• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৬ অপরাহ্ন
Headline
ইসরায়েলে আরও একটি প্যাট্রিয়ট পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র সাত বছরে ছয় নির্বাচন, কেন থিতু হতে পারছে না ইসরায়েল? ৫৫ বছরে সবজির দাম স্থিতিশীল রাখতে উদ্যোগ নেই: বাণিজ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যখাতে আওয়ামী লীগ সরকার ব্যাপক লুটপাট করেছে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঠাকুরগাঁও উপ-নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই : ইসি সচিব ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ডেভিড ইমন ৭ দিনের রিমান্ডে আগামীতে স্কুল-মাদ্রাসায় একই প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হবে: শিক্ষামন্ত্রী ঢাকা শহরে পদ্মা থেকে ১০০ কোটি লিটার পানি সরবরাহের নতুন প্রকল্প জয়-পুতুলসহ ৮ জনের মামলায় সিআরআইয়ের আয়কর নথি জব্দের আদেশ গুরুদাসপুর থানার ওসি প্রত্যাহার

নতুন পে-স্কেলের অর্থ জোগাতে রেকর্ড ব্যাংক ঋণ

Reporter Name / ৭ Time View
Update : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রত্যাশিত নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো অনুযায়ী আগামী পহেলা নভেম্বর থেকে বেতন পরিশোধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার | ঠিক এই সময়েই অক্টোবরের মূল বেতনের পাশাপাশি বিগত তিন মাসের নতুন পে-স্কেলের বকেয়া অর্থ একসঙ্গে পরিশোধের বিশাল আর্থিক চাপ সামলাতে গিয়ে সরকারি কোষাগারে তৈরি হয়েছে তীব্র নগদ অর্থের সংকট | আর এই বাড়তি ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে অস্বাভাবিকহারে ঋণ নেওয়া বাড়িয়ে দিয়েছে সরকার | পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জরুরি ও স্বল্পকালীন দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের পাশাপাশি এবার ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম ডাকার মতো নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক | চলতি মাসের শুরু থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নেওয়ার ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নতুন করে নানামুখী উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে |

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, আগামী ১ নভেম্বর রোববার নতুন বেতন কাঠামোর আলোকে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বর্ধিত বেতন ও বকেয়া অর্থ জমা দেওয়া হবে | এই বিপুল পরিমাণ অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করার জন্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম আহ্বান করা হয়, যার মাধ্যমে এক ধাক্কায় ব্যাংক খাত থেকে সরাসরি ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করা হচ্ছে | সাধারণত রাজস্ব আয় ও মাসিক দৈনন্দিন ব্যয়ে কোনো ধরনের সাময়িক ঘাটতি দেখা দিলে এই ধরনের স্বল্পমেয়াদি বিশেষ বিল ছাড়ার প্রয়োজন পড়ে, তবে বর্তমান সরকারের মেয়াদে এর আগে এ ধরনের বিশেষ বিল ইস্যু করার প্রয়োজন হয়নি | এই বিশেষ নিলামের ফলে চলতি অক্টোবর মাসজুড়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ গিয়ে ঠেকেছে রেকর্ড প্রায় ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকায়, যা চলতি অর্থবছরের অন্য যেকোনো মাসের তুলনায় অনেক বেশি এবং দায়িত্ব গ্রহণের পর একমাসের হিসেবে সর্বোচ্চ ঋণ নেওয়ার একটি নতুন রেকর্ড |

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের প্রথম মাস তথা জুলাইয়ে ব্যাংক খাত থেকে ৫৬ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছিল সরকার, এবং পরবর্তী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে যথাক্রমে ৫০ হাজার ও সাড়ে ৪১ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছিল | তবে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের নিলামের মাধ্যমে উত্তোলিত এই সমস্ত ঋণের পুরো অঙ্কটি নিট ঋণের হিসাব নয়, কারণ এর একটি বড় অংশই ব্যয় হয় পূর্বে নেওয়া মেয়াদোত্তীর্ণ বিল ও বন্ডগুলোর অর্থ পরিশোধ বা রি-ইস্যু করার পেছনে | তা সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বা জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকারও বেশি, যার সিংহভাগই জোগান দিয়েছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো | সরকারের ঋণের এই লাগামহীন চাহিদা বৃদ্ধির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আর্থিক বাজারের সুদহারে বা ইল্ড রেটে | গত অক্টোবরের প্রথম দিকে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদের হার বা ইল্ড যেখানে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশে ছিল, তা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে মাসের শেষ দিকে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং একই সঙ্গে বাকি সব মেয়াদের বিল ও বন্ডের সুদের হারও বেশ ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে |

সুদের হার বা ইল্ডের এই ক্রমাগত বৃদ্ধি এমন এক সময়ে ঘটছে যখন দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পরিমাণ অতিরিক্ত বা অলস তারল্য বিরাজ করছে | বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট মাস শেষেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকার মতো, যার একটি বিরাট অংশ অলস অবস্থায় পড়ে রয়েছে | কিন্তু সরকারের বাজেট ঘাটতি ও রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ব্যর্থতার কারণে সেই উদ্বৃত্ত তারল্যের ওপর নির্ভর করেই ঋণ নিতে হচ্ছে প্রশাসনকে | কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন যে, প্রত্যাশা অনুযায়ী জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারছে না বলেই সরকারকে বাধ্য হয়ে ব্যাংক খাত থেকে এই বাড়তি ঋণের জোগান নিতে হচ্ছে | তবে এই নির্ভরতা কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী দিনে শরিয়াহভিত্তিক সুকুক বন্ড চালুর বড় ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যার মাধ্যমে চলতি অর্থবছরেই প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার সুকুক ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে যাতে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের অতিরিক্ত চাপ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হয় |

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল একটি বাজেট ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা | এই বিশাল ঘাটতি মেটানোর জন্য দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত থেকেই ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে | অথচ বাজেট অনুযায়ী এনবিআরকে চলতি অর্থবছরে রেকর্ড ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হলেও অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং পরবর্তী মাসগুলোতেও সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি | এর ওপর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের কারণে সরকারের বার্ষিক পরিচালন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে, যার ফলে বাধ্য হয়েই ব্যাংক ঋণনির্ভরতার দুষ্টচক্রে আটকে পড়তে হচ্ছে সরকারকে | কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, চলতি অক্টোবরে কেবল বিভিন্ন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমেই ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং বিভিন্ন মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে আরও ১৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকারও বেশি ঋণ গ্রহণ করেছে সরকারি কর্তৃপক্ষ |

সরকার যেভাবে বারবার বিশেষ ট্রেজারি বিল ইস্যু করে বেতন-ভাতা পরিশোধের মতো নিয়মিত কাজ পরিচালনা করছে, তাকে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও আর্থিক সক্ষমতার জন্য কোনোভাবেই শুভ লক্ষণ বলে মনে করছেন না দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা | সাবেক অর্থ সচিব এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী মনে করেন যে, সরকার তার নিজস্ব রাজস্ব আয় বৃদ্ধির সক্ষমতা বাড়াতে না পেরে উল্টো নতুন পে-স্কেল ও বড় বড় মেগা প্রকল্পের নামে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে চলেছে | এভাবে চলতে থাকলে আগামী দিনে সরকারের ঋণের বোঝা দ্রুত পাহাড়সম আকার ধারণ করবে এবং এর চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে দেশের বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ আরও বেশি সংকুচিত ও দুর্বল হয়ে পড়বে | বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, সরকার বর্তমানে দেশি-বিদেশী উভয় উৎস থেকে ঋণ নিয়ে পুরনো ঋণ শোধ করার এক বিপজ্জনক চক্রে বা রোলওভার ট্র্যাপে আটকে পড়েছে, কারণ বর্তমান সরকারের রাজস্ব আয়ের যে করুণ দশা, তাতে নির্ধারিত সময়ে এসব ঋণ পরিশোধ করার কোনো আর্থিক সামর্থ্য এই মুহূর্তে তাদের নেই |

বর্তমানে দেশে বেসামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতের বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত স্থায়ী সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখের কাছাকাছি এবং এর পাশাপাশি প্রায় ৯ লাখ ২৫ হাজার নিবন্ধিত পেনশনভোগী রয়েছেন | বর্তমান অর্থবছরের বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন, ভাতা ও পেনشن বাবদ মোট ১ লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার মধ্যে কেবল মূল বেতন বাবদই বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার বেতন কোটি টাকা | আগামী পহেলা নভেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া নতুন বেতন কাঠামোয় সবচেয়ে নিচের গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে | এই নবম পে-স্কেলের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব ব্যয় একলাফে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পাবে | অর্থ মন্ত্রণালয়সংর্কান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমান অবশ্য দাবি করেছেন যে, বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি অত্যন্ত ভঙ্গুর, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বপীড়িত অর্থনীতি গ্রহণ করেছে এবং জিনিসপত্রের চড়া দামের কারণে নির্ধারিত আয়ের চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রা যখন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল, তখন তাদের উৎসাহ ও দক্ষতা বাড়াতে এই পে-স্কেল দেওয়ার বিকল্প সরকারের হাতে ছিল না | তবে ব্যয় বৃদ্ধির এই তীব্র চাপ সফলভাবে সামাল দিতে হলে সরকারকে অবশ্যই যেকোনো মূল্যে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় বাড়ানোর কঠোর পথ বেছে নিতে হবে বলে তিনি স্বীকার করেছেন|

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category