• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৯ অপরাহ্ন
Headline
ইসরায়েলে আরও একটি প্যাট্রিয়ট পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র সাত বছরে ছয় নির্বাচন, কেন থিতু হতে পারছে না ইসরায়েল? ৫৫ বছরে সবজির দাম স্থিতিশীল রাখতে উদ্যোগ নেই: বাণিজ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যখাতে আওয়ামী লীগ সরকার ব্যাপক লুটপাট করেছে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঠাকুরগাঁও উপ-নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই : ইসি সচিব ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ডেভিড ইমন ৭ দিনের রিমান্ডে আগামীতে স্কুল-মাদ্রাসায় একই প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হবে: শিক্ষামন্ত্রী ঢাকা শহরে পদ্মা থেকে ১০০ কোটি লিটার পানি সরবরাহের নতুন প্রকল্প জয়-পুতুলসহ ৮ জনের মামলায় সিআরআইয়ের আয়কর নথি জব্দের আদেশ গুরুদাসপুর থানার ওসি প্রত্যাহার

প্রবাল দ্বীপে বারুদের স্তূপ: অগ্নিঝুঁকিতে সেন্টমার্টিনের আড়াইশ হোটেল-রিসোর্ট

Reporter Name / ৯ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ ও অনন্য পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারের সেন্টমার্টিনে শুরু হতে যাওয়া নতুন পর্যটন মৌসুমের আনন্দঘন আমেজের আড়ালে ঘনীভূত হচ্ছে এক গভীর ও ভয়াবহ আশঙ্কা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আগামী রবিবার থেকে দ্বীপটিতে পর্যটক যাতায়াত শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সেখানকার অগণিত হোটেল, মোটেল, কটেজ ও রেস্তোরাঁর নিরাপত্তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দ্বীপটিতে গড়ে ওঠা আড়াইশরও বেশি বাণিজ্যিক আবাসন ও ভোজনালয়ের একটিরও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র বা লাইসেন্স নেই। এমনকি পরিবেশ অধিদপ্তরের আইনি অনুমোদন ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে এসব স্থাপনা। ইনানীর একটি রিসোর্টে সম্প্রতি সংঘটিত মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের প্রাণহানির শোক কাটতে না কাটতেই সেন্টমার্টিনের এই নগ্ন নিরাপত্তাহীনতা গোটা দেশের পর্যটন শিল্পকে এক মারাত্মক ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

দ্বীপের বর্তমান অবকাঠামোগত চিত্র বিশ্লেষণ করলে যেকোনো সচেতন মানুষের পিলে চমকে যাওয়ার উপক্রম হয়। সেন্টমার্টিনের দক্ষিণপাড়া সৈকতসহ বিভিন্ন পয়েন্টে ইটের গাঁথুনির পাশাপাশি অবাধে ব্যবহার করা হয়েছে কাঠ, বাঁশ, পলিথিন ও অন্যান্য অত্যন্ত দাহ্য স্থানীয় উপকরণ। কোরাল মুন বিচ রিসোর্ট, বেলা ভিস্তা, এল মেরিনা ইকো রিসোর্ট, সিনবাদ এক্সপেরিয়েন রিসোর্ট, স্যান্ড ক্যাসেল রিসোর্ট কিংবা ব্লু মেরিন রিসোর্টের মতো বিলাসবহুল বা মাঝারি মানের স্থাপনোগুলোতে অগ্নিনির্বাপণের কোনো আধুনিক বা প্রাথমিক ব্যবস্থা পর্যন্ত রাখা হয়নি। গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই দ্বীপে অন্তত দেড় শতাধিক নতুন কটেজ ও রিসোর্ট গজিয়ে উঠেছে, যার একটিতেও নেই মানসম্মত পয়োশোধনাগার বা ইটিপি ব্যবস্থা। দুর্ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে ভবন ত্যাগ করার মতো জরুরি নির্গমনপথ বা ফায়ার এক্সিট অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের চরম উদাসীনতা এবং কার্যকর তদারকির অভাবেই মূলত এই অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বাণিজ্যিক কাঠামোগুলো দ্বীপের পরিবেশ ও মানুষের জীবনকে জিম্মি করে ফুলেফেউপে উঠেছে।

অগ্নিনিরাপত্তার এই চরম ঘাটতির পেছনে ভৌগোলিক দূরুত্ব ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সেন্টমার্টিনে হঠাৎ করে কোনো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ফায়ার ইউনিট বা স্টেশন দ্বীপটিতে অদ্যাবধি স্থাপন করা হয়নি। টেকনাফ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেন্টমার্টিনে আগুন লাগার খবর পেলেই মূল ভূখণ্ড থেকে স্পিডবোট ভাড়া করে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছাতে হয়। কিন্তু শীতের এই মৌসুমেও সমুদ্রের আবহাওয়া প্রায়শই উত্তাল থাকে, যার ফলে সময়মতো ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। অতীতেও এর করুণ পরিণতি দেখা গেছে। গত বছরের ১৫ জানুয়ারি ভোরে দ্বীপের পশ্চিম সৈকতের গলাচিপা এলাকায় ভয়াবহ আগুনে পরপর তিনটি রিসোর্টের ২৬টি কক্ষ সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। সে সময় ফায়ার সার্ভিসের অনুপস্থিতিতে স্থানীয় সাধারণ মানুষ সমুদ্রের লোনাজল বালতিতে করে এনে নিজ দায়িত্বে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দ্বীপের তীব্র সমুদ্র বাতাসের কারণে চোখের পলকে সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিদর্শন দল এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সেন্টমার্টিনের প্রতিটি রিসোর্টই ফায়ার সেফটির আন্তর্জাতিক মানদণ্ড লঙ্ঘন করে চলছে। কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক ও উপসহকারী পরিচালকের নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ টিম দ্বীপটির বর্তমান অবস্থা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছে। সমুদ্রের প্রবল ও লোনা বাতাসের কারণে কাঠের ও বাঁশের তৈরি এসব ইকো-রিসোর্টে একবার আগুন লাগলে তা মুহূর্তের মধ্যে দাবানলের মতো আশপাশের জনবসতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানে বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বা এক্সটিংগুইশার, ফায়ার অ্যালার্ম, হোসপাইপ বা পানির কোনো রিজার্ভার রাখা হয়নি। কোরাল মুন বিচ রিসোর্টের মতো দুয়েকটি প্রতিষ্ঠান দায়সারাভাবে নামমাত্র কিছু প্রাথমিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বেশিরভাগ রিসোর্ট মালিক ও ব্যবসায়ী কুলুপ এঁটে বসে আছেন। মাঝেমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর কিছু লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে জরিমানা বা মামলা করলেও বড় কোনো বিপর্যয়ের আগেই সুদূরপ্রসারী ও কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণে সংশ্লিষ্টরা সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন।

পরিবেশগত দিক থেকেও সেন্টমার্টিন দ্বীপটি বর্তমানে এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। দেশের ১৩টি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএভুক্ত এই দ্বীপে অপরিকল্পিতভাবে হোটেল-রিসোর্ট গড়ে ওঠার কারণে এখানকার অনন্য সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও প্রবাল প্রজাতি ধ্বংসের মুখে পড়েছে। দক্ষিণপাড়া সৈকত সংলগ্ন এলাকা সামুদ্রিক কাছিমের প্রজননের জন্য অত্যন্ত পবিত্র ও সংবেদনশীল জোন হিসেবে পরিচিত, কিন্তু সেখানেও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের হিড়িক থামেনি। হাজার হাজার পর্যটকের ভিড় এবং রিসোর্টগুলো থেকে নির্গত অপরিশোধিত মানববর্জ্য ও পচনশীল আবর্জনা সরাসরি মাটি ও সাগরের নোনাপানিতে মিশে পরিবেশের ভারসাম্য চিরতরে নষ্ট করে দিচ্ছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকে আগামী রবিবার থেকে পর্যটক যাতায়াত চালুর ঘোষণা দেওয়া হলেও গত বছরের মতো কঠোর কিছু শর্ত বহাল রাখা হয়েছে। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে দ্বীপে কোনো পর্যটক রাত্রিযাপন করতে পারবেন না এবং কেবল ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে রাতযাপনের সীমিত সুযোগ রাখা হবে। কিন্তু কাগজে-কলমে এই বিধিনিষেধ থাকলেও স্থানীয় ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের যোগসাজশে আইন অমান্য করে রাত্রিযাপনের অবৈধ বাণিজ্য রোধ করা না গেলে দ্বীপের পরিবেশ সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বা বাপা এবং বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে বারবার জোরালো দাবি জানানো হয়েছে যে, পর্যটক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দ্বীপের সার্বিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে। কেবল পর্যটন মৌসুম এলেই লোকদেখানো বৈঠক বা পরিদর্শন না করে, সেন্টমার্টিনের প্রতিটি হোটেল ও রিসোর্টের জন্য ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও পরিবেশের ছাড়পত্র নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হবে, শীত মৌসুমের শুরুতেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সেগুলোর কার্যক্রম চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে দ্বীপের নিজস্ব জনগোষ্ঠীর জীবন এবং দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতি দ্রুত সেন্টমার্টিনেই একটি স্থায়ী ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী ইউনিট স্থাপন করা জরুরি। অন্যথায়, প্রবালদ্বীপের অপরূপ সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই অবহেলা ও বারুদের স্তূপ যেকোনো মুহূর্তে এক ভয়ংকর জাতীয় ট্র্যাজেডিতে রূপ নিতে পারে, যার দায় কোনোভাবেই প্রশাসন এড়াতে পারবে না।

তথ্যসূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category