• শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২১ অপরাহ্ন

চার বছরে দারিদ্র্যসীমার নিচে আরও ৮০ লাখ মানুষ

Reporter Name / ১ Time View
Update : শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬

গত দেড় দশকের অর্থনৈতিক অর্জন, দারিদ্র্য বিমোচনের সাফল্য এবং প্রবৃদ্ধির কাগুজে পরিসংখ্যানকে ধূলিসাৎ করে দিয়ে দেশের নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনে নেমে এসেছে এক ভয়াবহ অন্ধকার অধ্যায়| বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়নে উঠে এসেছে এক রূঢ় ও মর্মস্পর্শী বাস্তবতা—বিগত মাত্র চার বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশে চরম আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে নতুন আরও প্রায় ৮০ লাখ মানুষ| ২০২২ সালে যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ চরম দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত ছিল, ২০২৬ সালে এসে সেই অনুপাত এক লাফে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ১ শতাংশে| প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারে নীতিনির্ধারকদের ধারাবাহিক ব্যর্থতা, প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি, নতুন কর্মসংস্থানের চরম আকাল, দফায় দফায় কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বছরজুড়ে চলা লাগামহীন মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ও ক্রয়ক্ষমতা নিঃশেষ করে দিয়েছে| দারিদ্র্য জয়ের দীর্ঘ লড়াইকে এমন নির্মমভাবে পেছনের দিকে ঠেলে দেওয়ার এই সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে প্রকাশিত ফ্ল্যাগশিপ প্রতিবেদন ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’-এ|

বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক হিসাব পর্যালোচনা করলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ক্রমাবনতির নিখুঁত ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে| তথ্যানুযায়ী, আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে ২০২৩ সালে নতুন করে নিট দরিদ্র মানুষের তালিকায় যুক্ত হয়েছিল ৮ লাখ মানুষ| ২০২৪ সালে এই সংখ্যাটি অভাবনীয়ভাবে এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭ লাখে| এর পরবর্তী বছর ২০২৫ সালে আরও ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে তলিয়ে যায় এবং চলতি ২০২৬ সালে নতুন করে আরও ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে| সব মিলিয়ে এই চার বছরে মোট বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পূর্ণাঙ্গ ৮০ লাখে| আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার পাশাপাশি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো তথা বিবিএসের নিজস্ব জাতীয় দারিদ্র্যসীমার হিসাবেও পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে| বিগত চার বছরে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে| বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে আরও সতর্ক করা হয়েছে যে, চলতি অর্থবছরে এই হার আরও বেড়ে ২২ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে এবং পরবর্তী ২০২৭-২৮ অর্থবছরের আগে পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই| আরও ভীতিপ্রদ তথ্য হলো, দেশে বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ যেকোনো আকস্মিক অর্থনৈতিক ধাক্কায় যেকোনো মুহূর্তে নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে|

প্রতিবেদনটিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, দেশের আর্থিক ও উৎপাদনশীল খাতের কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়াই এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ| বিশেষ করে জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন সময় অস্বাভাবিক সংকুচিত হয়ে পড়েছে| নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে একের পর এক উৎপাদন ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাখ লাখ শ্রমিক তাদের কর্মসংস্থান হারিয়েছেন| শিল্প খাতে নতুন নিয়োগ প্রায় পুরোপুরি থমকে গেছে| বিশ্বব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২২ সালে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের হার যেখানে ছিল ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০২৪ সালে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে| কাজ হারানোর পর অধিকাংশ নারীই আর নতুন কোনো কর্মসংস্থান খুঁজে না পেয়ে চূড়ান্তভাবে শ্রমবাজার থেকেই ছিটকে পড়েছেন| বেসরকারি বিনিয়োগে চরম স্থবিরতা নেমে আসায় এবং ব্যাংক খাতে তারল্য ও আস্থার সংকটের কারণে চলতি বছরের জুন মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে গেছে মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশে, যা বিগত ৩৩ বছরের ইতিহাসে সর্বনিম্ন| একই সময়ে ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৩ দশমিক ২ শতাংশই খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা ও বিনিয়োগকারীদের গভীর আস্থাহীনতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে|

অর্থনৈতিক এই বহুমুখী সংকটের মধ্যেও দেশের বৈদেশিক খাত কেবল প্রবাসীদের পাঠানো বিপুল রেমিট্যান্স এবং কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানো বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর ভর করে কোনোমতে ভারসাম্য বজায় রেখেছে| তবে সামগ্রিক অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে রাজস্ব আদায়ের করুণ দশার কারণে| বাংলাদেশে রাজস্ব আদায়ের হার জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা গোটা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন| ফলে সাধারণ মানুষের কল্যাণে কিংবা সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করার মতো প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা সরকারের হাতে থাকছে না| সংস্থাটি পূর্বাভাস দিয়েছে যে, বিদায়ি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছিল মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশে এবং চলতি অর্থবছরেও তা একই স্তরে স্থবির থাকবে| জ্বালানি সংকট সমাধান এবং দ্রুত কার্যকর সংস্কার নিশ্চিত করা সম্ভব হলে পরবর্তী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়তো সামান্য কিছুটা বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে| বাংলাদেশ ও ভুটানে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জঁ পেম অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উল্লেখ করেছেন যে, দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে কালবিলম্ব না করে ব্যাংকিং, রাজস্ব এবং জ্বালানি খাতে অবিলম্বে বড় ধরনের ও সাহসী সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে|

এই অর্থনৈতিক সংকটের রাশ টানতে বিশ্বব্যাংক বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও কঠোর সুপারিশ তুলে ধরেছে| আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যাংকগুলোর সম্পদের প্রকৃত মান যাচাই, দুর্বল ব্যাংকগুলোর দ্রুত পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের অবৈধ সুবিধা বন্ধ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি জোরদারের তাগিদ দেওয়া হয়েছে| অন্যদিকে জ্বালানি খাতে ২০২৪ সালে চালু হওয়া স্বয়ংক্রিয় বাজারভিত্তিক মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও অনুরূপ পদ্ধতি চালুর সুপারিশ করা হয়েছে| সেখানে বিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রথম ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত লাইফলাইন রেট বা সর্বনিম্ন শুল্ক সুবিধা বজায় রাখা এবং ১৫০ ইউনিটের ওপরে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যাবতীয় ভর্তুকি পুরোপুরি প্রত্যাহার করার কথা বলা হয়েছে| তবে বিশ্বব্যাংকের এই জ্বালানি ব্যবস্থাপনার প্রেসক্রিপশনকে বরাবরের মতোই তীব্র সমালোচনার চোখে দেখছেন দেশীয় অর্থনীতিবিদরা| জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সাবেক অধ্যাপক ও প্রখ্যাত গবেষক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের এই ধরনের সুপারিশ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি অসঙ্গতিপূর্ণ| আন্তর্জাতিক ঋণদাতারা সবসময় সাধারণ ভোক্তার কাঁধে চাপ বাড়িয়ে ভর্তুকি কমানোর কথা বলে, অথচ বিগত সরকারের নেওয়া ব্যয়বহুল কুইক রেন্টাল প্রকল্প কিংবা আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস তথা চড়া মূল্যের এলএনজির অপনীতি কীভাবে জ্বালানি ব্যয়কে আকাশচুম্বী করে তুলেছে, তা এড়িয়ে যায়| তিনি অবিলম্বে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির আত্মঘাতী নীতি পরিহার করে অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য সৌরবিদ্যুৎ বিকাশের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন|

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ক্ষেত্রে বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতাও অত্যন্ত নির্মমভাবে সামনে এসেছে| বিশ্বব্যাংকের মতে, দেশে চরমভাবে দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকেরই বর্তমান কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে কোনো অন্তর্ভুক্তি নেই| ভুল মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় সুবিধাভোগী নির্বাচনের কারণে প্রকৃত অভাবী মানুষ রাষ্ট্রীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে| সংস্থাটি একটি ডাইনামিক বা গতিশীল সামাজিক রেজিস্ট্রি চালুর সুপারিশ করেছে, যাতে প্রকৃত দুস্থ পরিবারগুলোর নিয়মিত অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা যায়| বিশ্বব্যাংকের একটি সিমুলেশন অনুযায়ী, পারিবারিক কার্ডের সঙ্গে সঠিক মানুষের কাছে নগদ আর্থিক সহায়তা এবং খাদ্য ভর্তুকির সমন্বিত প্যাকেজ নিখুঁতভাবে পৌঁছে দেওয়া গেলে নতুন করে আরও সাড়ে ২৮ লাখ মানুষকে অতি দ্রুত চরম দারিদ্র্যের ফাঁদ থেকে টেনে তোলা সম্ভব|

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ডক্টর কেএএস মোর্শেদ এই সামগ্রিক পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক অভিহিত করে বলেন, বিনিয়োগের খরা এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানহীনতা মানুষকে মাঝারি দারিদ্র্যসীমা পেরিয়ে চরম দারিদ্র্যের মুখে ঠেলে দিচ্ছে| তিনি জোর দিয়ে বলেন, কেবল কাগুজে ত্রাণ দিয়ে এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলা করা যাবে না| এর জন্য কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে শিল্পোদ্যোক্তাদের হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে, যাতে নতুন কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মোচিত হয়| সেই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুবিধাভোগী নির্বাচনে যাবতীয় অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাব দূর করে প্রকৃত বঞ্চিতদের কাছে রাষ্ট্রীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি| যদি অবিলম্বে আর্থিক খাতের কাঠামোগত ব্যাধি দূর করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা না যায়, তবে বিশ্বব্যাংকের এই আশঙ্কাজনক পরিসংখ্যান আগামী দিনে আরও বড় কোনো সামাজিক ও মানবিক বিপর্যয়ের বিস্ফোরণ ঘটাবে|

তথ্যসূত্র: নিউ এজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category