন্দ্রে তা সাড়ে ৭ সেন্ট বা ৯ টাকার কিছু বেশিতে চূড়ান্ত হয়| উন্মুক্ত দরপত্রের এই ইতিবাচক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, সঠিক প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে সৌরবিদ্যুৎ জীবাশ্ম জ্বালানির চেয়ে বহুগুণ সাশ্রয়ী| তবে হঠাৎ ৩১টি প্রতিষ্ঠানের সম্মতিপত্র একযোগে বাতিলের ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র আস্থার সংকটও তৈরি হয়েছে| বাতিল হওয়া কেন্দ্রগুলোতে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিল এবং অনেক প্রতিষ্ঠান জমিও কিনে ফেলেছিল| দীর্ঘ আইনি লড়াই ও অনিশ্চয়তায় পড়ে শীর্ষস্থানীয় চীনা প্রতিষ্ঠানসহ বেশ কয়েকটি বহুজাতিক সংস্থা তাদের বরাদ্দকৃত মূলধন ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে|

নতুন দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক উচ্চাভিলাষী রূপরেখা গ্রহণ করেছে| বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমের তীব্র দাবদাহে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি কমাতে ছাদভিত্তিক বা রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে| এর অংশ হিসেবে সরকারি ভবনের পাশাপাশি বেসরকারি শিল্প-কারখানার ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে এবং উৎপাদিত ছাদবিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট সাড়ে ১০ টাকা দরে গ্রিডে কিনে নেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে| পাশাপাশি সৌর সরঞ্জামের ওপর আমদানি শুল্ক কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে, যার সুফল ইতিমধ্যে বাজারে পড়তে শুরু করেছে| এ ছাড়া সরকারি জমিতে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে মেগা সোলার পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার বড় প্রমাণ বাগেরহাটের রামপালে কয়লা প্রকল্পের অব্যবহৃত জমিতে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিশালাকার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের সরকারি অনুমোদন|

তবে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো নানামুখী কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা দৃশ্যমান| প্রথমত, বিগত সরকারের আমলে দেওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদেশি ঋণের সার্বভৌম গ্যারান্টি বা রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা বাতিলের কারণে আন্তর্জাতিক ঋণদাতারা নতুন প্রকল্পে অর্থায়নে চরম অনীহা দেখাচ্ছে| দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধাবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য বিঘ্নিত হয়ে সোলার প্যানেল ও ইনভার্টারসহ জরুরি প্রযুক্তি আমদানিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে| তদুপরি জমি অধিগ্রহণের জটিলতা এবং অনভিজ্ঞ দেশীয় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতার ঘাটতি প্রকল্পের সময়সীমাকে অনিশ্চিত করে তুলছে| এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দরপত্র পাওয়া কনফিডেন্স গ্রুপের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীও অর্থায়ন ও জমির সংকটের কারণে ২০২৮ সালের আগে উৎপাদনে আসতে পারছে না| অন্যদিকে নতুন সরকার ঘোষিত ১০টি সৌর প্রকল্পের দরপত্র জমার মেয়াদ বারবার বাড়ানোয় পুরো প্রক্রিয়ার গতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে সংশয় তৈরি হয়েছে|

বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের কৌশল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও নীতিগত ধারাবাহিকতার মাধ্যমে এ খাতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে| প্রতিবেশী ভারত ২০০৬ সালেই পৃথক নবায়নযোগ্য জ্বালানি মন্ত্রণালয় গঠন করে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিয়েছিল, যার সুফল হিসেবে দেশটির মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি বা ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ এখন আসছে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য খাত থেকে| ভিয়েতনামের চিত্র আরও বিস্ময়কর; ২০১৮ সালে যে দেশের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল মাত্র ৮৬ মেগাওয়াট, সমন্বিত নীতিসহায়তা ও প্রণোদনার জোরে ২০২৫ সাল নাগাদ তা ১৯ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে| তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত পাকিস্তানে বিদ্যুতের চড়া মূল্যের কারণে সাধারণ মানুষ ও শিল্পমালিকরা স্বউদ্যোগে ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল বসিয়ে ৬ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করছেন|

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তরের ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক সম্ভাবনা অত্যন্ত বিশাল| জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে যেখানে এক দশকের বেশি সময় ও বিপুল বৈদেশিক ঋণ প্রয়োজন হয়, সেখানে মাত্র দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে একটি বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব| জমি সংকটকে প্রায়শই বড় বাধা হিসেবে তুলে ধরা হলেও দেশে বর্তমানে প্রায় ৩৬ লাখ একর খাসজমি এবং ১৮ লাখ একর অনাবাদি অকৃষিজমি অলস পড়ে আছে| কেবল দেশের বিভিন্ন নদী অববাহিকায় জেগে ওঠা চরাঞ্চলের ৩০ হাজার একর অনাবাদি জমি বৈজ্ঞানিক উপায়ে ব্যবহার করেই প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব| এর বাইরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব মালিকানায় থাকা প্রায় ৬ হাজার একর জমিও সোলার পার্কের জন্য অত্যন্ত উপযোগী|

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের গবেষকরা মনে করছেন, শুধু নতুন দরপত্রের অপেক্ষায় বসে থাকলে আগামী চার-পাঁচ বছরেও গ্রিডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সবুজ বিদ্যুৎ যুক্ত হবে না| তাই বাতিল হওয়া সম্মতিপত্রগুলোর মধ্যে যেসব প্রকৃত বিদেশি উদ্যোক্তা জমি কিনে প্রাথমিক অবকাঠামো গড়ে তুলেছিল, তাদের সঙ্গে দর-কষাকষি করে বিদ্যুতের ইউনিট মূল্য কমিয়ে দ্রুত উৎপাদনে আনার পথ উন্মুক্ত করা উচিত| বিশেষ করে নীলফামারীর ডিমলা কিংবা দিনাজপুরের মতো প্রস্তুত হয়ে থাকা কেন্দ্রগুলোকে ছাড়পত্র দিলে আগামী এক বছরের মধ্যেই জাতীয় গ্রিডে বাড়তি বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব| আমদানিকৃত নোংরা কয়লা ও তেলের ওপর নির্ভরশীলতার দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নীতিগত দোলাচল পরিহার করে সৌরবিদ্যুৎকে কেবল বিকল্প নয়, বরং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে|

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category