কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি আজ বিশ্বজুড়ে দৈনন্দিন কাজ, কোডিং কিংবা যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভাবনীয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জেনারেটিভ এআই বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো চোখের পলকে সঠিক উত্তর তৈরি করে দিলেও, এই সিস্টেমগুলোকে নির্ভুল ও জনবান্ধব করার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছেন বিশ্বের হাজার হাজার ‘ডেটা অ্যানোটেটর’ ও ‘এআই ট্রেইনার’। বিশ্বমানের এআই মডেলগুলোর ডেটা সঠিক সংকেতে রূপান্তর করা, সম্ভাব্য ক্ষতিকর তথ্য ছাঁটাই এবং ভুল বার্তা শুধরে দেওয়ার মতো জটিল দায়িত্ব নিরবে সামলে যাচ্ছেন বাংলাদেশের একদল তরুণ পেশাজীবী। বৈশ্বিক অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং বাজারের বড় অংশ দখলকারী বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ছয় লাখের বেশি ফ্রিল্যান্সার রয়েছে, যারা দেশের অর্থনীতিতে শত শত মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা যোগ করছেন।
ডেটা লেবেলিং বা অ্যানোটেশনের মূল কাজ কেবল ছবি বা অডিও ট্যাগিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক পরাশক্তি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা তরুণ তাওসিফ নিলয়ের মতো অ্যানোটেটররা মডেলগুলোর নিরাপত্তামূলক সক্ষমতা পরীক্ষার কাজ বা ‘রেড-টিমিং’ পরিচালনা করেন। এতে এআই মডেলগুলো যাতে কোনো ধরনের সাইবার আক্রমণ, কোড ইনজেকশন বা বিভ্রান্তিকর সাইবার নীতিবিরোধী তথ্যের প্রভাবে ভুল দিকনির্দেশনা না দেয়, তা পরীক্ষা করা হয়। বৈশ্বিক গবেষণা সংস্থাগুলোর উপাত্তে স্পষ্ট দেখা গেছে যে, আন্তর্জাতিক ডেটা অ্যানোটেশন টুলের বাজার বিশ্বজুড়ে এক বিশাল অর্থনৈতিক দিগন্ত তৈরি করছে এবং বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষা অনুসারে বর্তমানে বিশ্বের কোটিতে কোটিতে তরুণ এই অনলাইন কনটেন্ট রিভিউ ও লেবেলিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যুক্ত হচ্ছেন। কম্পিউটার সায়েন্স বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা এই ক্ষেত্রটিকে বিপিও খাতের আধুনিক রূপ হিসেবে উল্লেখ করলেও, এখানে টিকে থাকতে গভীর কারিগরি দক্ষতা ও উচ্চশিক্ষার তাগিদ দিয়েছেন।
সম্ভাবনার এই উজ্জ্বল জোয়ারের সমান্তরালে আড়ালে ঢাকা পড়েছে চরম মজুরি বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও গবেষণার নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় যে, পশ্চিমা আমেরিকান আউটসোর্সিং কোম্পানিগুলো এআই অ্যানোটেশনের জন্য ঘণ্টায় উচ্চ বাজেট রাখলেও, এশীয় ও আফ্রিকান অঞ্চলের কর্মীরা পান তার সামান্য অংশ। এছাড়া সাধারণ মানের ডেটা লেবেলিং বা ফিল্টারিং কাজ খুব সহজে স্থানান্তরযোগ্য হওয়ায়, ফ্রিল্যান্সারদের দরকষাকষির সক্ষমতা থাকে খুবই নগণ্য। একই সাথে এআই প্রতিনিয়ত নিজেই নিজের স্বয়ংক্রিয় অ্যানোটেশন সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়ে উঠায়, সাধারণ এবং একঘেয়ে পুনরাবৃত্তিমূলক কাজে যুক্ত ফ্রিল্যান্সারদের চাকরি হারানোর মারাত্মক ঝুঁকি প্রবল হয়ে উঠেছে।
পেশাগত উৎকর্ষ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফ্রিল্যান্সার ফারদিন জারিফের মতো অনেকে যখন আকস্মিক ছাঁটাইয়ের শিকার হয়ে বিপাকে পড়ছেন, তখন সচেতন বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যতের কৌশলগত পরিবর্তনের জোর তাগিদ দিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের সুস্পষ্ট বার্তা, কেবল এআই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে কম মূল্যের ‘শ্রমিক’ হিসেবে কাজ করার মানসিকতা থেকে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। দেশকে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বাজারে শক্ত অবস্থানে ধরে রাখতে হলে নীতি-নির্ধারণী পলিসি মেকিং, রেড-টিমিং এবং উন্নত গবেষণার কাজে তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তোলা একান্ত জরুরি। বাংলাদেশকে বিশ্ববাজারে শুধু এআই অ্যানোটেশনের সাধারণ ভোক্তা না হয়ে বরং এআই পণ্য ও সেবার আত্মনির্ভরশীল টেকসই সরবরাহকারী দেশ হিসেবে প্রস্তুত করাই এখন সময়ের প্রধান দাবি।