স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়ন ও চিকিৎসার ব্যয় সংকোচনের বৈশ্বিক ধারার বিপরীতে গিয়ে তিন দশক আগের পুরোনো নীতিমালায় ফিরেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ঔষধ প্রশাসন। ১৯৯৪ সালের গেজেট অনুযায়ী নির্ধারিত ১১৭টি ওষুধের ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ তালিকা’ পুনরায় বলবৎ করা হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সরকারের নির্ধারিত এই তালিকায় থাকা মোট ১১৭টি ওষুধের মধ্যে বর্তমানে বাজারে নিয়মিত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৬০টির। বাকি ৫৭টি জীবনরক্ষাকারী ও অতিপ্রয়োজনীয় ওষুধ কার্যত বাজার থেকেই উধাও হয়ে গেছে। ফলে একদিকে সরকার যে তালিকা দিয়ে চিকিৎসা ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চাইছে, তার প্রায় অর্ধেকাংশই আজ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। অন্যদিকে বাধ্য হয়ে চড়া মূল্যের বিকল্প ব্র্যান্ডের ওষুধ কিনতে গিয়ে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ বেড়ে চরম মানবিক বিপর্যয় তৈরি করছে।
রাজধানীর প্রধান প্রধান পাইকারি ও খুচরা ওষুধের বাজার যেমন—মিটফোর্ড, শাহবাগ, কলাবাগান এবং গুলশান এলাকার অন্তত আটটি বড় ফার্মেসিতে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণ করে এই ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে। ফার্মেসি মালিক ও বিক্রেতারা জানিয়েছেন, তালিকায় উল্লিখিত ৫৭টি ওষুধ তারা দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানিগুলো থেকে সরবরাহ পাচ্ছেন না। চিকিৎসকরা এসব উপাদান ব্যবস্থাপত্রে লিখলেও রোগীরা দোকানে এসে ওষুধ খুঁজে পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে রোগীদের অনেক বেশি মূল্যের নতুন প্রজন্মের বা বিকল্প ফর্মুলেশনের ওষুধ ক্রয় করতে হচ্ছে।
বাজারে অনুপস্থিত থাকা ওষুধের তালিকাটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এগুলোর প্রায় প্রতিটিই সাধারণ মানুষের জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এর মধ্যে রয়েছে তীব্র ও অসহনীয় ব্যথা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইনজেকশন পেথিডিন। মানসিক রোগের চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত ওষুধ ক্লোরপ্রোমাজিন ও প্রোক্লোরপেরাজিনও বাজারে অমিল। সংক্রামক ব্যাধি ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় জীবন রক্ষায় ব্যবহৃত ক্লোরোকুইন, কুইনাইন, মেফ্লোকুইন ও পাইরিমেথামিন-সালফাডক্সিনের মতো ওষুধের কোনো সরবরাহ নেই। যক্ষ্মা নিরাময়ের প্রধান ভিত্তি ইথামবিউটল ও আইসোনিয়াজিড এবং কুষ্ঠ রোগের কার্যকর প্রতিষেধক ক্লোফাজিমিন ও ড্যাপসোন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগ যেমন টাইপ-২ ডায়াবেটিসের প্রাথমিক ও অত্যন্ত সাশ্রয়ী ওষুধ গ্লিবেনক্লামাইড এবং উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের জরুরি ওষুধ নিফেডিপিন, মেথাইলডোপা, বেন্ড্রোফ্লুয়াজাইড ও আইসোসরবাইড ডাইনাইট্রেট বাজার থেকে প্রায় পুরোপুরি প্রত্যাহার হয়ে গেছে।
সংকটের গভীরতা এখানেই শেষ নয়; প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অতি গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক যেমন ক্লক্সাসিলিন, অ্যামক্সিসিলিন, অ্যাম্পিসিলিন, ক্লোরামফেনিকল এবং কয়েক ধরনের পেনিসিলিন বাজারে মিলছে না। ফলে প্রাথমিক অ্যান্টিবায়োটিক না পেয়ে চিকিৎসকদের বাধ্য হয়ে উচ্চমাত্রার ও ব্যয়বহুল অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করতে হচ্ছে, যা রোগীর পকেট কাটার পাশাপাশি দেশে মারাত্মক ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স’ তৈরি করছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, সাপের কামড়ে মানুষের জীবন বাঁচানোর একমাত্র মাধ্যম ‘পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম’ এবং প্রসবকালীন অতিরিক্ত রক্তপাত বন্ধ করে মাতৃমৃত্যু রোধের জরুরি ওষুধ ‘অক্সিটোসিন’ ও ‘এরগোমেট্রিন’ বাজারে সহজলভ্য নয়। এছাড়া শিশুদের ডিপথেরিয়া, টিটেনাস, পোলিও, হামের টিকা এবং যক্ষ্মা শনাক্তকরণের টিউবারকিউলিন টেস্ট কিটেরও সংকট রয়েছে।
আইন অনুযায়ী, দেশের অনুমোদিত ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তাদের মোট উৎপাদনের অন্তত ৩০ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় তালিকার ওষুধ উৎপাদন করা বাধ্যতামূলক। তবে গত তিন দশকে এই আইনি বাধ্যবাধকতা কখনোই কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে অতীতে এই বাধ্যবাধকতা কার্যকর করতে তদারকি করা হয়নি। কোম্পানিগুলো অধিক মুনাফার আশায় হাইটেক ও আধুনিক ব্র্যান্ডেড ওষুধ উৎপাদনে বেশি উৎসাহী হলেও সাধারণ মানুষের অতিপ্রয়োজনীয় সাশ্রয়ী ওষুধ উৎপাদনে চরম অবহেলা প্রদর্শন করে আসছে। বর্তমানে দেশে অনুমোদিত ৩০১টি অ্যালোপ্যাথিক কারখানার মধ্যে ১৫০ থেকে ২০০টি নিয়মিত ওষুধ উৎপাদন করলেও অনেকেই মুনাফা কম থাকায় কম দামের জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। অনেকে আবার তালিকাভুক্ত সাধারণ জেনেরিক নাম বাদ দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মনগড়া ব্র্যান্ডের নামে ওষুধ তৈরি করছে, যার ফলে ফার্মেসির বিক্রেতারাও সরকারি তালিকার নামের সাথে মিল খুঁজে পান না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) বৈশ্বিক মানদণ্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সংস্থাটি প্রতি দুই বছর পর পর আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি অনুযায়ী তাদের মডেল তালিকা হালনাগাদ করে। ১৯৭৭ সালে প্রায় ২০০টি ওষুধ নিয়ে শুরু হওয়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায় বর্তমানে ৫২৩টি ওষুধ রয়েছে এবং বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশ এটি অনুসরণ করে। কিন্তু বাংলাদেশ দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে ১৯৯৪ সালের ১১৭টি ওষুধের তালিকাতেই স্থবির হয়ে ছিল। ২০০৮ সালে ২০৯টি এবং ২০১৬ সালে ২৮৫টি ওষুধের তালিকা করা হলেও তা পুরোপুরি কার্যকর করা হয়নি। অতি সম্প্রতি ২০২৬ সালের শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকার তালিকাটি যুগোপযোগী করে ২৯৫টিতে উন্নীত করেছিল। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক ও আইনি জটিলতার অজুহাত দেখিয়ে সেই আধুনিক তালিকা বাতিল করে পুনরায় ১৯৯৪ সালের ১১৭ ওষুধের অ্যানালগ তালিকায় ফিরে যাওয়া হয়েছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা এক চরম আত্মঘাতী ও পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা ব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে তালিকা আধুনিকায়ন করা ছিল সময়ের দাবি। কোনো যথাযথ রিভিউ কমিটি বা অংশীজনদের সাথে আলোচনা না করে হুট করে আধুনিক তালিকা বাতিল করে ৩০ বছর আগের তালিকায় ফেরা সরাসরি জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী। দেশে বর্তমানে চিকিৎসায় খরচের প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৮০ টাকাই রোগীকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয় এবং এর সিংহভাগই ব্যয় হয় ওষুধ ক্রয়ে। অর্থনীতিবিদদের হিসাব মতে, দেশে বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার ওষুধ কেনাবেচা হয়, যার মধ্যে ৩৫ হাজার কোটি টাকাই খরচ করে সাধারণ জনগণ। সরকার যদি আধুনিক ওষুধগুলোর দাম নিয়ন্ত্রণ করত এবং বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করত, তবে প্রতিযোগিতা বেড়ে ওষুধের দাম কমত এবং মানুষের আর্থিক বোঝা লাঘব হতো।
অথচ অভ্যন্তরীণ বাজারে এই হাহাকারের বিপরীতে দেশের ওষুধ উৎপাদন খাত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক অভূতপূর্ব সাফল্য প্রদর্শন করছে। অভ্যন্তরীণ ওষুধ বাজারের আকার বর্তমানে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং স্থানীয় চাহিদার ৯৮ শতাংশই মেটাচ্ছেন দেশীয় উৎপাদকরা। আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশি ওষুধের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। গত এক দশকে ওষুধ রফতানি ৮৯ মিলিয়ন ডলার থেকে প্রায় ১৬৭ শতাংশ বেড়ে ২৩৮ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, যুক্তরাষ্ট্র, কম্বোডিয়া, আফগানিস্তান, কেনিয়া ও যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের ১৩২টি দেশে বাংলাদেশের ওষুধ নিয়মিত রফতানি হচ্ছে। দেশে বর্তমানে এক হাজার ৪০০ জেনেরিক ওষুধের বিপরীতে ৪৫ হাজারেরও বেশি নিবন্ধিত ব্র্যান্ডের উপস্থিতি রয়েছে।
রফতানি ও বাণিজ্যিক উৎপাদনে দেশের ওষুধ শিল্পের এমন বৈপ্লবিক উত্থান নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় হলেও, দেশের সাধারণ নাগরিকদের জীবনরক্ষাকারী সাশ্রয়ী ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত না হওয়া চরম নীতিগত ব্যর্থতারই প্রমাণ দেয়। বিশেষজ্ঞদের দাবি, কোনো নির্দিষ্ট স্বার্থান্বেষী মহলের চাপে নতি স্বীকার না করে সরকারকে অবিলম্বে ২০২৬ সালের আধুনিক অত্যাবশ্যকীয় তালিকা পুনর্বহাল করতে হবে। একই সাথে জেনেরিক নামে ওষুধ বিপণন বাধ্যতামূলক করা, ওষুধ কোম্পানিগুলোর ৩০ শতাংশ উৎপাদন সীমা কঠোরভাবে মনিটরিং করা এবং জীবনরক্ষাকারী ৫৭টি ওষুধের দেশীয় উৎপাদন অবিলম্বে নিশ্চিত করে বাজারে সরবরাহ ফিরিয়ে আনাই এখন স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রধানতম অগ্রাধিকার।