• বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৭ অপরাহ্ন
Headline
ক্যানসার নিয়ন্ত্রণে নীতিগত রূপান্তরের তাগিদ হামের উপসর্গে আরো ছয় শিশুর মৃত্যু প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে বিশেষায়িত আদালত গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে: আইনমন্ত্রী তিনি একদম ঠিক আছেন: ইউনূস সেন্টার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরো ৯ জনের মৃত্যু ইরানি নেতাদের হত্যা করার ক্ষেত্রে আমরা হয়তো অনেকদূর চলে গেছি: ট্রাম্প জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে: এলজিআরডি মন্ত্রী রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা: আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তদন্ত করছে সৌদি আরব প্লাস্টিক দূষণ রোধে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই : পরিবেশমন্ত্রী জাতীয় তথ্যচিত্রে মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি ৯০ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস অন্তর্ভুক্তে গুরুত্বারোপ

উচ্চশিক্ষিত মেধাবীদের ধরে রাখতে পারছে না বাংলাদেশ

Reporter Name / ৭০ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬

উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রতিবছর বাংলাদেশের হাজার হাজার তরুণ শিক্ষার্থী বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, তাদের একটি বড় অংশই পড়াশোনা শেষ করে আর স্বদেশে ফিরে আসছেন না। উন্নত ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ। গবেষণার বিস্তৃত সুযোগ, আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো এবং স্থায়ী বসবাসের সুযোগের টানে তারা বিদেশেই নিজেদের স্থায়ী ক্যারিয়ার গড়ে তুলছেন। এর ফলে বাংলাদেশের প্রদীপ জ্বলছে প্রবাসে; দেশের তরুণ মেধাবীদের আলোয় আলোকিত হচ্ছে বিদেশের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, হাসপাতাল ও বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে, নিজ দেশে গবেষণার সীমিত সুযোগ, উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট, অনিরাপদ সামাজিক পরিবেশ এবং মেধার সঠিক মূল্যায়নের অভাবের কারণে তরুণদের মাঝে দেশে ফেরার আগ্রহ দিন দিন কমছে। এই সীমাবদ্ধতার ফলে উচ্চশিক্ষিত মানবসম্পদের একটি বিশাল অংশ বিদেশে স্থায়ী হয়ে যাওয়ায় দেশে মেধা পাচারের (ব্রেন ড্রেন) আশঙ্কা আরও প্রকট ও দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিচ্ছে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের মেধা পাচার রোধ এবং প্রবাসে থাকা মেধাবীদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া বা ‘রিভার্স ব্রেন ড্রেন’ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছিল। বিদেশের বিভিন্ন নামকরা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত কিছু বাংলাদেশির দেশে ফেরার প্রাথমিক আগ্রহ সে সময় নতুন আশার জন্ম দিলেও বাস্তবে সেই প্রবণতা এখনো দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাড়ি জমানো শিক্ষার্থীর সংখ্যা যেমন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, ঠিক তেমনই পড়াশোনা শেষে সেখানে স্থায়ী হওয়ার প্রবণতাও ঊর্ধ্বমুখী। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যবর্তী এক দশকে বিদেশে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৫২ হাজারে পৌঁছেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশে শিক্ষা খাতে বাংলাদেশিদের ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৮ হাজার ৭৯ কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ।

বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঠিক কতজন দেশে ফিরে আসেন, সে বিষয়ে সরকারের কেন্দ্রীয় কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে সরকারি চাকরিজীবী, শিক্ষক ও সরকারি কর্মকর্তারা সাধারণত নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে শিক্ষা ছুটি নিয়ে বিদেশে যান এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশে ফিরে কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকে। এই বিশেষ শ্রেণির ক্ষেত্রে বিদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার হার তুলনামূলক কম, যা সংশ্লিষ্টদের মতে মাত্র ২০ শতাংশের কাছাকাছি। তবে এই বাধ্যবাধকতার মধ্যেও ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। যেমন সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩২ জন শিক্ষক পিএইচডি ডিগ্রির জন্য বিদেশে গেলেও তাদের মধ্যে ২৮ জন শিক্ষক আর দেশে ফিরে আসেননি। অন্যদিকে, যারা সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ বা ব্যক্তিগত অর্থায়নে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যান, তাদের ক্ষেত্রে বাস্তব চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং আশঙ্কাজনক। উন্নত কর্মসংস্থান ও স্থায়ী বসবাসের উজ্জ্বল সম্ভাবনার কারণে এই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ৬০ শতাংশেরও বেশি পড়াশোনা শেষে আর কখনোই দেশে ফিরে আসে না বলে খাত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ মনে করেন, উচ্চশিক্ষার জন্য তরুণদের বিদেশে যাওয়া কোনো সমস্যা নয়, বরং এটি একটি বড় জাতীয় সম্পদে পরিণত হতে পারে যদি তাদের সেই অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানোর মতো উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা যায়। দেশে যদি আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হয়, তবে তরুণদের এই বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা, মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন, গবেষণার পূর্ণ স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে তরুণ প্রজন্মের জন্য আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন স্টার্টআপ, উদ্ভাবন ও গবেষণাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, নীতিগত রাষ্ট্রীয় সহায়তা এবং দেশীয় বাজারে প্রবেশের সহজ সুযোগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সব নামিদামি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের মেধাবী তরুণরা অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আল আমিন হোসেন বর্তমানে বিশ্বখ্যাত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজনে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত। শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগলে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী রিচিতা খন্দকার রিফাত। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আনামিকা আহমেদ মাইক্রোসফটে সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নিয়োজিত আছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী গাজী মোহাইমিন ইকবাল মেটা এবং ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) শিহাব রশিদ অ্যাপলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত রয়েছেন। বিদেশে থাকা এসব বাংলাদেশি গবেষক ও প্রকৌশলীদের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, তাদের দেশে ফিরে না আসার সিদ্ধান্তটি কেবল বেশি বেতনের জন্য নয়, এটি মূলত দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত নিরাপত্তা, গবেষণার আধুনিক সুযোগ এবং উন্নত জীবনমানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যুক্তরাজ্যে কর্মরত সাইদুর রহমান এবং যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সায়েন্সে উচ্চশিক্ষা নেওয়া মো। ইউসুফের মতো তরুণরা জানান, বাংলাদেশে যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের পরিবেশ ও মানসম্মত বেতন-ভাতা না থাকায় তারা প্রবাসে ক্যারিয়ার গড়ছেন, তবে দেশের পরিবেশ উন্নত হলে ভবিষ্যতে ফেরার বিষয়টি তারা বিবেচনা করবেন।

শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে, উন্নত দেশগুলো যেমন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও জার্মানি সুপরিকল্পিতভাবে তাদের অভিবাসন নীতি শিথিল করে বিশ্বের সেরা মেধাবীদের আকৃষ্ট করছে, কারণ আধুনিক জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে গবেষণা ও উদ্ভাবনই সবচেয়ে বড় সম্পদ। ব্রেন ড্রেনের এই ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর, যা দেশের স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও গবেষণায় দক্ষ জনশক্তির এক বড় ঘাটতি তৈরি করে। অর্থনীতির পরিভাষায় এটিকে ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল লস’ বলা হয়, যেখানে রাষ্ট্রের বিপুল বিনিয়োগে তৈরি হওয়া দক্ষ মানবসম্পদের চূড়ান্ত সুফল অন্য দেশগুলো ভোগ করে থাকে। অথচ বিশ্ব ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরও একসময় একই সংকটে পড়েছিল। কিন্তু তারা দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নীতি, আইআইটিতে রিসার্চ পার্ক স্থাপন, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস চালু, আকর্ষণীয় ফেলোশিপ ও ‘স্টার্ট-আপ ইন্ডিয়া’ বা বিশেষ ট্যালেন্ট প্রোগ্রামের মাধ্যমে ব্যাপক বিনিয়োগ করে বিদেশফেরত গবেষকদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে এই সংকট দূর করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের মেধা ধরে রাখতে হলে শুধু দেশপ্রেমের ফাঁকা আহ্বান জানালে চলবে না, প্রয়োজন উন্নত গবেষণা অবকাঠামো এবং প্রতিযোগিতামূলক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। এই বাস্তবতায় বর্তমান সরকার এখন ‘ব্রেন ড্রেন’ বা মেধা পাচার বন্ধ করে এটিকে ‘ব্রেন সার্কুলেশন’ বা মেধার আবর্তনে রূপান্তর করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। সম্প্রতি সরকারের শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড। আ ন ম এহছানুল হক মিলন এ বিষয়ে বলেন, উচ্চশিক্ষা অর্জনে বিদেশে যাওয়া তরুণদের ফিরে এসে দেশের সেবায় কাজ করার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা হবে। তিনি ঘোষণা করেন যে, ‘ব্রেন ড্রেন নয়, রিভার্স ব্রেন ড্রেন’ করতে হবে, যাতে আমাদের সন্তানরা বাইরে গিয়ে উচ্চশিক্ষিত হয়ে আবার দেশে ফিরে এসে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। একই প্রতিশ্রুতির কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, সরকার প্রবাসে থাকা দক্ষ গবেষক ও একাডেমিকদের জয়েন্ট রিসার্চ ও শর্ট কোর্সের মাধ্যমে দেশের বর্তমান গবেষণাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার নানা কার্যকর উদ্যোগ হাতে নিয়েছে, যা দেশের শিক্ষা খাতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category