• শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২২ অপরাহ্ন

কাগজে বন্দি ৪৮ হাজার কমিটি: এডিসের বিস্তার সারা দেশে, নজরদারির অভাবে বাড়ছে মৃত্যু

Reporter Name / ১ Time View
Update : শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬

সারা দেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু এখন আর কোনো একক ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই| রাজধানী ঢাকার অভিজাত পাড়া থেকে শুরু করে উপকূলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল কিংবা উত্তরের নিভৃত পল্লী—সবখানেই আজ প্রাণঘাতী এডিস মশার নির্মম রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে| স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনিক বুলেটিনে চোখ রাখলেই দেখা যায় হাসপাতালে ভিড় করা হাজার হাজার মুমূর্ষু মানুষের হাহাকার আর স্বজন হারানোর বুকফাটা কান্না| এমন এক সংকটময় মুহূর্তে সরকারি নথিপত্রে চোখ রাখলে যে কেউ ভেবে বসবেন, মশা মারার জন্য রাষ্ট্র বুঝি এক দুর্ভেদ্য প্রাতিষ্ঠানিক দুর্গ গড়ে তুলেছে| মাঠপর্যায়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে কাগজ-কলমে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নের ওয়ার্ড থেকে শুরু করে একেবারে সচিবালয়ের শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত গড়ে তোলা হয়েছে ৪৮ হাজারেরও বেশি বিশেষ প্রতিরোধ কমিটি| কিন্তু মাঠের নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো, বিশাল এই কাঠামোর প্রায় পুরোটাই বাস্তবে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত| আমলাতান্ত্রিক নথিতে কোটি কোটি মানুষের সুরক্ষার সুন্দর ছক আঁকা থাকলেও বাস্তবে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস কিংবা লার্ভা নিধনে কোনো সক্রিয় তৎপরতা চোখে পড়ছে না| স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ সংস্থাগুলোর চরম উদাসীনতা ও সমন্বয়হীনতায় এই বিপুলসংখ্যক কমিটি আজ কেবল সরকারি কাগজেই বন্দি হয়ে আছে|

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে জনস্বাস্থ্যের এক চরম বিপর্যয়কর চিত্র উন্মোচিত হয়| প্রতিদিনের মতো গতকালও সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নতুন করে ১০ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে| এর আগের দিনও ৯ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন| এই নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুর বিষাক্ত ছোবলে প্রাণ হারালেন মোট ২৮১ জন নিরপরাধ নাগরিক| সংক্রমণ ও মৃত্যুর এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে| কোনো একটি বা দুটি নির্দিষ্ট জেলায় নয়, বরং দেশের ৬৪টি জেলাই এখন ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে| দেশের সব প্রান্ত থেকেই প্রতিদিন হাসপাতালে কাতারে কাতারে রোগী ভর্তি হচ্ছেন| সবশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাব অনুযায়ী সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী| চলতি বছরে এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯০ হাজার ৩৫৬ জনে| বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের শয্যায় যন্ত্রণায় ছটফট করছেন ৫ হাজার ৭৭৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষ| অথচ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, ডেঙ্গুর মতো সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ কেবল হাসপাতালের চিকিৎসা দিয়ে সম্ভব নয়; এর মূল সমাধান লুকিয়ে আছে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি সমূলে ধ্বংস করার মধ্যে| সেই কাজের মূল দায়িত্ব স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের ওপর ন্যস্ত হলেও বছরের পর বছর ধরে তাদের তদারকিতে কেবল ব্যর্থতার দীর্ঘ তালিকাই যুক্ত হচ্ছে|

পাঁচ বছর আগে ২০১৯ সালে যখন দেশে প্রথমবারের মতো ডেঙ্গু বড় আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন স্থানীয় সরকার বিভাগ বড় ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ জাতীয় নির্দেশিকা’ প্রকাশ করেছিল| সেই নির্দেশিকায় ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এবং জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ধাপে ধাপে সুনির্দিষ্ট কমিটি গঠনের সুস্পষ্ট রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল| প্রতিটি কমিটিতে কতজন সদস্য থাকবেন, কমিটির সভাপতি ও সদস্যসচিব কে হবেন, কত দিন পর পর সভা অনুষ্ঠিত হবে এবং তাদের কর্মপরিধি কী হবে—তার সবকিছুই বিশদভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়| কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, কেন্দ্রীয় জাতীয় কমিটি এবং গুটি কয়েক সিটি করপোরেশনের নামমাত্র তৎপরতা ছাড়া তৃণমূলের সিংহভাগ কমিটি কখনো আলোর মুখই দেখেনি| জেলা, উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের এই কমিটিগুলো কার্যকর করার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তাগিদ স্থানীয় সরকার বিভাগ কখনো অনুভব করেনি| ফলে মশার ওষুধ ছিটানো থেকে শুরু করে জমা পানি পরিষ্কারের প্রাথমিক উদ্যোগগুলো মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি|

কাগজে-কলমে থাকা এই বিশাল প্রশাসনিক কাঠামোর গভীরে নজর দিলে দেখা যায়, তৃণমূলের সবচেয়ে প্রাথমিক স্তরটি হলো ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায়ের ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ কমিটি’| সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের নির্বাচিত মেম্বার বা ইউপি সদস্যকে সভাপতি করে ১১ সদস্যের একটি শক্তিশালী কমিটি গঠনের নিয়ম রয়েছে| দেশে বর্তমানে মোট ইউনিয়ন রয়েছে ৪ হাজার ৫৯৯টি| প্রতি ইউনিয়নে ৯টি করে ওয়ার্ডের হিসাবে সারা দেশের গ্রামপর্যায়ে কেবল ওয়ার্ড কমিটির সংখ্যাই দাঁড়ায় ৪১ হাজার ৩৯১টি| স্থানীয় সরকার বিভাগের ছক অনুযায়ী এই বিপুলসংখ্যক কমিটি যদি তাদের নিজ নিজ ওয়ার্ডে নিয়মিত কাজ করত, তবে দেশের প্রতিটি বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখা সম্ভব হতো| কিন্তু বাস্তবে দেশের কোনো একটি ইউনিয়নের কোনো ওয়ার্ডে এমন কোনো কমিটি কোনো দিন গঠিত হয়েছে কি না, তা স্থানীয় বাসিন্দারা তো দূরের কথা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও জানেন না| এর ঠিক ওপরের স্তরে রয়েছে ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটি, যার সভাপতি পদাধিকারবলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান| এর ওপরে রয়েছে ৩৩০টি পৌরসভা এবং ৫০৩টি উপজেলা কমিটি, যেখানে যথাক্রমে পৌর মেয়র ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে|

এই স্তরের ওপরে জেলা পর্যায়ে ৬৪টি জেলায় ৬৪টি পূর্ণাঙ্গ কমিটি এবং দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনে ১৩টি বিশেষ কমিটি থাকার কথা| এর বাইরে দেশের সবকটি সিটি করপোরেশনের ৬৬৮টি ওয়ার্ডে এবং ৩৩০টি পৌরসভার কমপক্ষে ৯৯০টি ওয়ার্ডে পৃথক প্রতিরোধ কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে| আর এই পুরো কাঠামোর শীর্ষে অভিভাবক হিসেবে রয়েছে ২৪ সদস্যের ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় কমিটি’| এই শীর্ষ কমিটিতে ঢাকার দুই মেয়র, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ১৪টি মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন| সব মিলিয়ে ইউনিয়ন থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত মোট কমিটির সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৮ হাজার ৫৫৯টি| কিন্তু এই বিপুলসংখ্যক কমিটির বিশাল বহর কেবল সরকারি ফাইলের শোভাবর্ধন ছাড়া আর কোনো কাজে আসছে না| সরকারের উচ্চপর্যায়ে ডেঙ্গু নিয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন এমন বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরাও বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, নীতিনির্ধারণী বড় বড় সভাতেও তৃণমূলের এই কমিটিগুলো নিয়ে কখনো কোনো আলোচনা বা মূল্যায়ন হতে শোনা যায়নি|

সরকারি সেই নির্দেশিকায় এই কমিটিগুলোর জন্য যে বিশাল কর্মপরিধি নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় পরিকল্পনায় কোনো ঘাটতি ছিল না| স্থানীয় সরকার বিভাগকে পুরো দেশের সব অংশীজন, গণমাধ্যম, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়কের ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল| মশা নিধনে বছরব্যাপী ধারাবাহিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, তৃণমূল থেকে আসা সুপারিশ অনুযায়ী তাৎক্ষণিক অর্থ ও কীটনাশক বরাদ্দ এবং মাঠের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকির স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল| জাতীয় কমিটির দায়িত্ব ছিল বছরে অন্তত চারটি আনুষ্ঠানিক সভা করে সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা এবং কীটতাত্ত্বিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে আধুনিক কর্মকৌশল প্রণয়ন করা| এছাড়া প্রতিটি সিটি করপোরেশনকে মশার লার্ভা ধ্বংসে ৩৩টি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ এবং পৌরসভাগুলোকে লার্ভার উৎসস্থল ধ্বংস করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল| এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিগুলোরও প্রতি মাসে অন্তত একবার বসে পরিস্থিতি পর্যালোচনার বাধ্যতামূলক নিয়ম করা হয়েছিল| অথচ বাস্তবে মাসের পর মাস কোনো সভাই অনুষ্ঠিত হয় না এবং নির্দেশিকাটি এখন লাইব্রেরির তাকে ধুলাবালির নিচে চাপা পড়ে রয়েছে|

পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে চলতি বছরের ১১ মার্চ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সারা দেশে মশক নিধন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান| এর পরও যখন স্থানীয় সরকার প্রশাসনের মধ্যে কোনো দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যায়নি, তখন প্রধানমন্ত্রী নিজেই গত ১২ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী এক বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন| প্রতি শনিবার এই কর্মসূচি পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়, যা আগামী ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলার কথা| প্রধানমন্ত্রীর এই শীর্ষ পর্যায়ের হস্তক্ষেপের পর প্রশাসনিক স্তরে কিছুটা নড়াচড়া শুরু হলেও তা মূলত খণ্ডিত ও অপরিকল্পিত পদক্ষেপে রূপ নিয়েছে| যেমন কুমিল্লার জেলা প্রশাসন দাবি করেছে যে তারা জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি গঠন করেছে এবং কুমিল্লা সিটির ২৭টি ওয়ার্ডেও কমিটি করা হয়েছে| কিন্তু দেশের বাকি অঞ্চলের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো|

মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র অনুসন্ধান করলে এই আমলাতান্ত্রিক ব্যর্থতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে| পাবনার বেড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার প্রশাসক খোলাখুলি জানিয়েছেন যে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে কমিটি গঠনের কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি নির্দেশনা তারা ওপরের দপ্তর থেকে পাননি| ফলে সেখানে কোনো কমিটিই করা হয়নি, কেবল দায়সারাভাবে কিছু কাজ চালানো হচ্ছে| সেখানকার স্থানীয় এক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানান, উপজেলা পরিষদের মাসিক সভায় বিষয়টি মৌখিকভাবে আলোচনা হওয়ার পর তারা গ্রাম পুলিশ ও স্থানীয়দের নিয়ে কিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু করেছেন| নেত্রকোনা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে তাদের নয়টি ওয়ার্ডের কোনোটিতেই কোনো কমিটি নেই, কেবল প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মেনে শনিবারের দিন ফগার মেশিন দিয়ে কিছু ধোঁয়া দেওয়া হচ্ছে| ময়মনসিংহে সিটি করপোরেশন পর্যায়ে একটি টাস্কফোর্স থাকলেও তৃণমূলের ওয়ার্ড কমিটিগুলো দীর্ঘদিন ধরে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়| যশোরের কেশবপুরে কোনো কোনো চেয়ারম্যান দাবি করছেন তারা সভা করেছেন, আবার অন্য ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা বলছেন কোনো দিন কোনো সভার ডাকই দেওয়া হয়নি| রংপুরের তারাগঞ্জে গ্রাম পুলিশকে ফগার মেশিন চালানো শিখিয়ে দায়িত্ব শেষ করা হয়েছে, সেখানেও কোনো কমিটির অস্তিত্ব নেই| এমনকি সিলেট সিটি করপোরেশন কিংবা চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের মতো উপকূলীয় দ্বীপ উপজেলাতেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে কোনো ওয়ার্ড বা ইউনিয়ন কমিটির অস্তিত্ব মেলেনি|

একসময় বাংলাদেশের মানুষের সাধারণ ধারণা ছিল যে ডেঙ্গু কেবল ইট-পাথরের রাজধানী ঢাকা কিংবা বড় বড় বিভাগীয় শহরের একটি আধুনিক রোগ| ২০১৯ সালের আগে মশক নিধনের যাবতীয় ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও বাজেট বরাদ্দও তাই শহরগুলোকে ঘিরেই আবর্তিত হতো| কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জনমিতিক পরিবর্তন ও অবাধ যাতায়াতের কারণে ডেঙ্গু শহর ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতেও ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে| গ্রামের অসচেতন মানুষ যেখানে সামান্য জ্বরেও সঠিক চিকিৎসার সুযোগ পায় না, সেখানে ডেঙ্গুর বিস্তার এক নীরব মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে| অথচ গ্রামাঞ্চলের খাল-বিল, ডোবা বা বসতবাড়ির আশপাশে মশা নিধনে স্থানীয় সরকার প্রশাসনের কোনো দীর্ঘমেয়াদি ও নিয়মিত কার্যক্রম নেই বললেই চলে| গ্রামীণ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ডেঙ্গু শনাক্তকরণের কিট ও চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় রোগীরা জটিল অবস্থায় শহরে আসার পথেই প্রাণ হারাচ্ছেন|

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে বলছেন যে, মশা মারার জন্য শুধু ফগার মেশিনে কোটি কোটি টাকার ডিজেল পুড়িয়ে লাভ হবে না, যদি না সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা যায়| আর সেই সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার একমাত্র কার্যকর হাতিয়ার হতে পারত তৃণমূলের এই ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটিগুলো| এলাকার স্কুলশিক্ষক, ইমাম, এনজিও কর্মী ও যুবসমাজকে এই কমিটিতে যুক্ত করে প্রতিটি মহল্লায় যদি জবাবদিহিমূলক পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা যেত, তবে ডেঙ্গুর এই বিস্তার শুরুতেই ঠেকানো সম্ভব হতো| স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে তাই কাগুজে পরিসংখ্যানের মায়া ত্যাগ করে অবিলম্বে এই ৪৮ হাজার কমিটিকে মাঠে নামাতে হবে| উপজেলা প্রশাসনকে দিয়ে প্রতিটি ওয়ার্ডে কমিটি পুনর্গঠন, সদস্যদের প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা জরুরি| অন্যথায় সরকারি ফাইলে কমিটির সংখ্যা যতই বাড়বে, হাসপাতালের মর্গে ডেঙ্গু রোগীর লাশের মিছিলও ততই দীর্ঘ হতে থাকবে|

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category