• রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১০:২৫ অপরাহ্ন
Headline
সংঘাতের পথেই হাঁটছেন ট্রাম্প সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর না হওয়ায় বড় কৌশলগত সম্ভাবনা হারিয়েছে বাংলাদেশ: হামিদুর সমবায়ই পারে গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখতে: রিজভী জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে গঠনমূলক সম্পৃক্তক্ততা বজায় রাখার অঙ্গীকার বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্বের জায়গা তৈরি করতে হয় কাজের মাধ্যমে: আইনমন্ত্রী বিবিএসকে নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার : অর্থমন্ত্রী সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত সমবায় আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান রাষ্ট্রপতির পরিকল্পনা আছে মাত্র সাড়ে ১৫ শতাংশের: দেশের ৮৪ শতাংশ এলাকা মাস্টারপ্ল্যানের বাইরে ১০ দেশে বাংলাদেশীদের প্রায় ৬ লাখ আশ্রয় আবেদন: শীর্ষে ফ্রান্স ও ইতালি, তবে প্রত্যাখ্যানের হার রেকর্ড

কপ৩১ ও বৈশ্বিক জলবায়ু ন্যায়বিচার: প্রতিশ্রুতির ফাঁদে বন্দি না থেকে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

Reporter Name / ৪ Time View
Update : রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬

তুরস্কের মাটিতে আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বৈশ্বিক সম্মেলন কপ৩১। ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি বছর ধারাবাহিকভাবে আয়োজিত এই বিশ্বমঞ্চ মূলত বিভিন্ন রাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়ন পর্যালোচনার প্রধান ক্ষেত্র। কিন্তু পেছনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি আর বৈশ্বিক সমঝোতার নামে বড় বড় পরাশক্তিগুলোর কূটনৈতিক বিতর্কই বারবার প্রাধান্য পেয়েছে। ২০০৯ সালের কোপেনহেগেন সম্মেলনের কথা স্মরণ করলে স্পষ্ট হয় যে বিশ্বনেতারা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হলেও ধনী দেশগুলোর দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত কার্যকর ও আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক ঐকমত্যকে ভেস্তে দিয়েছিল। কিয়োটো প্রটোকল, কানকুন চুক্তি কিংবা প্যারিস চুক্তির মতো বহু আন্তর্জাতিক ফ্রেমওয়ার্ক স্বাক্ষরিত হলেও ধরিত্রীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ুর চরমভাবাপন্নতা রোধ করা আজ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি।

মানব সভ্যতার সামগ্রিক অগ্রযাত্রায় উন্নয়ন একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ হলেও লাগামহীন শিল্পায়ন ও জীবাশ্ম জ্বালানির অপব্যবহার আজ পরিবেশের জন্য চরম কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সভ্যতার অগ্রগতির নামে মাত্রাতিরিক্ত ভোগবিলাস, অপ্রয়োজনীয় সামরিক সংঘাত ও অস্ত্রের ব্যবহার বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমনকে আশঙ্কাজনক হারে বাড়িয়ে তুলছে। অথচ যে উন্নত ও সামরিকভাবে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো শত শত বছর ধরে কার্বন নির্গমনের সিংহভাগ ঘটিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মূল কারিগর হয়েছে, তারা এখন অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর নির্গমন হ্রাসের দায় চাপানোর চেষ্টা করে। এই তথাকথিত নির্গমন বাণিজ্য ও ক্ষতিকর পরিতৃপ্তির ফাঁদ উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য এক গভীর নৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। শিল্পোন্নত দেশগুলোকে তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব স্বীকার করে ক্ষতিপূরণ ও অভিযোজন তহবিল নিশ্চিত করতে হবে।

ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত জলবায়ু পরিবর্তনের ধ্বংসাত্মক বাস্তবতার প্রথম সারির সম্মুখযোদ্ধা। বঙ্গোপসাগরের ফানেল আকৃতির উপকূল এবং নদ-নদীর তলদেশে পলি জমার কারণে দেশটিতে সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, আকস্মিক প্লাবন ও তীব্র খরা প্রায় প্রতি বছরের নিয়মিত চিত্র। ১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী ভোলা ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলীয় অঞ্চলের চার লক্ষাধিক মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছিল। তবে বাঙালি জাতি প্রকৃতির বিরূপ আচরণের বিরুদ্ধে টিকে থাকার অসাধারণ সহজাত সক্ষমতা ও প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। উপকূলজুড়ে সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ, দীর্ঘ বেড়িবাঁধ তৈরি, আগাম আধুনিক সতর্কবার্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং ২০১২ সালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়নের ফলে পরবর্তীতে ১৯৯১, ২০০৭ কিংবা ২০০৯ সালের মতো প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগেও প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ সারাবিশ্বে আত্মমর্যাদার সঙ্গে নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত। কিন্তু আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কেবল স্থানীয়ভাবে অভিযোজন চালিয়ে আর কতদিন এই বৈশ্বিক সংকট একা মোকাবিলা করা সম্ভব। সীমিত আর্থিক সামর্থ্য নিয়ে একটি উন্নয়নশীল দেশ বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত সয়ে অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড সোজা রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। জাতিসংঘের জলবায়ু কনভেনশন কাঠামোর আওতায় ইতিমধ্যে তিরিশটি কপ অধিবেশন সম্পন্ন হলেও বৈশ্বিক নির্গমন হ্রাসে কোনো কঠোর বাধ্যবাধকতা কার্যকর করা যায়নি। নিজস্ব সক্ষমতায় জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলেও বিশ্বের সার্বিক উষ্ণায়ন না থামলে এই অর্জনগুলোও ধূলিসাৎ হতে বাধ্য। কেবল অভিযোজন বাড়িয়ে দুর্বল দেশগুলোকে প্রকৃতির রোষানলে ঠেলে দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।

আসন্ন তুরস্কের কপ৩১ সম্মেলনে বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের এই দ্বিচারিতা ও আত্মতুষ্টির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সামরিক পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক অহমিকা ও ভূরাজনীতির কূটকৌশলের ঊর্ধ্বে উঠে জলবায়ু পরিবর্তনকে মানবজাতির অস্তিত্বের যৌথ সংকট হিসেবে দেখতে হবে। নির্গমন বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রলোভনের ফাঁদ ভেঙে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং জীবাশ্ম জ্বালানি পরিহার করে কার্বন নির্গমন অবিলম্বে কমিয়ে আনাই হবে এই সম্মেলনের মূল পরীক্ষা। অন্যথায় আরও একটি বৈশ্বিক সম্মেলন কেবল ব্যর্থ কূটনৈতিক আলোচনার নিষ্ফল দলিল হয়ে থাকবে এবং সমগ্র মানবজাতি ধাবিত হবে এক অনিবার্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অতল গহ্বরে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category