রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঢাকার রাজনৈতিক অঙ্গনে বইতে শুরু করেছে আগাম ভোটের হাওয়া। স্থানীয় সরকার কাঠামোর এই শীর্ষ লড়াইয়ে এবার দৃশ্যপটে হাজির হয়েছে প্রধান তিন রাজনৈতিক শক্তির এক জটিল ও বহুমাত্রিক সমীকরণ। দলগতভাবে এবার জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তরুণ নেতৃত্বকে সামনে এনে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে প্রথম চমক সৃষ্টি করেছে। তাদের এই সরাসরি চ্যালেঞ্জের বিপরীতে ভোটের মাঠের দুই প্রভাবশালী শক্তি—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও বসে নেই। বিদ্যমান আইনি বাধ্যবাধকতায় নির্বাচনটি নির্দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়ায় দল দুটি সরাসরি দলীয় প্রতীকে প্রার্থী ঘোষণা না করলেও, নিজস্ব ছকে পছন্দের প্রার্থীদের পেছনে সাংগঠনিক শক্তির পূর্ণ সমর্থন ঢেলে দেওয়ার রণকৌশল চূড়ান্ত করেছে। ফলে ব্যালট পেপারে কোনো দলীয় প্রতীকের উপস্থিতি না থাকলেও, মাঠের লড়াইয়ে এই তিন দলের সমর্থন ও সাংগঠনিক সক্ষমতাই মূলত নগরপিতা নির্ধারণের প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠছে।
বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে যে, ঢাকার দুই সিটিতে তারা দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদেরই পছন্দের শীর্ষে রেখেছে। উত্তর সিটিতে জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম খান এবং দক্ষিণে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাবেক শীর্ষ নেতা ও সিটি করপোরেশনের প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত মেয়র মো. আবদুস সালামের ওপরই কার্যত ভরসা রাখছে দলটি। কাকতালীয় নয় বরং সুদূরপ্রসারী কৌশলের অংশ হিসেবেই গত ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপনে এই দুই নেতাকে যথাক্রমে উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। দায়িত্ব গ্রহণের সময় থেকেই তাদের নাগরিক সেবার মানোন্নয়নের পাশাপাশি নির্বাচনি মাঠের প্রাথমিক প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়ার অলিখিত বার্তা দেওয়া হয়। দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আবদুস সালাম বিষয়টি অকপটে স্বীকার করে জানিয়েছেন যে, একসময়ের স্থবির ও নির্জীব সংস্থাকে গতিশীল করার মাধ্যমে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তিনি সার্বিকভাবে ভোটের মানসিক প্রস্তুতিও চালিয়ে যাচ্ছেন। দলগতভাবে কোনো একক নাম এখনো ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা না করা হলেও, তৃণমূলের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের জরিপ শেষে এই দুই নেতার সমর্থনে দল পুরোপুরি মাঠে নামবে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও ঢাকার রাজনীতিতে তাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের স্পষ্ট স্বাক্ষর রাখতে চাইছে। অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের ভিত্তিতে উত্তরের জন্য তারা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) বর্তমান ভিপি মো. আবু সাদিককে (সাদিক কায়েম) পছন্দের প্রার্থী হিসেবে প্রায় চূড়ান্ত করেছে। সেলিম উদ্দিন বিগত দিনগুলোতে উত্তর সিটির পাড়া-মহল্লায় সেবামূলক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করে শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছেন। বিপরীতে, ছাত্ররাজনীতির জাতীয় পরিচিতি এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তরুণ ভোটারদের কাছে পরিচিত মুখ সাদিক কায়েমকে দক্ষিণে সমর্থন দিয়ে জামায়াত এক বড় ধরনের রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সোমবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান যে, তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং উত্তরে সেলিম উদ্দিন ও দক্ষিণে সাদিক কায়েমকেই দলের পছন্দ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রচলিত এই দুই ধারার বিপরীতে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মেরুকরণ তৈরি করেছে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গত রোববার দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সরাসরি সংবাদ সম্মেলন করে উত্তরের জন্য আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণের জন্য নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। এর মধ্য দিয়ে আসিফ মাহমুদের সরাসরি ভোটের রাজনীতিতে প্রথম অগ্নিপরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আবারও ব্যালটের লড়াইয়ে নামছেন। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে দুজনই নিজেদের ভোটার এলাকা পরিবর্তন করে যথাক্রমে উত্তর সিটির ৩৭ নম্বর এবং দক্ষিণ সিটির ২১ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি নির্বাচনি প্রস্তুতিরই প্রমাণ দেয়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা এই ত্রিমুখী লড়াইকে ঢাকার রাজনীতিতে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পালাবদল হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, তিন দলের প্রার্থী বাছাইয়ের ধরনে তিনটি সুস্পষ্ট দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে। বিএনপি যেখানে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, রাজপথের পরিচিতি ও স্থানীয় সরকার পরিচালনার অতীত ট্র্যাক রেকর্ডকে পুঁজি করছে; জামায়াতে ইসলামী সেখানে দক্ষ নগর নেতৃত্ব ও ছাত্ররাজনীতির নতুন ধারার সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে। আর এনসিপি পুরোপুরি নির্ভর করছে জুলাইয়ের গণ-আকাঙ্ক্ষা এবং তরুণদের রাজনৈতিক পরিবর্তনের শক্তির ওপর।
দলীয় প্রতীকবিহীন এই নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ইমেজ, নাগরিক সংকটের কার্যকর সমাধানের প্রতিশ্রুতি এবং বড় দলগুলোর নীরব সমর্থনের কার্যকারিতার ওপর। নগরবাসী কি প্রতিদিনের যানজট, জলাবদ্ধতা ও মশার উপদ্রব থেকে মুক্তি পেতে পুরনো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ওপর ভরসা রাখবেন, নাকি নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে ঢাকার মসনদে বসাবেন—সেই উত্তরই মিলবে আসন্ন দুই সিটি করপোরেশনের বহুল প্রতীক্ষিত এই ব্যালটযুদ্ধে।