যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যকার চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চরম অস্থিরতা ও আতঙ্ক বিরাজ করলেও, এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে। যুদ্ধপরিস্থিতির এই ডামাডোলের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, চলতি মার্চ মাসের প্রথম ১১ দিনেই দেশে ১৯২ কোটি মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যার মধ্যে কেবল ১১ মার্চ এক দিনেই এসেছে ১৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার। গত বছরের ঠিক একই সময়ে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ১৩৩ কোটি ডলার, যার অর্থ হলো বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও রেমিট্যান্স প্রবাহ এক লাফে ৪৪ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
জনশক্তি রপ্তানি খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে প্রবাসীদের মধ্যে এক ধরনের গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক কাজ করছে। ইরানি হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বহুজাতিক ব্যাংক ও কোম্পানিগুলো তাদের কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়ায় অনেক প্রবাসী ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কথা ভেবে নিজেদের জমানো সঞ্চয় দ্রুত দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এই আতঙ্কের পাশাপাশি আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মুস্তাফা কে মুজেরী জানিয়েছেন, ঈদ এবং আতঙ্কের এই সমন্বিত প্রভাবেই মূলত হঠাৎ রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা তৈরি হয়েছে। তবে এই প্রবণতাকে অস্থায়ী উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেছেন যে, চলমান যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থানরত শ্রমিকদের পাশে সরকারকে এখনই দাঁড়াতে হবে। যুদ্ধ শেষে এসব দেশের পুনর্গঠন কাজে প্রচুর নতুন শ্রমিকের প্রয়োজন হবে, যা কাজে লাগাতে বাংলাদেশকে এখন থেকেই কৌশলগত প্রস্তুতি নিতে হবে।
প্রবাসী আয়ের এই আকস্মিক ও শক্তিশালী উল্লম্ফন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে বেশ শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট দুই হাজার ৪৩৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ের (এক হাজার ৯৮২ কোটি ডলার) তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। এই বিপুল পরিমাণ প্রবাসী আয়ের ওপর ভর করে ১১ মার্চ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৪২৯ কোটি ডলারে (৩৪ দশমিক ২৯ বিলিয়ন)। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী বর্তমানে এই ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের পরিমাণ দুই হাজার ৯৫৬ কোটি (২৯ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন) ডলার।
মধ্যপ্রাচ্যে রেমিট্যান্স আসার মূল কেন্দ্রগুলো এখন মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আর্থিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার কড়া বার্তার পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইসহ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ঝুঁকি এড়াতে মার্কিন ব্যাংক সিটি গ্রুপ তাদের দুবাই কার্যালয় খালি করে কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাদের একটি ছাড়া বাকি সব শাখা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। একইভাবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এবং এইচএসবিসি ব্যাংকও কাতারসহ বিভিন্ন দেশে তাদের শাখাগুলো বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। নিরাপত্তার এই চরম অবনতির আশঙ্কায় পিডব্লিউসির মতো আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোও সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও আমিরাতে তাদের কার্যালয় আপাতত বন্ধ রেখেছে। এর পাশাপাশি মেটা, গুগল, অ্যামাজন এবং এনভিডিয়ার মতো শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও দুবাই, কুয়েত, বাহরাইন, তুরস্ক ও ইসরায়েলে তাদের আঞ্চলিক কার্যালয়গুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়ে কর্মীদের নিরাপদে থাকার নির্দেশনা দিয়েছে।