স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ এক অদ্ভুত আত্মঘাতী সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে, যেখানে মানুষের জীবনের চেয়ে লোভ আর ক্ষমতার বিস্তার অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে উঠেছে। নিমতলীতে শত প্রাণের মর্মান্তিক ঝরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে যে অগ্নিসন্ত্রাসের সূচনা হয়েছিল, তার সর্বশেষ রক্তিম ক্ষত তৈরি হয়েছে কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টের ছাইস্তূপে। চকবাজারের চুড়িহাট্টা, সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপো, রূপগঞ্জের হাশেম ফুড কিংবা বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ—প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর রাষ্ট্রীয় শোক, তদন্ত কমিটি গঠন এবং কিছু গতানুগতিক প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি দেখা যায়। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সব স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং আবারও কোনো না কোনো স্থানে লাশের মিছিল দীর্ঘ হয়। ফায়ার সার্ভিসের গত এক দশকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কেবল এগারো বছরে সারা দেশে আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন এক হাজার আটান্ন জন মানুষ এবং আহত হয়েছেন চার হাজারেরও বেশি। তবে এই হিসাব কেবল তাৎক্ষণিক মৃত্যুর খতিয়ান, যার সঙ্গে যুক্ত হয় না পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া মানুষগুলোর বেদনাদায়ক পরিসংখ্যান। প্রশ্ন আজ দেশবাসীর মনে একটাই, একের পর এক এই মানবতাবিরোধী দুর্ঘটনার বা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত দায় আসলে কার।
বেইলি রোডের ট্র্যাজেডির পর সরকারের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি যে প্রতিবেদন পেশ করেছিল, তাতে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে যে এই বিপর্যয়ের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে অন্তত এগারোটি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। রাজউক বা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থা, বিস্ফোরক পরিদপ্তর এবং কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ওপর ন্যস্ত আইনগত দায়িত্ব পালনে চরম উদাসীনতার পরিচয় দিয়ে চলেছে। একটি ভবন নির্মাণের পর নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে আবাসিক ভবনকে বাণিজ্যিক রেস্তোরাঁ বা রাসায়নিক গুদামে রূপান্তর করা হলেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নিয়মিত নজরদারির অভাবে মালিকরা অনায়াসে পার পেয়ে যান। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে ভবনমালিকরা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, ফায়ার এক্সিট বা জরুরি সিঁড়ির ন্যূনতম শর্ত পূরণ না করেই ভবন ভাড়া দেন, যার ফলে সামান্য শর্টসার্কিট বা গ্যাস সিলিন্ডারের লিকেজ মুহূর্তের মধ্যে মহাবিপর্যয় ডেকে আনে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ নোটিশ দেওয়া হলেও একক নির্বাহী ক্ষমতা ও ম্যাজিস্ট্রেসি না থাকার অজুহাতে তারা কার্যকর কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়। এছাড়া তিতাস বা বিদ্যুৎ বিভাগের জরাজীর্ণ তার ও অবৈধ সংযোগের কারণে প্রতিনিয়ত স্ফুলিঙ্গ থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়লেও তাদের তরফ থেকে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কোনো বালাই দেখা যায় না।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, সরকারি উচ্চপর্যায়ের সেই তদন্ত কমিটি প্রতিটি অগ্নিকাণ্ড রোধে সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ পেশ করেছিল, যার মধ্যে স্থানীয় বিট পুলিশিংয়ের আদলে ফায়ার সার্ভিস, রাজউক ও বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘অগ্নিনিরাপত্তা সচেতন কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব অন্যতম ছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে নীতিনির্ধারক মহলের চরম অবহেলায় সেই যুগান্তকারী সুপারিশগুলো আজও ফাইলবন্দী হয়ে পড়ে রয়েছে। মাঠপর্যায়ের প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এসব সুপারিশের কোনো কার্যকারিতা বা রূপরেখা না পৌঁছানোই প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রীয়ভাবে জীবন বাঁচানোর চেয়ে কেবল দায় সারার প্রবণতাই বেশি শক্তিশালী। কেবল আইন প্রণয়ন বা কাগজে-কলমে কমিটি গঠন করলেই এই অভিশাপ থেকে মুক্তি মিলবে না, যতক্ষণ না পর্যন্ত আইনের কঠোর ও দৃশ্যমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়। ফায়ার সার্ভিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যথার্থই বলেছেন যে বিপদ না আসা পর্যন্ত আমরা সেফটি বা নিরাপত্তাকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিতে চাই না। এই আত্মঘাতী মানসিকতার পরিবর্তন না ঘটলে এবং প্রতিটি অবহেলা ও দুর্নীতির জন্য জড়িত অসাধু চক্রকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় না আনলে নিমতলী বা টুপটুপ রিসোর্টের মতো ট্র্যাজেডিগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়বে। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক জীবনের নিরাপত্তা বিধান করা সরকারের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্ব পালনে যেকোনো ধরনের শৈথিল্য কোনোভাবেই ক্ষমাযোগ্য হতে পারে না।