ঢাকার যাতায়াত ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ আধুনিক ও যুগোপযোগী করে তুলতে একসঙ্গে তিনটি নতুন মেট্রোরেল প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু করার এক বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নেওয়া হয়েছে | প্রস্তাবিত এই রুটগুলোর মধ্যে রয়েছে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এমআরটি লাইন-১, হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত লাইন-৫ এর নর্দান রুট এবং গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত বিস্তৃত লাইন-৫ এর সাউদার্ন রুট | সম্প্রতি উত্তরা দিয়াবাড়ীর মেট্রোরেল ভবনে আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে এর মধ্যে লাইন-১ এবং লাইন-৫ নর্দান রুটের গুরুত্বপূর্ণ চারটি নির্মাণ প্যাকেজের আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রকল্প দুটির মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে | বাংলাদেশ সরকার ও জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই মেগা প্রকল্পগুলো দেশের যোগাযোগ খাতে অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটাবে বলে আশা করা হলেও, একই সঙ্গে রাজধানীতে ভয়াবহ যানজট ও তীব্র জনদুর্ভোগের আশঙ্কাও সমানভাবে দানা বাঁধছে |
চুক্তির বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, লাইন-১ প্রকল্পের আওতায় ট্রেন রাখা, মেরামত ও পরিচালনার জন্য ডিপো এলাকায় প্রায় উনপঞ্চাশটি বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলা হবে, যার জন্য সিনোহাইড্রো-এসইবিসিএল যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে | এছাড়া পাতালপথ শেষ হয়ে যেখানে উড়ালপথে উঠবে সেখান থেকে বালু নদী পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ উড়ালপথ এবং জোয়ার সাহারা, বোয়ালিয়া ও মস্তুল স্টেশন নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সিআরইসি-এমআইএল-এমবিইসি যৌথ উদ্যোগকে | অন্যদিকে, লাইন-৫ নর্দান রুটের ডিপো প্যাকেজের জন্য প্রশাসনিক ভবন, নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ও ওয়ার্কশপ নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছে সিপিসি-হানিল যৌথ উদ্যোগ এবং হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজার ও নতুন বাজার থেকে ভাটারা পর্যন্ত সাড়ে ছয় কিলোমিটার উড়ালপথ ও পাঁচটি স্টেশন নির্মাণের কাজটিও দেওয়া হয়েছে সিআরইসি-এমআইএল-এমবিইসিকে | রুটগুলোর বিস্তৃতি দেখলে বোঝা যায় যে, লাইন-১ বিমানবন্দর সড়ক, প্রগতি সরণি, কুড়িল, বাড্ডা ও রামপুরা হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত যাবে, নর্দান রুট হেমায়েতপুর থেকে শুরু হয়ে গাবতলী, মিরপুর, বনানী ও গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে এবং সাউদার্ন রুটটি গাবতলী থেকে শুরু করে কারওয়ান বাজার ও হাতিরঝিল হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত পৌঁছাবে | এই প্রকল্পগুলোর নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৩২ থেকে ২০৩৩ সালের মধ্যে |
কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, পাতাল মেট্রোরেলের টানেল মাটির নিচ দিয়ে খনন করা হবে বিধায় ওপরের প্রধান সড়কে এর নেতিবাচক প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম পড়ার কথা | লাইন-১ এর প্রায় ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার অংশ জুড়েই থাকছে পাতালপথ | তবে স্টেশন ও ডিপো নির্মাণ এলাকা প্রস্তুত করা, মাটির নিচে ঢোকার জন্য গভীর খাদ খোঁড়া এবং মাটির নিচের গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও টেলিফোন লাইনের মতো অতীব জরুরি ইউটিলিটি লাইনগুলো সরাতে গিয়ে বিভিন্ন সড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ বা সরু করতে হবে | আর তখনই প্রধান সড়কগুলোতে তীব্র ব্যারিকেডের সৃষ্টি হবে যা সাধারণ মানুষের চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাবে | এই আশঙ্কার বাস্তব প্রতিফলন এখনই প্রগতি সরণি ও কুড়িল এলাকায় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে আগাম কাজের কারণে সড়কের কার্যকর প্রশস্ততা অনেক কমে গেছে এবং যমুনা ফিউচার পার্ক ও বাড্ডা অঞ্চলে নিত্যদিনের দীর্ঘ গাড়ির সারি জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে |
বুয়েটের বিশিষ্ট অধ্যাপক ও দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান এই ত্রিমুখী মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, ঢাকায় প্রধান সড়কের সংখ্যা এমনিতেই অত্যন্ত সীমিত | এমতাবস্থায় একই সময়ে দুই থেকে তিনটি প্রধান ধমনীতে একসঙ্গে নির্মাণকাজ চললে যানবাহনকে ঘুরিয়ে নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত বিকল্প সড়ক বা বাইপাস পাওয়া যাবে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার | বিপুলসংখ্যক চলমান যানবাহন কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তার জন্য সম্পূর্ণ আলাদা ও সুনির্দিষ্ট একটি ট্রাফিক পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন | বিশেষ করে নর্দান রুটের হেমায়েতপুর-গাবতলী অংশটি সাভার ও উত্তরবঙ্গ থেকে আসা দূরপাল্লার বাস, ভারী ট্রাক এবং খেটে খাওয়া মানুষের অবিরাম চাপে সবসময় মুখরিত থাকে| সেখানে যদি সড়কের প্রশস্ততা কমে যায়, তবে সাভার ও আশুলিয়া থেকে রাজধানী ঢাকায় প্রবেশের ক্ষেত্রে এবং শহরের ভেতরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক অচল অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে|
সাউদার্ন রুটের রুট ম্যাপ অনুযায়ী কল্যাণপুর, শ্যামলী, আসাদ গেট এবং কারওয়ান বাজারের মতো অত্যন্ত ব্যস্ত ও জনবহুল বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর ওপর দিয়ে কাজ পরিচালিত হবে | এই কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক হাবগুলোতে কাজের জন্য জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়লে পুরো মহানগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে | এর আগে এমআরটি লাইন-৬ নির্মাণের সময় মিরপুর, ফার্মগেট ও মতিঝিল এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে চলা যানজট, চারদিকের অসহনীয় ধুলাবালি এবং ফুটপাত বন্ধ থাকার কারণে নগরবাসীকে যে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল, নতুন এই তিনটি প্রকল্প একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে সেই পুরোনো ও ভয়ংকর অভিজ্ঞতাই আবার ফিরে আসতে পারে | একটি রুটের কাজ আটকে গেলে বা জট লাগলে তার চাপ আশপাশের বিকল্প সড়কগুলোতেও সংক্রমিত হয়ে পুরো শহরকে স্থবির করে তুলতে পারে|
তবে এই জনদুর্ভোগের আশঙ্কা উড়িয়ে না দিয়ে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড বা ডিএমটিসিএল দাবি করেছে যে, এমআরটি লাইন-৬ নির্মাণের সফল অভিজ্ঞতাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত সুচারুভাবে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সাজানো হচ্ছে | সাউদার্ন রুটের প্রকল্প পরিচালক সেখ খলিলুর রহমান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, নির্মাণকাজের সময় যানজট ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে বিশেষ ট্রাফিক পরিকল্পনা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে | আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় টপ-ডাউন পদ্ধতিতে কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে এবং যেসব স্থানে তীব্র যানজটের আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে বিকল্প সড়ক তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে | এছাড়া মেট্রো স্টেশনগুলোর প্রবেশ ও বহির্গমন পথও ব্যস্ত সড়ক থেকে কিছুটা দূরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে যাতে সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন না ঘটে | সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হকও নির্মাণকাজে গুণগত মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই আপস না করার এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন | পরিশেষে বলা যায়, ত্রিমুখী মেট্রোরেলের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষ পর্যন্ত নগরবাসীর জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে কি না, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে যথাযথ ট্রাফিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং কর্তৃপক্ষের নিখুঁত তদারকির ওপর|
তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা