কক্সবাজারের পর্যটনসমৃদ্ধ সৈকতের বালুর নিচে লুকিয়ে আছে কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যের খনিজসম্পদ। মহাকাশ প্রযুক্তি, জেট ইঞ্জিন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং উচ্চপ্রযুক্তির ইলেকট্রনিকস শিল্পে ব্যবহৃত অত্যন্ত মূল্যবান খনিজ ‘জিরকন’ ও অন্যান্য ভারী খনিজের বিশাল ভান্ডার রয়েছে এই উপকূলে। কক্সবাজার থেকে শুরু করে কুয়াকাটা পর্যন্ত অন্তত ১৭টি স্থানে এসব খনিজভান্ডারের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছে। তবে দীর্ঘ অবহেলা, সঠিক পরিকল্পনার অভাব এবং বাণিজ্যিক উদ্যোগের অভাবে দেশের এই মূল্যবান সম্পদ এখনো মাটির নিচেই পড়ে আছে।
সম্ভাবনাময় খনিজের বিশাল ভান্ডার
বিজ্ঞানীদের মতে, কক্সবাজার ও সংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলের বালুতে জিরকনের পাশাপাশি আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভারী খনিজ বিদ্যমান। এর মধ্যে রয়েছে ইলমেনাইট, রুটাইল, গারনেট, ম্যাগনেটাইট, কায়ানাইট ও মোনাজাইট। জিরকন মূলত উচ্চপ্রযুক্তির শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে, ইলমেনাইট ও রুটাইল থেকে তৈরি হয় টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড, যা রঙ, প্লাস্টিক ও কাগজ শিল্পে অপরিহার্য। এছাড়া মোনাজাইটে থাকা বিরল তেজস্ক্রিয় উপাদান উন্নত ইলেকট্রনিকস, শক্তিশালী চুম্বক ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (বিএইসি) জরিপ অনুযায়ী, উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ২ কোটি ৫ লাখ টন বালুর মধ্যে ৪৪ লাখ টন ভারী খনিজ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু জিরকনের মজুত প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন বলে প্রচলিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। তবে ভূতত্ত্ববিদদের মতে, ১৯৮৬ সালের পর এ নিয়ে আর কোনো পূর্ণাঙ্গ পুনর্মূল্যায়ন হয়নি, ফলে খনিজের প্রকৃত মজুত সরকারি হিসেবের চেয়ে বহুগুণ বেশি হতে পারে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাংলাদেশের জিরকনের বিশুদ্ধতা প্রায় ৯৬ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কেন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ল এই সম্পদ?
কক্সবাজার সৈকত খনিজ বালু আহরণ কেন্দ্র (বিএসএমইসি) একসময় খনিজ আহরণের স্বপ্ন দেখালেও বর্তমানে এটি স্থবির হয়ে পড়েছে। ২০০৫ সালের পর থেকে এই কেন্দ্রে কার্যত কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম নেই। ৮০ জনের জনবল কাঠামোর এই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কাজ করছেন মাত্র চারজন। গবেষণাগার ও দামি যন্ত্রপাতি অযত্নে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তৎকালীন পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়ার উদ্যোগে ১৯৯৫ সালে পাইলট প্রকল্পটি শুরু হলেও পরবর্তীতে এটি বাতিল করা হয়। এরপর থেকে কোনো সরকারই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে খনিজ আহরণের জন্য কোনো প্রকল্প গ্রহণ করেনি।
বিনিয়োগের আগ্রহ ও সরকারি নীরবতা
কক্সবাজার উপকূলে খনিজ আহরণের অপার সম্ভাবনা থাকলেও সরকারিভাবে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উল্টো জানা গেছে, অস্ট্রেলিয়াসহ বেশ কয়েকটি বিদেশি রাষ্ট্র এবং বেসরকারি কোম্পানি বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করলেও সরকার তাতে সাড়া দেয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করে আধুনিক প্রযুক্তিতে এসব খনিজ প্রক্রিয়াজাত করা গেলে তা বাংলাদেশের শিল্পায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং কর্মসংস্থানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারত।
এখন কী করা প্রয়োজন?
দীর্ঘ কয়েক দশকে খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা নিয়ে অনেক গবেষণা হলেও তার সুফল মিলছে না। সঠিক সীমানা নির্ধারণ, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি। কক্সবাজারের খনিজ বালু আহরণ কেন্দ্রটির সংস্কার এবং দক্ষ জনবল নিয়োগের মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব।
কক্সবাজারের সৈকত শুধু পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি একটি কৌশলগত খনিজ অঞ্চল। পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করলে এই বালু থেকেই উৎপাদিত হতে পারে বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা। দীর্ঘদিনের অবহেলা কাটিয়ে এই সম্পদকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। খনিজ সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে উচ্চপ্রযুক্তির কাঁচামাল সরবরাহকারী দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারে।